কলকাতা জেলা 

অনন্ত মহারাজের বাড়িতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়!উত্তরবঙ্গেও বিজেপির কাফিনে শেষ পেরেকটি পুঁতে দিলেন তৃণমূল নেত্রী!

শেয়ার করুন

বাংলার জনরব ডেস্ক : রাজ্য বিজেপিতে বড় ধরনের ভাঙ্গন যে আসতে চলেছে তা নিয়ে কোন সন্দেহ থাকার কথা নয়। কিন্তু লোকসভা ভোটের ফল ঘোষণা হওয়ার মাত্র ১৫ দিনের মধ্যেই এই রাজ্যের বিজেপির সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য নেতা অনন্ত মহারাজ যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সাদরে বরণ করে নেবেন সেটা কেউ কল্পনা করেও দেখেননি। কল্পনা তো দূর কথা কোনদিন ভাবেননি যে এত তাড়াতাড়ি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রথম সারির জনজাতি নেতা অনন্ত মহারাজের বাড়িতে পৌঁছে যাবেন। বিজেপির এই রাজ্যসভার সাংসদ কে সামনে রেখেই ২০১৯ থেকে এই রাজ্যে উত্তরবঙ্গে বিজেপি দল তার সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি করেছিল। কিন্তু তাল কেটেছিল ২০২৪ এর লোকসভা নির্বাচনে।

কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেস দুর্ঘটনায় আহতদের দেখতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় উত্তরবঙ্গ গিয়েছিলেন। শিলিগুড়িতে অবস্থিত উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজে আহতদের দেখার পর আজ মঙ্গলবার সকালে মদনমোহন মন্দিরে পুজো দিয়েই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কনভয় ছোটে চকচকার দিকে। সেখানেই বিজেপির রাজ্যসভার সাংসদ অনন্ত মহারাজের বাড়ি। যে বাড়িকে স্থানীয়েরা ‘প্রাসাদ’ বলতে অভ্যস্ত। মুখ্যমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য অনন্ত অপেক্ষা করছিলেন বাড়ির বাইরে। মমতা সেখানে এসে পৌঁছতেই অনন্ত ছুটে এসে তাঁকে অভ্যর্থনা জানান। গলায় পরিয়ে দেন রাজবংশী উত্তরীয়। হাতে তুলে দেন রাজবংশী ঐতিহ্যবাহী গুয়াপান।

Advertisement

কোচবিহার লোকসভা কেন্দ্রটিকে পাখির চোখ করে ঝাঁপিয়েছিল তৃণমূল। কিন্তু শুরু থেকে লড়াই ছিল অত্যন্ত কঠিন। কোচবিহার লোকসভায় নির্ণায়ক রাজবংশী ভোটের একটি অংশ তৃণমূলের সঙ্গে থাকলেও অপর গোষ্ঠীর নেতা অনন্ত মহারাজ ছিলেন খোলাখুলি ভাবে বিজেপির সঙ্গে। তাঁকে সাংসদ করে রাজ্যসভায়ও পাঠায় বিজেপি। কিন্তু বিজেপির সঙ্গে অনন্তের সম্পর্ক সব সময় মসৃণ গতিতে এগোয়নি। বিভিন্ন কারণে দলীয় শীর্ষ নেতৃত্বের উপর ‘গোসা’ হয় অনন্তের। কোচবিহারের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল মহল মনে করছে, এই ‘গোসা’রই ফয়দা গিয়েছে তৃণমূলের ভোটবাক্সে। আরও বিভিন্ন সমীকরণও তৃণমূলের পক্ষে যায়। হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করে কোচবিহার আসনটি দখল করে তৃণমূল। ভোটের ফলের বিশ্লেষণে দেখা যায়, তৃণমূলের পক্ষে থাকা বংশীবদন বর্মণের হাতে থাকা রাজবংশী ভোট তৃণমূলে গিয়েছে তো বটেই, এমনকি অনন্তের তরফের ভোটেও থাবা বসিয়েছে তৃণমূল। এই প্রেক্ষিতে এ বার অনন্তের বাড়িতে পৌঁছে গেলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী।

