অন্যান্য 

সংখ্যালঘুদের সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করার দাবিতে সরব হতে হবে

শেয়ার করুন
  • 67
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সেখ ইবাদুল ইসলাম : আজ ১৮ ডিসেম্বর সংখ্যালঘু দিবস । আমাদের দেশে সংখ্যালঘু বলতে শুধু মাত্র মুসলিমদের বোঝায় না । সংখ্যালঘু বলতে ভাষাগত সংখ্যালঘু ও ধর্মগত সংখ্যালঘু বোঝায় । এদের মধ্যে রয়েছে মুসলিম , খ্রিষ্টান , শিখ ,বৌদ্ধ , জৈন পারসি প্রভৃতি সম্প্রদায় । আর আমাদের দেশের গণপরিষদের সদস্যরা অনেক আগেই চিন্তা করেছিলেন একদিন আসবে যেদিন দেশের সংখ্যালঘুদের অধিকার বিপন্ন হতে পারে । তাই সংবিধানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় মৌলিক অধিকারের মধ্যে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে সংখ্যালঘুদের অধিকারের কথা । কেন মৌলিক অধিকারে লিপিবদ্ধ করা হল ? কারণ মৌলিক অধিকার খুব সহজে পরিবর্তন করা যায় না । তার পরিবর্তন করতে হলে ক্ষমতাসীন কেন্দ্র সরকারের সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন । আর রাজ্য সরকারগুলি যদি মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য নয় এমন কোনো আইন তৈরি করে তাহলে তা উচ্চ-আদালতকে খারিজ করে দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে । সুতরাং সংবিধান প্রণেতারা সব দিক দিয়েই মৌলিক অধিকারকে সুরক্ষিত করে গেছেন । আর মৌলিক অধিকারের মধ্যে সংখ্যালঘুদের অধিকার দেওয়া হয়েছে ।

সংবিধানে ৩০ নং ধারায় সংখ্যালঘুদের মৌলিক অধিকারের বিষয়টি আলোচনা করা হয়েছে । দুঃখের বিষয় হল , আমরা সংখ্যালঘুদের এই অধিকারগুলি সম্পর্কে ভালভাবে জানি না বা জানতে চেষ্টা করি না । আর না জেনে অনেক কথা আমরা বলতে থাকি । যেমন, সংখ্যালঘুদের শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান গড়ার সংবিধান যে অধিকার দিয়েছে সেটা আমরা অনেক সময় ব্যক্তি স্বার্থে তার বিরোধিতা করতে থাকি ।

কিন্ত ঘটনা হল ,আমরা নিজেরা যদি সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে সাংবিধানিক ক্ষমতা ব্যবহার না করে সরকারের অনুগ্রহ পাওয়ার লক্ষ্যে কাজ করি তাহলে আমাদের উপর আরও বেশি আঘাত আসতে পারে । সম্প্রতি আমাদের রাজ্যে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনের বৈধতা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা চলছে । কারণ মাদ্রাসাগুলিকে সংখ্যালঘু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা দিয়েছে রাজ্য সরকার । এই অবস্থায় সাংবিধানিক অধিকার মতে সংখ্যালঘু প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করার দায়িত্ব সংখ্যালঘুদের সেখানে সরকার নাক গলাতে পারে না । সংবিধান মতে , সংখ্যালঘু শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলিকে কোনোভাবেই আর্থিক সাহায্য থেকে বঞ্চিত করতে পারবে না সরকার । সংবিধানে এই সংস্থান থাকা সত্ত্বে আমাদের সমাজে এই মামলা নিয়ে মতভেদ তীব্র রয়েছে । বেশিরভাগ অংশ মনে করছে , মাদ্রাসাগুলি সংখ্যালঘু প্রতিষ্ঠান হিসেবে থেকেও সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকুক । আর একটা অংশ মনে করছে সাংবিধানিক অধিকার মত স্বাধীনসত্তা নিয়ে পরিচালিত হোক মাদ্রাসাগুলি ।

