কলকাতা 

দলের নেতাদেরকে বারবার আক্রমণ করা সত্ত্বেও হুমায়ুন কবিরকে তৃণমূল থেকে বহিষ্কার করতে কেন ভয় পাচ্ছেন মমতা? রহস্য?

শেয়ার করুন

সেখ ইবাদুল ইসলাম : মুর্শিদাবাদের ভরতপুরের তৃণমূল বিধায়ক হুমায়ুন কবিরকে গভীরভাবে শিক্ষা দিতে চলেছে তৃণমূল কংগ্রেস বলে বেশ কয়েকটি গণমাধ্যম খবর করেছে। কিন্তু সেটা কি সম্ভব? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তথা তৃণমূল কংগ্রেসের কি সেই শক্তি অবশিষ্ট আছে যে বিধায়ক হুমায়ুন কবিরকে দল থেকে তাড়াতে পারবেন? দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে হুমায়ুন কবির যেভাবে দলের বিভিন্ন প্রথম সারির নেতাকে কখনো ফিরহাদ হাকিমকে কখনো তৃণমূলের অন্য কোন গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে নিশানা করে নানা কুমন্তব্য করে চলেছেন তারপরেও কোন ব্যবস্থা নিতে পেরেছেন তৃণমূল নেত্রী! পারেন নি তো? অথচ কিছু গণমাধ্যম বিশেষ করে আনন্দবাজারের মত কাগজগুলি যেভাবে এই বিষয়টিকে সামনে রেখে হৈ হৈ করতে থাকে তাতে আর যাই হোক হয়তো ওই পত্রিকার প্রচার বাড়ে কিংবা হুমায়ুনের গুরুত্ব বাড়ে এর বাইরে কিছু হয় না!

কিছু হবে না একথা বাংলার জনরব স্পষ্ট করে জানিয়ে দিচ্ছে। কারণ তৃণমূল নেতৃত্বের সে ক্ষমতা এখন আর নেই যে কোন মুসলিম নেতাকে কেন ? অন্য কোন নেতাকেও বের করে দেওয়ার। এই দলের মধ্যে যারা প্রকৃত অর্থে তৃণমূলের স্বার্থে কাজ করেছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য কাজ করেছেন কিংবা সততার সঙ্গে কাজ করেছেন বা করে চলেছেন। তাদেরকে কোনোভাবেই তৃণমূল কংগ্রেস মর্যাদা দেয়নি। যে দল সৎ নেতাদের প্রশ্রয় দেয় না সৎ নেতাদের প্রমোশন দেয় না সেই দলে মেরুদন্ড নেই যে কোন নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করার। হুমায়ুন কবির যে প্রসঙ্গগুলি তুলে ধরেছেন তা তো বাস্তবে সত্য।

Advertisement

নেতাদের পদলেহণ করে এই দলে পদ পাওয়া যায়। এমপি এমএলএ হতে গেলে আর কি কি করতে হয় সেসব কথা না লেখাই ভালো। মুর্শিদাবাদ জেলাতে ৭০% এর বেশি মুসলিম সম্প্রদায়ের বাস। ধর্মনিরপেক্ষতার অন্যতম প্রতীক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেই জেলার মুসলিম নেতাদের কতটুকু ক্ষমতা দিয়েছেন তা ওই জেলার সাধারণ নাগরিকরা খুব ভালোভাবেই ভুক্তভোগী। একান্ত আলোচনায় মুর্শিদাবাদের অনেক সাধারন নাগরিককে বলতে শুনেছি এর চেয়ে অধীর রঞ্জন চৌধুরী অনেক ভালো ছিল। বহরমপুরের এই সাংসদ এই এলাকার মুসলিম সমাজের উন্নয়নে খুব বেশি কিছু না করলেও অন্তত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতেন। কিন্তু তা বর্তমানে ওই এলাকার কটি নেতা করে থাকেন তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে।

জনবিচ্ছিন্ন হীন নেতারা মুর্শিদাবাদের দায়িত্বে রয়েছেন। মুর্শিদাবাদের বেশিরভাগ অংশই যখন মুসলমান সম্প্রদায়ের বাস সেখানে মুসলমান সম্প্রদায়ের নেতাদেরকে গুরুত্বহীন করে রাখা হয়েছে। এমনিতেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২০১১ সালের যতজন মুসলিমকে বিধায়ক করেছিলেন তা এখন কমে কি হয়েছে বলার অপেক্ষায় রাখেনা!? একটা সিদ্দিকুল্লা চৌধুরী একটা কাসেম সিদ্দিকীকে দেখিয়ে ললিপপ দেখিয়ে এই রাজ্যের সংখ্যালঘু ভোটকে নিজেদের দখলে রাখার চেষ্টা করে চলেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

