অন্যান্য 

রাহুলের নেতৃত্বাধীন বিজেপি বিরোধী জোট-ই মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্যতা পাবে সবচেয়ে বেশি ; ফেডারেল ফ্রন্ট নয়

শেয়ার করুন
  • 159
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সেখ ইবাদুল ইসলাম : তিন রাজ্যে কংগ্রেসের অপ্রত্যাশিত জয় ; শতাব্দী প্রাচীন এই দলটিকে আবার দেশের রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে । যে রাহুল গান্ধীকে কয়েক মাস আগেও দেশের প্রবীণ রাজনীতিবিদরা এড়িয়ে চলতেন ; তাঁদের কাছেই এখন রাহুলের বিশ্বাসযোগ্যতা কয়েকগুণ বেড়ে গেছে । আসলে সবাই জানেন এবং বোঝেন দেশের রাজনীতিতে বিজেপি বিরোধী দল হিসেবে মানুষের কাছে সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য জাতীয় কংগ্রেস । ৯২ সালের বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর এদেশের রাজনীতিতে আমূল পরিবর্তন ঘটে । উঠে এসেছে বিভিন্ন আঞ্চলিক দল । জাত-পাতের রাজনীতি একই সঙ্গে আঞ্চলিক স্বার্থ এই ধরনের রাজনৈতিক দলগুলির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি করেছে । ফলে দেশের রাজনীতিতে আঞ্চলিক দলগুলি শক্তিশালী  হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রে জোট সরকারের প্রাধান্য বেশি দেখতে পাওয়া যাচ্ছে । ১৯৮৯ সাল থেকে দেশে এক দলীয় শাসনের অবসান ঘটেছে । সেই থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত দেশে জোট সরকার ক্ষমতায় ছিল । জোট সরকারে সুবিধা-অসুবিধা দুটি-ই বিদ্যমান থাকে । জোটের শরীকরা বেশিরভাগ-ই আঞ্চলিক দল ফলে তাদের এলাকার স্বার্থ সরকার পূরণ করতে না পারলে তারা সরকারকে সমর্থন দেবে না । এখানে শেষ নয়, জাতীয় স্বার্থের চেয়ে এই সব রাজনৈতিক দল  আঞ্চলিক স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকে ।

ফলে জোট সরকার কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সব শরীকের মতামতকে প্রাধান্য দিতে হয় । এতে সরকারকে অনেক সিদ্ধান্ত থেকে পরিস্থিতির চাপে সরে আসতে হয় । ২০০৪ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত দেশে জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন জোট সরকার ক্ষমতায় ছিল ; তারা এই সময় অনেক গুরুত্বপূর্ণ জনমুখী সিদ্ধান্ত নিলেও শরীক দলের বাধ্যবাধকতায় কয়েকটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি । ড. মনমোহন সিং উদার অর্থনীতির প্রবক্তা হলেও সার্বিকভাবে তিনি শরীকদের চাপেই তা প্রয়োগ করতে পারেননি ।

২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদীর দল বিজেপি এককভাবে ক্ষমতায় আসে । যদিও তাদের সঙ্গে এনডিএ জোট ছিল । তবু মোদী সরকার এককভাবে ক্ষমতায় আসার ফলে অনেক সিদ্ধান্ত তিনি জোর করে শরীকদের উপর চাপিয়ে দিয়েছেন । শরীকরা বিরক্তবোধ করলেও তাদের কিছু করার ছিল না । এর ফলে দেশজুড়ে হিন্দুত্ববাদীরা বেলাগাম হয়েছে তারা যা খুশি তাই করে যাচ্ছে । আমাদের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ তার ব্যতিক্রম নয় । এখানেও দাড়িভিটে একটি হাইস্কুলকে দিনের দিন বন্ধ রাখা হয়েছে ; সরকার প্রশাসন নিরব । কোনো পদক্ষেপ নিতেই পারছে না । আসলে হিন্দুত্ববাদীদের মোকাবিলা করার মত সাহস শক্তি কোনোটাই নেই রাজ্যের শাসক দল তৃণমূলের । আজ যদি বামেরা ক্ষমতায় থাকত তাহলে দেখা যেত এই সব সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলি পাততাড়ি গুটিয়ে পালাচ্ছে ।

আজকে আমাদের সামনে মূল সমস্যা হিসেবে হাজির হয়েছে দেশের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান অটুট থাকবে কি না ? দেশের মানুষের বাক স্বাধীনতা থাকবে কি না ? মানুষের গোপনীয়তার উপর সরকারে হস্তক্ষেপ চলতে দেওয়া যাবে কি না ? বর্তমান সময়ে মানুষের চেয়ে গরুর দাম বেশি । গরুর মৃত্যু নিয়ে যত হইচই হচ্ছে একজন নাম করা পুলিশ অফিসারের মৃত্যু নিয়ে সেভাবে তদন্তই হচ্ছে না । দেশে আচ্ছে দিন আসার বদলে দেশজুড়ে  এক শ্রেণির মানুষের উন্মত্ততা চলছে । রাম মন্দিরের জিগির তুলে দেশজুড়ে অশান্তি বাধানোর চেষ্টা হচ্ছে । উন্নয়ন নয় , ঐতিহাসিক স্থানের নাম বদলে নয়া উন্নয়নের শ্লোগান তৈরি হয়েছে । কয়েক বছর ধরে দেশজুড়ে যে সংকেত দেওয়া হচ্ছে তাতে আগামী দিনে দিল্লিতে বিজেপি সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে দেশের সংকট যে আরও বাড়বে তা নিয়ে সন্দেহ নেই ।

