অন্যান্য 

ইন্দিরা থেকে রাহুল গান্ধী দেশে যে সৌজন্যের রাজনীতির নজীর তৈরি করেছেন তা থেকে মোদী-অমিত শাহদের শিক্ষা নিতে হবে

শেয়ার করুন
  • 105
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সেখ ইবাদুল ইসলাম : মানুষের মন বড় বিচিত্র ! সময়ের সঙ্গে মানুষের মনের পরিবর্তন ঘটে যায় । ১১ ডিসেম্বরের আগের দিন পর্যন্ত যে রাজনীতিবিদ সম্পর্কে মানুষের কাছে আলাদা একটা ধারণা ছিল সেই রাজনীতিবিদ হঠাৎ-ই ১১ ডিসেম্বর বিকেল থেকে খলনায়কে পরিণত হয়ে যান । ১১ ডিসেম্বর ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে স্মরণীয় দিন হিসেবে চিহ্নিত হবে । কারণ এদিন সমগ্র দেশজুড়ে নিজেদেরকে অপ্রতিরোধ্য দাবি করা মোদী-অমিত শাহকে জনাদেশে মুথবে পড়তে হয়েছে । দেশের তাবড় তাবড় সাংবাদিকরা যখন বলছেন, মোদী-অমিতের কূটকৌশলের কাছে রাহুল গান্ধী এখনও পাপ্পুই ; ঠিক তখনই মধ্যপ্রদেশ-রাজস্থান-ছত্তিশগড়ে বিজেপির দূর্গে কংগ্রেস বিজয় নিশানা উড়িয়ে দিল । ভারতের প্রধানমন্ত্রী কে হবেন ? তা নিয়ে প্রখ্যাত রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা কখনও মমতা , কখনও অখিলেশ , কখনও মায়াবতী আবার চন্দ্রবাবু নাইডুর নাম করলেও রাহুল গান্ধী প্রধানমন্ত্রীর দাবিদার হতে পারেন এই সহজ কথাটি বলতে চাননি আজকের রাজনৈতিক ভাষ্যকাররা । কারণ তাঁদের মতে রাহুল নাকি এখনও পাপ্পু । তাঁর রাজনৈতিক মেধা নিয়ে তাঁদের প্রশ্ন ছিল । ওই সব স্বঘোষিত রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আসলে সুকৌশলে কংগ্রেসকে এড়িয়ে যেতে শুরু করেছিল ।

দেশের প্রথম সারির একটিও সংবাদমাধ্যম রাহুল গান্ধীর রাজনৈতিক মেধার প্রশংসা করেনি । এমনকি মোদীজি তাঁকে পাপ্পু বলে সম্বোধন করার পর ; সেটাই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে বিশেষণে পরিণত হয়ে যায় । নেহেরু থেকে ইন্দিরা গান্ধীকে মোদী-অমিত শাহরা ব্যক্তি আক্রমণ করে চলেছেন , নিরব দেশের সংবাদ-মাধ্যম । বরং মোদী-অমিত শাহদের সঙ্গে নিরবে কিংবা সরবে অনেক সংবাদ-মাধ্যম গান্ধী পরিবার এবং নেহেরু ও ইন্দিরার সমালোচনাকে ঘুরিয়ে সমর্থন করেছে । দু একটি সংবাদ মাধ্যম বাদ দিলে আর কেউ দেশের রাজনীতিতে নেহেরু-গান্ধী পরিবারের ভূমিকাকে বড় করে দেখায়নি । মনে হচ্ছিল যেন দেশের জন্য নেহেরু-ইন্দিরাজি কোনো কাজ করে যাননি । একজনও সাহসী সাংবাদিক বলতে বা লিখতে পারেননি যে ইন্দিরা গান্ধী শুধু মাত্র ব্যাঙ্ক জাতীয়করণ করে সমাজের নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য যা করে গেছেন তা দেশের রাজনীতিতে আগামী দিনেও কেউ করতে পারবে না । এটা বলারও সাহস হয়নি মোদীজি নোট-বন্দী করে দেশের অর্থনীতির যে সর্বনাশ তিনি করেছেন তাঁর আগে আর কোনো প্রধানমন্ত্রী এই সর্বনাশ করেননি । আর নেহেরুজির বিরুদ্ধে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ নাগরিকরা একটা প্রশ্নও তুলতে পারবেন না । কারণ দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি দেশ গড়ার কাজে যে আত্মত্যাগ করে গেছেন তা কল্পনাতীত ।

