দলত্যাগ আইন থেকে বাঁচতে তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদরা নাম গোত্রহীন দলে যোগ দিলেন! রহস্য?
বাংলার জনরব ডেস্ক: ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় দলের মধ্যে থেকেই তৃণমূলের আলাদা ব্লক তৈরি করে বিরোধী দলনেতার পদ পেয়েছেন। কিন্তু সেই পথে হাঁটলেন না তৃণমুলের বিদ্রোহী সাংসদরা। কেন তাঁরা আশ্রয় নিলেন নতুন দলের— ন্যাশনালিস্ট সিটিজ়েন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া (এনসিপিআই)। এই প্রশ্ন ইতিমধ্যে উঁকি দিতে শুরু করেছে।
বিদ্রোহ দু’জায়গাতেই হয়েছে— বিধানসভাতেও, লোকসভাতেও। তবে দু’ক্ষেত্রে কিছু ফারাক রয়েছে। বিধানসভায় বিদ্রোহীরা ‘তৃণমূল’ দলের নামটাই যে শুধু ব্যবহার করছেন তা-ই নয়, তাঁরা বিরোধী বেঞ্চে বসারও সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অন্য দিকে, লোকসভায় পরিস্থিতি ভিন্ন। সেখানে বিদ্রোহীরা এনডিএ-কে সমর্থন করার কথা ঘোষণা করেছেন।
প্রথমত,বিধানসভায় পরিষদীয় দলের বিদ্রোহ পরবর্তী পরিস্থিতি দেখে ‘সাবধানী’ লোকসভার বিদ্রোহীরা। লোকসভায় ভাঙন ধরার আগেই তৃণমূল বিধায়কদের মধ্যে বিদ্রোহ প্রকট হয়। দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে ঋতব্রতকে পরিষদীয় দলনেতা বেছে নেন বিদ্রোহী বিধায়কেরা। তিনিই এখন বিধানসভার বিরোধী দলনেতা। তৃণমূলের সিংহভাগ বিধায়কের সমর্থনও রয়েছে তাঁর প্রতি। কিন্তু তা নিয়ে আদালতে মামলাও হয়েছে। দল থেকে বহিষ্কৃত কেউ কী ভাবে বিরোধী দলনেতা হতে পারেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে হাই কোর্টে মামলা করেছে তৃণমূল। ওই মামলা এখনও বিচারাধীন। আইনি দিক বিবেচনা করেই বিদ্রোহী সাংসদেরা ‘ঝুঁকি’ এড়িয়ে গেলেন।
এ প্রসঙ্গে সিপিএমের প্রবীণ নেতা তথা নির্বাচনী আইনকানুন সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকা রবীন দেব ডিজিটাল আনন্দবাজারকে বলেছেন, “হয়তো সেই কারণেই বিজেপির পাকা মাথাদের সঙ্গে আলোচনা করে তৃণমূলের বিদ্রোহীরা নিজেদের আসল তৃণমূল দাবি না করে অন্য দলে মিশে যাওয়ার কৌশল নিয়েছে।”
দ্বিতীয়ত,গোটা প্রক্রিয়ার ‘পরিচালক’ যে বিজেপি, এটা নিয়ে সংশয় নেই। বিদ্রোহী সাংসদদের প্রথম বৈঠকটিই হয়েছে বিজেপি নেতা তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের বাংলোতে। তার পর গত ছয়-সাত দিনে দফায় দফায় বৈঠক হয়েছে এবং তার প্রায় সিংহভাগই হয়েছে ভূপেন্দ্রের বাড়িতেই। রবিবারও ভূপেন্দ্রের বাড়িতে বৈঠক হয়েছে। তখন সেখানে অপর বিজেপি নেতা নিশিকান্ত দুবেও ছিলেন। বিজেপি নেতার বাড়িতে গিয়ে বৈঠক নিয়ে দৃশ্যত কোনও রাখঢাক নেই বিদ্রোহীদের মধ্যে। যদিও গত কয়েকদিনে বিজেপি এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনও মন্তব্য করেনি।
এ বিষয়টি নিয়ে আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যের ব্যাখ্যা, “বিজেপির উদ্দেশ্য বিভিন্ন বিলে তৃণমূলের সংখ্যাগরিষ্ঠ সাংসদের ভোট পাওয়া। সেই লক্ষ্যে তারা কোনও ঝুঁকির মধ্যে যাননি। গোটা তৃণমূলটাকে ভেঙে নিয়ে অন্য দলের সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন।”
তৃতীয়ত, লোকসভায় সংসদীয় দলকে মমতার নিয়ন্ত্রণ থেকে বার করে নিতে পারলেও তৃণমূল দলের নিয়ন্ত্রণ বিদ্রোহীরা নিতে পারবেন না। এই আশঙ্কা থেকেই নতুন দলের আশ্রয় নেওয়া হয়ে থাকতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। কারণ, পরিষদীয় দল এবং সংসদীয় দল হাতছাড়া হওয়ার আভাস পেতেই দলের সব সাংগঠনিক কমিটি ভেঙে দেন মমতা।
