দেশ 

জার্মান থেকে প্রযুক্তিবিদ, আমেরিকা থেকে খনন যন্ত্র এনেও যখন উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি, তখন ওয়াকিল হাসানরা যুদ্ধ জয় করলেন ৪১ জন শ্রমিককে উদ্ধার করে নজির সৃষ্টি করলেন! প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছা বার্তায় ভাসছে গোটা দেশ, ওয়াকিলদের কথা কেউ কি বলছেন?

শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বাংলার জনরব ডেস্ক : উত্তর কাশির সুড়ঙ্গে আটকে পড়া ৪১ জন শ্রমিককে উদ্ধার করার জন্য জার্মানি থেকে প্রযুক্তিবিদ এবং আমেরিকা থেকে খনন যন্ত্র আনা হয়েছিল সরকারের লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয় করে কিন্তু সফল হয়নি ৪১ জন শ্রমিক সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত ম্যানুয়াল এই ভরসা করতে হলো উত্তরাখণ্ডের ধামি সরকারকে। চারধাম প্রকল্প যেহেতু হিন্দুদের গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রজেক্ট স্বাভাবিকভাবেই এই প্রকল্পে যারা কাজ করছিলেন তারা সকলেই অমুসলিম সম্প্রদায়ের। আমাদের মনে হয় সরকারের ওই ইচ্ছা ছিল সুরঙ্গ থেকে শ্রমিকদের বের করার সময় যেন কোন মুসলিম ব্যক্তির ছায়া না পরে সেজন্যেই দিল্লির মতো রাজধানী শহরে কোকিল হাসানের মত সুড়ঙ্গে ঢোকার সমস্ত রকম বিষয় জানা সত্ত্বেও ওয়াকিল হাসানকে ডাকা হয়নি।

মানুষ চাইলেই তো হবে না মানুষকে যিনি পরিচালনা করেন সেই স্রষ্টা অলক্ষে হাসছিলেন আমেরিকা থেকে খনন যন্ত্র এসেছে জার্মানি থেকে এসেছে প্রযুক্তিবিদ গদি মিডিয়ার দৌলতেই ঢালাও প্রচার চলছে কিন্তু ৪১ জন শ্রমিক সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন নি। সরকারের সব প্রচেষ্টা যখন ব্যর্থ ঠিক সেই সময় মনে পড়ে গেল দিল্লির রাস্তায় কাজ করা এক মুসলিম যুবকের কথা। নাম ওয়াকিল হাসান।

Advertisement

৪১ জন শ্রমিককে সুরঙ্গ থেকে বের করে আনার দায়িত্ব দেয়া হলো ওয়াকিলকে, দিল্লি থেকে ছুটে এলেন ওয়াকিল সঙ্গে নিয়ে এলেন ১১ জন সঙ্গীকে। শেষ পর্যন্ত এই ওয়াকিল এবং তার ১১ জন সঙ্গী ঘটনাচক্রে যাদের অধিকাংশই এদেশের বঞ্চিত লাঞ্ছিত অবহেলিত সংখ্যালঘু সমাজের প্রতিনিধি। তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে ইদুররা যেভাবে গর্ত করে সেই কায়দায় সুড়ঙ্গ থেকে বের করে নিয়ে আসলো ৪১ জন শ্রমিককে।

দীর্ঘ ১৭ দিনের উৎকণ্ঠার অবসান ঘটিয়ে মঙ্গলবার রাত 8 টা 38 মিনিটে ৪১ সন শ্রমিককে বের করে নিয়ে এলেন ওয়াকিল হাসানের সহযোদ্ধারা যে এক কথায় ইতিহাস। প্রধানমন্ত্রী শুভেচ্ছা জানিয়েছেন নিজের সরকারের কৃতিত্ব জাহির করেছেন কিন্তু একবারও কি তিনি বলবেন দেশে বিদ্বেষ ছড়ানো সেই সকল মানুষদের প্রতি বিদ্বেষ নয় ওয়াকিল হাসানদের মতো মানুষ হও। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মুখ থেকে এখনো পর্যন্ত এই ধরনের বার্তা আমরা শুনতে পাইনি কিন্তু এ কথা ঠিকই ওয়াকিল হাসান রা এ কাজ করে যাবে।