প্রসঙ্গত, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে বীর চিলা রায়ের নামাঙ্কিত একটি অনুষ্ঠানে এক মঞ্চে দেখা গিয়েছিল রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা এবং অনন্তকে। কিন্তু তার পরবর্তী কালে অনন্তকে বৈঠক করতে দেখা গিয়েছিল তৎকালীন কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী তথা কোচবিহারের প্রাক্তন সাংসদ নিশীথ প্রামাণিকের সঙ্গে। বস্তুত, সকালে যে মঞ্চে অনন্ত মমতাকে নিয়ে এসেছিলেন, সন্ধ্যায় সেই মঞ্চেই বক্তৃতা করতে দেখা গিয়েছিল নিশীথকে। তৃণমূল নেতৃত্ব সেই ঘটনাকে ভাল ভাবে নেননি। পরবর্তী কালে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব অনন্তকে রাজ্যসভায় পাঠানোর প্রস্তাব দেন। শুরুতে আপত্তি করলেও, পরে প্রস্তাব মেনে নেন অনন্ত। শোনা যায়, অনন্তকে রাজি করানোর পিছনে ‘বড় হাত’ ছিল নিশীথের। কিন্তু নিশীথ বা তাঁর তৎকালীন ‘বস’ অমিত শাহের সঙ্গে অনন্তের সম্পর্ক মসৃণ গতিতে এগোয়নি। বিভিন্ন কারণে, দু’তরফের মনোমালিন্যের জেরে অনন্ত কার্যত ঘরে বসে যান। এই পর্বের সবচেয়ে বড় ধাক্কা ছিল ধূপগুড়ি উপনির্বাচন। যে উপভোটে বিজেপির রাজবংশী ভোট-ভান্ডারে কার্যত ধস নামিয়ে দেয় তৃণমূল। অনন্তকে প্রচারে নামিয়েও জেতা আসন ধূপগুড়ি ধরে রাখতে পারেনি বিজেপি। এর পর থেকেই ক্রমশ বদলাতে থাকে রাজার শহর কোচবিহারের চালচিত্র। বিজেপির সঙ্গে দূরত্ব বাড়তে থাকে মহারাজের, ক্রমশ কাছে আসতে থাকেন তৃণমূলের কতিপয় নেতা। মঙ্গলবার বেলায় চকচকায় অনন্তের বাড়িতে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর পদার্পণ সেই ধারণাকেই আরও পোক্ত করল বলে মনে করা হচ্ছে।

অনন্ত মহারাজের বাড়িতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আগমনকে ঘিরে যেবার্তাই যাক না কেন একটা কথা স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়েছে কোচবিহার লোকসভা কেন্দ্রটি এবার বিজেপির কাছ থেকে যে তৃণমূল কেড়ে নিয়েছে তার নেপথ্যে অবশ্যই অনন্ত মহারাজের ভূমিকা ছিল। নাহলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এত তাড়াতাড়ি অনন্ত মহারাজের বাড়িতে যেতেন না। আপনাদের মনে আছে কিনা জানিনা তবে গত বিধানসভা নির্বাচনে অর্থাৎ ২০২১ এর বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির জেতার সম্ভাবনা প্রবল ছিল বলে গণমাধ্যমগুলির দাবি করেছিল। পরবর্তীকালে দেখা গেল যে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২১১ টি আসন নিয়ে ক্ষমতায় চলে আসছে আর এই ঘটনার কয়েকদিন পরেই তৎকালীন বিজেপির প্রভাবশালী নেতা মুকুল রায় কে তৃণমূল তার দলে ফিরিয়ে নেন এ থেকে এটাই স্পষ্ট হয়েছিল যে মুকুল রায় গোপনে তৃণমূলকে বিধানসভা নির্বাচনে সাহায্য করেছিল সেজন্যে বিজেপির সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত বিজেপি হেরে যায়। এবারের নির্বাচনে ও একই ঘটনা ঘটেছে বলে মনে হচ্ছে। তবে অনন্ত মহারাজ এখুনি হয়তো তৃণমূলের যোগ দেবে না কিন্তু তৃণমূলকে যে গোপনে সাহায্য করবে সে নিয়ে কোন সন্দেহ থাকল না।


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত নিবন্ধ