সুদীর্ঘ এক শিক্ষা-কাফেলায় নতুন নতুন মানুষ জুড়ে নেওয়াই ছিল তাঁর জীবন ভরের কাজ
নায়ীমুল হকের প্রতিবেদন: তিনি বলতেন, যে কাজই করো সেটা ভালো করে করো, সমস্ত কাজ তুমি করে উঠতে পারবে না। তাঁর সারা জীবনের ধ্যান-জ্ঞান ছিল শিক্ষা। শিক্ষাদানের নিত্য নতুন পদ্ধতি এসেছে তাঁর হাত ধরে। সম্ভাবনার কোনো কিরণ কারো মধ্যে দেখতে পেলেই তিনি তা আহরণ করতে ছুটে যেতেন, জুড়ে নিতেন তাকে তাঁর সুদীর্ঘ শিক্ষা-কাফেলায়। সকলের প্রিয় হেডমাস্টার মশাই স্বর্গীয় মিহির সেনগুপ্ত-এর স্মৃতিচারণায় এ কথাগুলোই অনুরনিত হলো বারবার সোমবারের সন্ধ্যায় অনলাইন অনুষ্ঠানে। অনুসন্ধান কলকাতা ও স্যান্ডফোর্ড অ্যাকাডেমির এই যৌথ আয়োজনে।

স্মৃতিচারণায় দিলীপ মুজমদার

আয়োজনের প্রথম বক্তা বিড়লা ইন্ডাস্ট্রিয়াল এন্ড টেকনোলজিক্যাল মিউজিয়ামের অবসরপ্রাপ্ত ডিরেক্টর সমর বাগচী। তিনি শোনালেন মিহিরদার সঙ্গে তাঁর একাত্মতার কথা। কীভাবে বিরাট হৃদয়ের সেই মানুষটি ভালোবাসার বেড়াজালে তাঁকে বেঁধে ফেলেছিল, স্মৃতিমেদুরতায় ভরিয়ে তুলছিল সে সমস্ত কথা। সমর বাগচী আরো বললেন, কপর্দক শূন্য একটি মানুষ কীভাবে চার-চারটি স্কুল গড়ে তুলেছিলেন, তা এক আশ্চর্য ইতিহাস। এই ইতিহাস বাংলায় অতি বিরল। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের পর এরকম আরেকজন ব্যক্তিত্ব কেউ এসেছেন কিনা, তা তাঁর জানা নেই। মানুষকে মিহিরদা বিশ্বাস করতেন, ভরসাও করতেন। আর এটাই ছিল তাঁর মূল শক্তি। একসঙ্গে থেকে তিনি দেখেছেন, এই সাহসে ভর করে কী অসীম শক্তির অধিকারী হয়েছেন তিনি! পুরুলিয়ার বাগমুন্ডির মতো দুর্গম স্থানে গড়ে তুলেছেন আবাসিক বিদ্যালয়। আদর্শ যে কেবল কথার কথা নয়, তা তিনি কাজে করে দেখিয়েছেন। সমর বাগচীর এই কথার রেশ ধরে হেডমাস্টার মশাই মিহির সেনগুপ্ত-এর প্রিয় ছাত্র ও পরবর্তী পর্যায়ে সহকর্মী সোমনাথ মুখোপাধ্যায় বললেন আসলেই মাস্টারমশাইয়ের কাছে এ সমস্ত বিদ্যালয় বা প্রতিষ্ঠান ছিল এক একটা বীক্ষনাগারের মতো। নানা ছলে প্রতিনিয়ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলতো শিক্ষার্থীদের সঙ্গে। হয়তো বা তারা জানতেই পারেনি সুগভীরে প্রোথিত সেই সমস্ত গবেষণার কথা। নীরবে এসব কাজ চলেছে। আমরা যত বড় হয়েছি ধীরে ধীরে এসব বুঝতে শিখেছি। পরে সঙ্গী হয়ে তাঁর পাশে কাজ করার সৌভাগ্য অর্জন করেছি। সোমনাথ মুখোপাধ্যায় স্মরণ করছিলেন বহুদিনের পুরনো এক কুইজ কম্পিটিশনের কথা। তখন বর্নভিটা কুইজ কম্পিটিশন ছিল রাজ্যে প্রথম সারির স্কুল গুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা। সেই প্রতিযোগিতায় রাজ্যে ফাইনালে উঠেছে দুটি দল- কিশোর ভারতী এবং সেন্ট লরেন্স স্কুল। প্রতিদিন কিশোর ভারতীর ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য ব্যাগ ভর্তি করে বই নিয়ে গিয়ে প্রস্তুত করছেন তাদের প্রধান শিক্ষক মিহির সেনগুপ্ত। অন্যদিকে সেন্ট লরেন্সের ছাত্র-ছাত্রীরা তেমন কিছু পাচ্ছে না। একদিন তারা সাহসে ভর করে মিহিরবাবুর কাছে এসে আর্জি জানালো, আমাদের জন্য কিছু যদি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন? রে-রে করে তেড়ে এলো কিশোর ভারতীর ছাত্ররা, তাই আবার হয় নাকি! আমাদের হেডমাস্টারমশাই তোমাদের শেখাতে যাবেন? কিন্তু না, ঘটলো ঠিক উল্টোটা। হেডমাস্টার মশাই বললেন, শিক্ষা কখনও বেঁধে রাখার নয়, প্রসারেই তার সার্থকতা। তোমরা লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হও এবং প্রমাণ করো। সেদিন হেডমাস্টারমশাইয়ের সেই অমোঘ বাণী স্পর্শ করে গিয়েছিল কিশোর ভারতীয় ছাত্রদের। শুধু জিতেই প্রমাণ করেনি তারা, সেই ছাত্ররা পরবর্তীতে ব্যক্তি জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে, মানুষের মতো মানুষ হয়ে প্রমাণ করেছিলেন তাদের প্রিয় হেডমাস্টার মশাইয়ের কথাগুলি কতখানি ‘সত্য’।

পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়
হেডমাস্টার মশাই-এর সুদূর প্রসারী চিন্তার নানা দিক এদিন তুলে ধরছিলেন দীর্ঘদিনের সহকর্মী জীববিদ্যার শিক্ষক পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়। কত বছর আগে ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে করেছেন নানান কর্মকাণ্ড! প্রকৃতিকে জানা, অসীম আকাশ চেনা, পর্বত আরোহণ, বৃক্ষরোপণ, বনসৃজন, রক্তদান শিবির, বন্যা ত্রাণ-এর মতো কর্মসূচির মাধ্যমে শুধু ছাত্ররা নিজেদের মধ্যে একাত্ম হয়েছে তাই ছিল না। বরং সমাজ ও প্রকৃতির সঙ্গেও তাদের এবং আমাদের শিক্ষকদেরও গড়ে উঠেছিল প্রকৃত এক আত্মিক সম্পর্ক।

সোমনাথ মুখোপাধ্যায়
এদিন স্মৃতিচারণার অনুষ্ঠানে মিহির সেনগুপ্তের বহুদিনের সাথী এবং কিশোর ভারতীর ১০ জন প্রতিষ্ঠাতার অন্যতম দিলীপ মজুমদার শোনালেন তাঁর দীর্ঘ স্মৃতি-কথা। আজকের কিশোর ভারতী গড়ে তোলার পেছনে তিল তিল করে জমানো মানুষের ভালবাসার উপাখ্যান।
মিহির সেনগুপ্তের প্রিয় ছাত্রদের সুদীর্ঘ তালিকা, তার মধ্যে অন্যতম হলেন শমীক সেন। তিনি শোনালেন, তাঁর প্রিয় রাশভারি হেডমাস্টার মশাই-এর ছাত্রদের সঙ্গে টিফিন ভাগ করে খাওয়ার কথা, অধিকার কী করে আদায় করে নিতে হয় তা যেভাবে শিখিয়েছিলেন, তার কথা। শমীক বলছিলেন, সাম্য প্রকৃতির কাম্য নয়, প্রকৃতি বৈচিত্র্যময়, তাই বৈচিত্রেই তাঁর আস্থার সবক শেখাতেন তিনি আমাদের। আজ তারা প্রাক্তনীদের দলে চলে গিয়েও কীভাবে কিশোর ভারতী পরিবারের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রয়েছেন। সত্যি কথা বলতে কী, সেই বেঁধে বেঁধে থাকার সূত্রে গেঁথে দিয়েছিলেন সকলের প্রিয় হেডমাস্টার মশাই-ই, কথাগুলি বলছিলেন শমীক সেন। তখন পিন পতন নীরবতা বিরাজ করছে গোটা ওয়েবিনার-মহল।

সংগীত পরিবেশনায় পল্লবী চট্টোপাধ্যায়
তাঁর চলে যাওয়া বিরাট এক ক্ষতি বটে, কিন্তু তা পুষিয়ে দিতে বদ্ধপরিকর তাঁর অগণিত শিক্ষার্থীদল, এমনকী অনেকের মধ্যে এই প্রতিবেদকও।

কাজী নিজামউদ্দিন,প্রধান শিক্ষক
এদিন ওয়েবিনারে পল্লবী চট্টোপাধ্যায়ের সূচনা সংগীত এবং শিক্ষক গৌরাঙ্গ সরখেলের সার্বিক উপস্থাপনা ছিল মনোমুগ্ধকর। অনুসন্ধান কলকাতার সহ-সভাপতি এবং বিজড়া হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক কাজী নিজামুদ্দিনের ধন্যবাদ জ্ঞাপন ও সমাপ্তি ঘোষণায় যেন সম্বিত ফিরে পেল এদিনের ওয়েবিনারে অংশগ্রহণকারীরা।