সম্প্রতি ওবিসি নিয়ে মমতা সরকারের যে আজব সিদ্ধান্ত আর সেই সিদ্ধান্তের ফলে এই রাজ্যের তিন কোটি বাঙালি মুসলমান সমাজকে যেভাবে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হলো তা দেখে এখানকার আরএসএস নেতারাও লজ্জা পাচ্ছেন। একটি সরকার কিভাবে একটি সম্প্রদায়কে অপদস্ত করতে পারে।  একটি সম্প্রদায়কে সমস্ত রকম সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করতে পারে তা নবান্নকে না দেখলে বোঝা যেত না। নিরবে নিভৃতে মমতা সরকার এই রাজ্যের সংখ্যালঘু মুসলিমদেরকে যোজন মাইল পিছিয়ে দিয়েছে। আগামী কয়েক দশকেও এই অভাব এই সংকট এই রাজ্যের বাঙালি মুসলিম সমাজ পূরণ করতে পারবে না।

আসলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে যে সকল মুসলিম নেতারা রয়েছেন তারা সকলেই হাত তোলা পার্টি। দিদির কাছে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার জন্য নিজের সমাজের উন্নয়নের কথা বলতে পারেনা। দুঃখের হলেও সত্য পশ্চিমবাংলার বাঙালি মুসলমান সম্প্রদায় তাদেরকেই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে যারা মমতার কাছে গিয়ে সমাজের সুখ দুঃখের কথা না বলে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত থাকেন। এরকম অনেক উদাহরণ আমার হাতে আছে। কিন্তু এখন যদি সে সব কথা বলি তাহলে বলবে বিজেপির স্বার্থে বলছে। নিশ্চয়ই বিজেপি একে ট্যাপ করেছে। কিন্তু সত্য কথাটা জোরে সোরে বলছেন হুমায়ুন কবির।

উচ্চশিক্ষিত না হওয়ার কারণে হয়তো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তিনি কথা বলতে পারেন না। কিন্তু সোজা কথা সোজা ভাষায় বলছেন তিনি। স্বাধীনতার পর সৈয়দ বদরুদ্দোজা, যে কথাগুলি স্পষ্ট করে বলতেন জহরলাল নেহেরুর সামনে দাঁড়িয়ে একই রকম সাহস নিয়ে হুমায়ুন কবির সেই কথাগুলো বলে চলেছেন। সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী এক নেতাকে গুরুত্ব না দিয়ে জনবিচ্ছিন্ন নেতাদেরকে পদে বসিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আসলে ক্ষমতাকে ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। আর এই জায়গায় দাঁড়িয়ে হুমায়ুন কবির প্রশ্ন তুলতে পেরেছেন বলেই বাংলা গণমাধ্যমগুলি যা খুশি তাই লিখে যাচ্ছে। কিন্তু সহজ সত্য কথা হলো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দম নেই হুমায়ুন কবিরকে দল থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার। কারণ মমতা খুব ভালো করেই জানেন এই রাজ্যে যদি কংগ্রেস বামেরা একবার জমি পেয়ে যায় তাহলে আগামী দিনে হয় বিজেপি নয় তৃণমূল এসব বলে মানুষের ভোট পাওয়া যাবে না।

সুতরাং বিদ্রোহী হুমায়ুন কবিরের প্রতি আমাদের সকলের সম্মান শ্রদ্ধা জানানো উচিত। ওবিসি ইস্যুতে যখন সিদ্দিকুল্লা চৌধুরীরা চুপ করে আছেন চুপ করে আছেন অনেক স্বার্থপর মুসলিম নেতারা তখন তিনিও চুপ করে থাকতে পারতেন। তিনি কথা বলছেন। সরাসরি দলকে চ্যালেঞ্জ করছেন ক্ষমতা থাকে তাড়িয়ে দিন। এই কথাগুলোই যদি ওবিসি ইস্যুতে সামিরুল ইসলামরা কিংবা আরও যারা তথাকথিত তৃণমূলের নেতা বলে দাবি করেন বিভিন্ন সংস্থার চেয়ারম্যান হয়ে বসে আছেন তাহলে হয়তো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুসলিম সম্প্রদায়ের উন্নয়নের জন্য কিছু চিন্তা করতেন। মুসলিম সমাজ আজ ওবিসি থেকে বঞ্চিত হওয়ার জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দায়ী করার আগে এই রাজ্যের তথাকথিত মুক বধির সেই সকল সংখ্যালঘু নেতাদেরকে দায়ী করা উচিত যারা নিজেদের গদি টেকানোর লক্ষ্যে সমাজকে শূলে চড়িয়েছেন।

হুমায়ুন কবির এখানেই অনন্য। একজন জননেতা হিসাবে সংখ্যালঘু সমাজের একজন নেতা হিসাবে তিনি অন্তত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে চ্যালেঞ্জ জানাতে পেরেছেন। এখানে তৃণমূলের অন্য নেতাদের সঙ্গে হুমায়ুনের তফাৎ। আবারো বলছি হুমায়ুন কবিরকে তৃণমূল থেকে বিতাড়িত করার ক্ষমতা নেই তৃণমূল নেত্রীর।

 


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত নিবন্ধ