এ ক্ষেত্রে উল্লেখ্য, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তৃণমূল চেয়ারপার্সন-কেন্দ্রিক দল (অর্থাৎ, মমতা-কেন্দ্রিক)। নির্বাচন কমিশনের কাছে পার্টির গঠনতন্ত্র জমা দেওয়া আছে। ১৯৯৮ সালে যখন তৃণমূল তৈরি হয়েছিল, তখন মুকুল রায় দলে যে সংবিধান জমা দিয়েছিলেন সেখানে স্টেট এক্সিকিউটিভ কমিটিকে সর্বোচ্চ ক্ষমতাপ্রাপ্ত কমিটি বলে উল্লেখ করা ছিল। পরে সংশোধনীতে জাতীয় কর্মসমিতিকে শীর্ষ কমিটি হিসাবে ব্যাখ্যা করা হয়। সেই জাতীয় কর্মসিমিতিও চেয়ারপার্সন কেন্দ্রিক। অর্থাৎ, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের চেয়ে সাংগঠনিক পদাধিকারীদের দলের উপর নিয়ন্ত্রণ অনেক বেশি।
বিজেপি মুখপাত্র তথা প্রবীণ আইনজীবী স্বপন দাসের মতে, এ ক্ষেত্রে তৃণমূলের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা নিয়ন্ত্রণ ভেঙে বেরিয়ে যেতে চাইলেও দলের নাম, প্রতীক, তহবিলের নিয়ন্ত্রণ রয়ে যাচ্ছে সাংগঠনিক পদাধিকারীদের হাতেই। বর্তমানে এই সাংগঠনিক পদাধিকারীরা সকলেই মমতার ঘনিষ্ঠ এবং বিদ্রোহী হয়ে ওঠেননি। এ অবস্থায় প্রতীক, তহবিল বা দলের নাম পেতে আইনি লড়াই হলে বা কমিশনের কাছে গেলে বিদ্রোহীরা বিশেষ সুবিধা পাবেন না বলেই মনে করছেন প্রবীণ আইনজীবী স্বপন। তৃণমূল সাংসদ তথা আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ও বলেন, “আমি তো প্রথম থেকেই বলছি, এই রকম ভাবে কেউ কিছু দাবি করতে পারে না। এটা আইনত হয় না। সংবিধান বলে তো একটা ব্যাপার আছে। ফলে এরা নিজেদের তৃণমূল বলতে পারবে না। এরা তৃণমূল নয়। এদের বিজেপির তল্পিবাহকতা করতে হবে।”
চতুর্থত,কংগ্রেস-তৃণমূল মিশে গেলে দলত্যাগবিরোধী আইনের আওতায় পড়ার সম্ভাবনা ছিল বিদ্রোহীদের। সম্প্রতি, গান্ধী পরিবারের সঙ্গে মমতা-অভিষেকদের পৃথক পৃথক বৈঠকের পর খবর ছড়ায়— কংগ্রেসের সঙ্গে মিশে যেতে পারে মমতার তৃণমূল। যদিও পরে সেই সম্ভাবনার কথা উড়িয়ে দিয়েছে কংগ্রেস। তবে এমন কিছু ঘটলে দলত্যাগবিরোধী আইনের আওতায় পড়তে পারতেন বিদ্রোহীরা। আগেভাগে বিদ্রোহীরা পৃথক দলের আশ্রয় নেওয়ার নেপথ্যে এটিও একটি কারণ বলে মনে করছেন বিজেপির স্বপন। বর্তমানে তৃণমূলের সংসদীয় দলে রয়েছেন ২৮ জন। দলত্যাগ বিরোধীআইন এড়াতে দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন প্রয়োজন বিদ্রোহীদের। যা বর্তমান হিসাবে তাঁদের হাতে রয়েছে।
স্বপনের মতে, মমতা যদি কংগ্রেসের সঙ্গে মিশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, সে ক্ষেত্রে আইনগত দিক থেকে বিশেষ কিছু করার নেই বিদ্রোহীদের। বর্তমানে কংগ্রেসের ৯৮ জন সাংসদ আছেন লোকসভায়। তৃণমূলের ২৮ জনকেও তখন কংগ্রেসের সঙ্গে জুড়ে দেখা হবে। মোট সাংসদ সংখ্যা হয়ে যাবে ১২৬। সংযুক্তিকরণের পরে দল ভাঙতে গেলে দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থনের গণ্ডিও অনেকটা বেশি হয়ে যাবে। সেই কারণেই বিদ্রোহীরা স্পিকারকে আগে ভাগে চিঠি দিয়ে থাকতে পারেন বলে মনে করছেন বিজেপি মুখপাত্র তথা আইনজীবী স্বপন। এতে, তৃণমূলের নিয়ন্ত্রণ মমতার হাতে থাকলেও সাংসদদের উপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ থাকল না।
বিভিন্ন সূত্র ঘেঁটে যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, কাকলি ঘোষ দস্তিদার-শতাব্দী রায়-সায়নী ঘোষদের নতুন দলের ঠিকানা পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া জেলায়। নির্বাচন কমিশনের তালিকা অনুযায়ী, এই নামের একটি দল ২০২৩ সালে আরইউপিপি (রেজ়িস্টার্ড আনরেকগনাইজ়ড পলিটিক্যাল পার্টি) তালিকাভুক্ত হয়। কমিশন অস্বীকৃত রাজনৈতিক দলটি ২০২৩ সালে ত্রিপুরায় বিধানসভা ভোটে দু’টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। কৈলাসহর এবং চউমানু আসনে প্রার্থী দিয়েছিল। প্রতীক ছিল কলমের নিব এবং সাতটি রশ্মি। কোনও প্রার্থীই জেতেননি। কৈলাসহর কেন্দ্রে ২৮৬টি ভোট পেয়েছিলেন জাহাঙ্গির আলি। চউমানুর প্রার্থী বড়জেদা ত্রিপুরা পেয়েছিলেন ৫৩৬টি ভোট।