তাই এখনই মুক্তির পথ খুঁজতে হবে । কোন পথে আসবে সেই মুক্তি ? মনে রাখতে হবে আমাদের দেশের ৭০ শতাংশ মানুষ বিজেপি বিরোধী । গত লোকসভা নির্বাচনে বিশাল গরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এলেও দেশের মাত্র ৩১ শতাংশ মানুষ সেদিন মোদীকে সমর্থন করেছিল । প্রাপ্ত ভোটের ৬৯ শতাংশ ছিল মোদী বিরোধী তা সত্ত্বে একক গরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছিল বিজেপি । এর কারণ ছিল বিজেপি বিরোধী ভোট ভাগ হয়ে যাওয়া । উত্তরপ্রদেশের মায়াবতী , অখিলেশ , কংগ্রেস আলাদা আলাদভাবে লড়াই করার ফলে বিজেপি একাই ৭৩টি আসনে জয়লাভ করেছিল । অন্যদিকে মধ্যভারত ও পশ্চিমভারতে বিজেপি এককভাবে জয়ী হয়েছিল কারণ বিজেপি বিরোধী ভোট এক বাক্সে আনা যায়নি ।

তাই ২০১৯ –এর লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলিকে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই-এ সামিল করতে হবে । ভোট ভাগাভাগি বন্ধ করতে পারলে বিজেপির বিজয় রথ যে থামিয়ে দেওয়া যায় তা অনেকবার প্রমাণিত হয়েছে । কংগ্রেস দল সে চেষ্টা বহুবার করেছে । সোনিয়া গান্ধী দেশের প্রধানমন্ত্রী না হয়ে ড. মনমোহন সিংহের মত অরাজনৈতিক ব্যক্তিকে প্রধানমন্ত্রী করে ছিলেন । একমাত্র কংগ্রেসই এটা করতে পারে ।

বিজেপি বিরোধী বিশ্বাসযোগ্য জোট গড়তে হলে অবশ্যই জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন জোট গঠন করতে হবে । রাহুল গান্ধীকে সামনে রেখে এই জোট করতে না পারলে তা মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাবে কিনা সন্দেহ রয়েছে । আমাদের মনে রাখতে হবে দেশের প্রায় ৩০০টি আসনে কংগ্রেস ও বিজেপির বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াই হবে । তাই কংগ্রেসকে বাদ দিয়ে যারা আলাদা করে ফেডারেল ফ্রন্ট করার চেষ্টা করছে তারা আসলে বিজেপির সুবিধা করে দিচ্ছে । দেশের যে যে রাজনৈতিক দল ফেডারেল ফ্রন্টের হয়ে সওয়াল করছে তারা সবাই আসলে বিজেপিকে পুনরায় দিল্লির মসনদে বসানোর জন্যই এটা করছে ।

বেশ কয়েক বছর আগে জ্যোতিবাবুর নেতৃত্বাধীন তৃতীয় ফ্রন্ট গড়ার চেষ্টা হয়েছিল সেই তৃতীয় ফ্রন্টের কাজ ছিল কংগ্রেসকে দিল্লিতে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখা । ওই সময়কালের রাজনীতির দিকে তাকালে দেখতে পাওয়া যায় কংগ্রেস যখনই সংকটে পড়েছে তখনই জ্যোতিবাবুর সিপিএম সেই সংকট থেকে কংগ্রেসকে বাঁচাতে এগিয়ে এসেছে । আর আজ যারা ফেডারেল ফ্রন্টের কথা বলছেন তারা আসলে বিজেপিকেই পেছন দরজা দিয়ে ক্ষমতায় আনার চেষ্টা করছে । এই ফ্রন্টের নামে প্রার্থী দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করা হবে । আর বিজেপি বিরোধী ভোট ভাগ করা সম্ভব হবে । এতে বিজেপিরই সুবিধা হবে বেশি ।

তাই সংকটের মুহুর্তে আমাদেরকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে বিজেপি বিরোধী ভোট যেন ভাগ না হয় । সেদিকে লক্ষ্য রেখেই যারা সত্যিকার বিজেপি বিরোধী কিংবা যারা দেশে সংবিধানের শাসন চালু রাখতে চান তারা সকলেই এক জোট হয়ে বিজেপি বিরোধিতা করতে হবে ।  তবে মনে রাখতে হবে বিজেপি বিরোধী জোটকে মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য –গ্রহণযোগ্য করতে হলে রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বেই জোট করতে হবে । দেশের ৩০০ টি আসনে বিজেপির সঙ্গে সরাসরি লড়াই হবে কংগ্রেসের । জাতীয় কংগ্রেস ৬২ বছরে এদেশকে যা দিয়েছে তা অন্য কেউ তা দিতে পারেনি । দেশ গঠনে জাতীয় কংগ্রেসের যে অবদান রয়েছে তাতে দেশের মানুষ এখনও বিশ্বাস করে বিজেপির বিকল্প একমাত্র কংগ্রেসই ।


শেয়ার করুন
  • 159
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সম্পর্কিত নিবন্ধ

Leave a Comment