দুটি মতকে সম্মান দিয়ে কিছু কথা বলতে চাইছি । যারা বলছেন মাদ্রাসাগুলিকে সংখ্যালঘু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা অক্ষুন্ন রেখে তা সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকুক । তা সঠিক ভাবে বিষয়টি ভাবছেন । তারা ভাবছেন , সরকারের নিয়ন্ত্রণে না থাকলে মাদ্রাসাগুলি বন্ধ হয়ে যেতে পারে । আবার অন্য বিষয়টিও খতিয়ে দেখা উচিত , আমাদের দেশে এখন অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংখ্যালঘু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মর্যাদা পাওয়ায় তারা সরকারের কাছ থেকে সব রকম সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে । আলিগড় থেকে শুরু করে জামিয়া মিলিয়া ও কলকাতার আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় আছে । এদের ক্ষেত্রে কোনো অসুবিধা হচ্ছে না । কিন্ত আমরা যদি একবার ভাবতে থাকি সরকারের নিয়ন্ত্রণে থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালাবো তাহলে এই সব প্রতিষ্ঠানগুলির উপর থেকে অদূর ভবিষ্যতে সংখ্যালঘু স্ট্যাটাস তুলে দেওয়ার সম্ভাবনা আছে । কোয়ালিটি শিক্ষার কথা বলা হচ্ছে । আজ থেকে ৩০/ ৪০ বছর আগে যেসব শিক্ষক মহাশয়রা বিদ্যালয়ে পড়িয়েছেন কিংবা মাদ্রাসায় পড়িয়েছেন তাঁদের শিক্ষাগত মান খুব বেশি ছিল না ।

এমনকি আজকের দিনেও বেসরকারি স্কুলে যারা পড়াচ্ছেন তাদের মানও সরকারি স্কুলের শিক্ষকদের তুলনায় কমই । তা সত্ত্বে পড়াশোনার মানের দিক থেকে বেসরকারি স্কুলগুলি এগিয়ে রয়েছে । এক সময় হুগলি মাদ্রাসার ছাত্ররা উপমহাদেশের কৃতি সন্তান হিসেব আত্মপ্রকাশ করেছিল । আর আজ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় থাকার পরও সেই মাদ্রাসাটি ছাত্রের অভাবে বন্ধ করে দিতে হয়েছে । আমার মনে হয় হুগলি মাদ্রাসাটি যদি সংখ্যালঘুদের পরিচালনায় পরিচালিত হত তাহলে হয়তো তার ছাত্রের অভাব হত না । মেধা বিকাশে সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে সরকার পরিচালিত স্কুল ও মাদ্রাসাগুলি । তা না হলে রাজ্যের ৬১৪ টি সরকার সাহায্যপ্রাপ্ত মাদ্রাসাগুলি গুণগত শিক্ষা দিতে পারলে আল-আমীন মিশন বা মওলানা আজাদ অ্যাকাডেমির জন্ম হত না ।

সুতরাং সংখ্যালঘুদের সংবিধান যে অধিকার দিয়েছে সেই দাবিতে সরব হতে হবে । সাংবিধানিক অধিকার আমার প্রাপ্য এটাকে যথাযথভাবে আদায় করে নিতে হবে । সংবিধানের মৌলিক অধিকারের হস্তক্ষেপ হলে উচ্চ-আদালতে গিয়ে তা আদায় করতে হবে । সংখ্যালঘু দিবসে আমাদেরকে বেশি বেশি করে সাংবিধানিক অধিকারগুলিকে তুলে ধরতে হবে । রাজনৈতিক দল কিংবা নেতা-নেত্রীর পেছনে না দৌড়ে সাংবিধানিক অধিকার লড়াই সামিল হতে পারলে আখেরে লাভ হবে আমাদেরই । তাই আজ সংখ্যালঘু দিবসে আমাদের শপথ নিতে হবে যে সংবিধানে বর্নিত সংখ্যালঘুদের অধিকার আদায়ে সরব হব আমরা । এটাই হোক আজকের শপথ ।

 


শেয়ার করুন
  • 67
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সম্পর্কিত নিবন্ধ

Leave a Comment