৪১ জন শ্রমিককে ১৭ দিন পর সুরঙ্গ থেকে বের করার পর কলকাতা থেকে প্রকাশিত ডিজিটাল আনন্দবাজারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ওয়াকিল হাসান বলেছেন,তাঁর নেতৃত্বে থাকা ১২ জনের দলের কাজটা ভীষণ ‘চ্যালেঞ্জিং’ ছিল। কলকাতা থেকে প্রায় ২০০০ কিলোমিটার দূরের উত্তরকাশীতে থাকা ওয়াকিলের কণ্ঠস্বরে তখন স্পষ্ট যুদ্ধ জয়ের স্বস্তি। প্রায় এক শ্বাসেই জানালেন, মানুষ বাঁচানোর কাজ তাঁরা এই প্রথম করলেন। পাশাপাশি, দেশের জন্য কিছু একটা করতে পেরেছেন বলে যে ‘গর্ব’ অনুভব করছেন ওয়াকিলেরা, সে কথাও বলতে ভুললেন না।

ওয়াকিল বললেন, ‘‘ছোট জায়গায় বসে কাজ করা খুব চ্যালেঞ্জিং ছিল। ওর মধ্যেই বসে কেটে কেটে এগিয়ে যাওয়া, মাঝে মাঝে পাথর চলে এলে সেটা কাটা, পাইপ সরানো, মাটি সরানো.. সেই মাটি বাইরে বার করা। শেষ পর্যায়ের কাজটা খুব, খুবই কঠিন ছিল।’’ তার পরেই স্বগতোক্তির মতো ভেসে এল, ‘‘সব কাজ শেষ হয়ে গিয়েছে। ভাল ভাবেই সব শেষ হল।’’

দিল্লির বাসিন্দা ওয়াকিল। রাজধানী শহরেই ‘ম্যানুয়াল জ্যাক পুশিং’-এর কাজ করেন। মাটির তলায় জলের লাইন, কেবল লাইন বসানোর কাজ। ঠিকাদারি সংস্থায়। ওয়াকিলের দলের কেউ ১০ বছর ধরে এই কাজ করছেন। কেউ বা বছর ২০। কিন্তু এমন প্রাণ বাঁচানোর কাজ কখনও করেননি। এ বারই প্রথম ডাক এল। ওয়াকিল বলছিলেন, ‘‘৪১ জনের জীবন ওখানে আটকে আছে ভেবে আমাদের মধ্যে এমন একটা জেদ চেপে গিয়েছিল যে, কোনও না কোনও ভাবে ওঁদের বাঁচিয়ে আনার সংকল্প নিয়েছিলাম প্রত্যেকে। টিমের মধ্যে কারও এই ধরনের প্রাণ বাঁচানোর কোনও অভিজ্ঞতা ছিল না। এত দিনের মধ্যে সব থেকে চ্যালেঞ্জিং কাজ। দেশের জন্য কিছু করার একটা সুযোগ পেয়েছি, এটা ভেবেই করলাম। যুদ্ধটা জিতলামও।’’

যে পদ্ধতিতে কাজ করেছেন ওয়াকিলেরা, তাকে বলে ‘ব়্যাট হোল মাইনিং’। অর্থাৎ, ইঁদুরের মতো গর্ত করে এগিয়ে যাওয়া। ওয়াকিলের নেতৃত্বে ১২ জনের একটি দল ওই কাজটি করে। ‘ব়্যাট হোল মাইনিং’ পদ্ধতি খনি থেকে কাঁচামাল উত্তোলনের জন্য প্রয়োগ করা হয়। বিশেষত কয়লা খনিতে এই প্রক্রিয়া খুবই প্রচলিত। এর মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ, অভিজ্ঞ শ্রমিকেরা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে খনিতে নামেন। তাঁরা অল্প জায়গা নিয়ে সরু গর্ত খুঁড়তে খুঁড়তে এগিয়ে চলেন। ঠিক যেমন করে গর্ত খোঁড়ে ইঁদুর। প্রয়োজনীয় কয়লা তুলে আবার ওই একই পদ্ধতিতে বেরিয়ে আসেন তাঁরা। আমেরিকার যন্ত্র বিকল হওয়ার পরে উত্তরকাশীর সুড়ঙ্গে শ্রমিকদের বার করতে মনুষ্য-নির্ভর এই পদ্ধতিই অবলম্বন করা হয়েছিল। কিন্তু এ কাজে তেমন পারিশ্রমিক নেই। যদিও ওয়াকিল আনন্দবাজার অনলাইনকে বললেন, ‘‘সব কাজ পয়সার জন্য হয় না। এই কাজ মানুষের জন্য। এখানে যেমন মানুষের জীবন জড়িয়ে ছিল, তেমনই জড়িয়ে ছিল দেশবাসীর আশা। সেই আশা পূরণ করা সহজ ছিল না। কিন্তু আমরাও আত্মবিশ্বাসী ছিলাম যে, ২৪ থেকে ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে কাজ শেষ করব। পেরেছি। সকলের আশা পূরণ করতে পেরে গর্ব হচ্ছে। দেশকে, দেশবাসীকে রক্ষা করতে সীমান্তে সেনা লড়াই করে। আজ আমাদের মধ্যে সেই অনুভূতি হচ্ছে। মনে হচ্ছে, আমরাও দেশের জন্য কিছু করলাম।’’