রাহুল গান্ধী সেই পরিবারের সন্তান । যে পরিবার দেশের জন্য তিনটি প্রাণ উৎসর্গ করে গেছেন । খুব ছোটবেলায় স্কুলে বসে শুনেছিল ঠাকুমা দেহরক্ষীর হাতেই গুলিবিদ্ধ হয়েছেন । তার কয়েক বছর আগেই রাহুল দেখেছেন তাঁর কাকা হঠাৎ-ই চলে গেলেন । কাকা গেলেন , ঠাকুমা চলে গেলেন । বাবাও মাত্র সাত বছরের ব্যবধানে চলে গেলেন । সন্ত্রাসীদের বোমায় ছিন্নভিন্ন বাবার লাশ । তারপরও একজন সন্তান দেশের স্বার্থে দেশের মানুষের জন্য দিন রাত ছুটে বেড়াচ্ছেন ।  জীবনের ঝুকি নিয়েও রাহুল গান্ধী দমে যাননি । ভারতের বৃহৎ সংবাদমাধ্যম এগুলি দেখেও তাঁর প্রশংসা করেনি । তবু তিনি মানুষের কাছ থেকে বিচ্যুত হননি । বরং আরও বেশি করে মানুষের পাশে চলে গেছেন । দলিত সংখ্যালঘু থেকে শুরু করে কৃষক-শ্রমিক সবার পাশে গিয়ে আত্মীয়ের মমত্ব নিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন ।

মিডিয়া তাঁকে পাত্তা না দিলেও খুব নিরবে মানুষের আস্থাভাজন তিনি হয়ে উঠেছেন । তার প্রমাণ পাওয়া গেল তিন রাজ্যের নির্বাচনে । রাজস্থানে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর সরকার পরিবর্তন হয় এটা স্বাভাবিক । কিন্ত মধ্যপ্রদেশ – ছত্তিশগড়ে ১৫ বছরের বিজেপির শাসনকে পরির্তন করল মানুষ তার নেপথ্যে অবশ্যই রাহুলের জনসংযোগ ও পরিশ্রম কাজ করেছে । এই দুটি রাজ্যে বিজেপির এবং আরএসএসের সংগঠন শক্তিশালী । পাড়ায় পাড়ায় তারাই শেষ কথা বলে । তাহলে মানুষ কতখানি ক্ষিপ্ত হলে সরকারের বিরুদ্ধে জনরোষ আছড়ে পড়ে পরিবর্তন হল এই দুই রাজ্যে । হারতে হারতে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার পরও এই বিশাল জয়ে কোনো উচ্ছ্বাস দেখা গেল না সোনিয়ার পুত্রের চোখে মুখে ।

বরং সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি ষ্পষ্ট বললেন, বিজেপি মুক্ত ভারত চাই না , বিজেপিকে হারাতে চাই । আর মোদীজির শ্লোগান কংগ্রেস মুক্ত ভারত তিনি গড়বেন । কংগ্রেসের অপরাধ সে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলে , জাতীয় সংহতির কথা বলে , সম্প্রীতির কথা বলে ; বিবিধের মাঝে মিলনের কথা বলে । তাই মোদীজি কংগ্রেস মুক্ত ভারত গড়ার শপথ নিয়েছিলেন । আর কংগ্রেস সভাপতিকে পাপ্পু বলে ব্যঙ্গ করতে তাঁর বাধতো না ।

ঘটনাচক্রে সেই পাপ্পুই   স্বঘোষিত রাজনৈতিক চাণক্য মোদী-অমিত শাহকে একটা-দুটো নয় তিনটি রাজ্য কেড়ে নিয়ে প্রমাণ করলেন মানুষ সবার উপরে তার উপর আর কেউ নেই ।

এখন অবশ্য গণমাধ্যমগুলিতে রাহুলের রাজনৈতিক মেধা নিয়ে চর্চা শুরু হয়ে গেছে । রাজনৈতিক ভাষ্যকার বলতে শুরু করেছেন পরিপক্ক রাজনীতিবিদ হয়ে উঠেছেন রাহুল গান্ধী । কারণ তিন রাজ্যে জয়ের পর তিনি নাকি বিজেপিকে কোনো আক্রমণ করেননি । মোদীর বিরুদ্ধে যা বলেছেন তা নিতান্তই রাজনীতির কথা । বরং রাজনৈতিক সৌজন্যে মোদীকে হারিয়ে দিয়েছেন রাহুল গান্ধী । সম্মানীয় রাজনৈতিক ভাষ্যকারদের প্রতি সম্মান জানিয়ে বলছি , গান্ধী পরিবার ইন্দিরা গান্ধী থেকে শুরু করে সোনিয়া গান্ধী পর্য্ন্ত যে সৌজন্যের রাজনীতি করেছেন তা দেশের সব রাজনৈতিক দলের নেতাদের জন্য শিক্ষনীয় ।


শেয়ার করুন
  • 105
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সম্পর্কিত নিবন্ধ

Leave a Comment