টানা প্রায় ২৮ ঘণ্টা কাজ করেছেন ওয়াকিলেরা। কিন্তু গোটাটাই পরিকল্পনা করে। ওয়াকিল বলছিলেন, ‘’১২ জনের প্রত্যেককে আলাদা আলাদা সময় অনুযায়ী পাঠানো হয়েছে কাজে। কাজের গতি যাতে না কমে, সেই মতো পরিকল্পনা করে এগিয়েছি। যাতে কাজ চলতে থাকে। আমাদের ক্লান্তির জন্য যাতে কাজের গতি কমে না যায়, সে কথা ভেবেই এটা করেছিলাম।’’ কখনও মনে হয়নি যুদ্ধটা হেরে যেতে পারেন? ফোনের ওপারে ওয়াকিলের কণ্ঠস্বর বেশ দৃঢ় শোনাল। বললেন, ‘‘কখনই ভাবিনি যে, এই কাজটা করতে পারব না। বা এই কাজে আমরা ব্যর্থ হব। আমরা ধরেই নিয়েছিলাম, এই কাজটা যে কোনও ভাবে করতে হবে। এবং জিততে হবে। টিমের সকলকে বলেছিলাম, এই কাজ করতে না পারার কোনও কারণ নেই। এক বারও ভাবিনি যে, করতে পারব না। কেউ আট ঘণ্টা কাজ করেছে টানা। কেউ বা ১০ ঘণ্টা। আমাদের আগের ওই সব অভিজ্ঞতা যে এ ভাবে ৪১ জনের প্রাণ বাঁচাবে, আগে ভাবিনি।’’

ওয়াকিলের দলের ১২ জন ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে এগিয়েছিলে সুড়ঙ্গের ভিতরে। সেখানে পৌঁছে এক জন দেওয়াল খুঁড়তে থাকেন। অন্য জন সেই ধ্বংসস্তূপ সংগ্রহ করেন এবং তৃতীয় জন তা চাকা লাগানো গাড়িতে তুলে দেন। সেই গাড়ি ধ্বংসস্তূপ সুড়ঙ্গের বাইরে নিয়ে যায়। শেয পর্যন্ত এই পদ্ধতিতেই এসেছে সাফল্য।

গত ১২ নভেম্বর ভোরে উত্তরকাশীর সিল্কিয়ারা সুড়ঙ্গে ধস নামে। ভিতরে আটকে পড়েন ৪১ জন শ্রমিক। এত দিন ধরে তাঁদের বার করার জন্য নানা ভাবে চেষ্টা করা হচ্ছিল। কিন্তু ধ্বংসস্তূপ খুঁড়ে শ্রমিকদের কাছে পৌঁছনো সম্ভব হচ্ছিল না কিছুতেই।

ওয়াকিল হাসানদের মতোই এদেশের প্রায় অধিকাংশ চ্যালেঞ্জিং কাজগুলোকে নিরবে করে যান সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষেরা। মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েও মৃত্যুকে জয় করে তারা এগিয়ে যায় কোথাও তারা স্বীকৃতির আশা করেনা। কিন্তু দুঃখের হলেও সত্য স্বাধীনতার ৭৭ বছর পর এদেশের সংখ্যালঘু মুসলিমদের আজও নিজেদেরকে দেশপ্রেমিক প্রমাণ দিতে হয়। ওয়াকিল হাসানের এই আত্মত্যাগ, ওয়াকিল হাসানের এই দেশপ্রেম কি কোনদিন ইতিহাসে ঠাঁই পাবে না?

ঋণ স্বীকার :  ডিজিটাল আনন্দবাজার।


শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সম্পর্কিত নিবন্ধ