অন্যান্য 

“ আওয়াজ “ সংগঠন যা করা যেতে এক দশক পূর্বে , তাই-ই হলো অবশেষে ! এ-ও কি এক মহা ভুল ? : ড. আবদুস সাত্তার

শেয়ার করুন
  • 137
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লা ডিসেম্বর কলকাতার মৌলালী যুবকেন্দ্রে মূলত বামপন্থী সংখ্যালঘু সমাজের বুদ্ধিজীবীদের নেতৃত্বেআওয়াজনামে এক সংগঠনের জন্ম হলো ২০০৬ সালে সাচার প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার পর তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল সিপিআই( এম)- সংখ্যালঘু নেতাদের একাংশ দাবি করেছিলেন দলের অভ্যন্তরে শাখা সংগঠন হিসাবে এক সংগঠন গড়ার ; কিন্ত শাসক দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতাদের চাপেই তা সম্ভব হয়নি এমনকি জ্যোতিবাবু নিজেও দলের অভ্যন্তরে মুসলিমদের জন্য আলাদা একটা ফোরামের পক্ষেই সওয়াল করেছিলেন তা সত্ত্বে আবদুর রেজ্জাক মোল্লা, হাসিম আবদুল হালিম, মুহাম্মদ মসিহ আবদুস সাত্তারদের দাবি মেনেআওয়াজনামে সংগঠন করতে দেওয়া হয়নি আজ পার্টি ক্ষমতা হারিয়ে দিশেহারা রেজ্জাক মোল্লা দলে নেই , নেই মইনুল , নেই আবদুস সাত্তার , নেই হালিম সাহেব এমতাবস্থায় জন্ম হল সেই কাঙ্খিতআওয়াজ ‘-এর এই প্রেক্ষাপটেই আমরা কথা বলেছিলামআওয়াজসংগঠন গড়ে তোলার নেপথ্যের অন্যতম কারিগর . আবদুস সাত্তারের সঙ্গে তাঁর দেওয়া বিষয়ের সাক্ষাৎকারটি দুটি কিস্তিতে প্রকাশিত হবে আজ শেষ কিস্তি । 

প্রথম কিস্তির পর –

ছয় . রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টচার্য বিষয়টির গুরুত্ব বুঝতেন । সংখ্যালঘু মুসলিমরা যে পিছিয়ে আছেন , তাদের জন্য সরকারকে কাজ করতে হবে সেই বিষয়টি বারংবার বলতেন । বহুক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র , তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের অর্থ বরাদ্দ কাটছাঁট করে সংখ্যালঘু বিষয়ক ও মাদ্রাসা শিক্ষা দপ্তরকে দেওয়ার জন্য অর্থমন্ত্রীকে নির্দেশ দিয়েছিলেন । এমন কী পার্টির সব থেকে বড়ো সংখ্যালঘু নেতার আপত্তি অগ্রাহ্য করে ভারতের সব থেকে প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কলকাতা মাদ্রাসাকে আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন । তাঁর সদিচ্ছার বিবরন লিপিবদ্ধ আছে –‘ সংখ্যালঘু উন্নয়ন ‘ শীর্ষক সরকার কর্তৃক প্রকাশিত পুস্তিকায় । গবেষক-অনুসন্ধানী পাঠক স্বাধীনতা পরবর্তী পশ্চিমবঙ্গে যতগুলি মন্ত্রিসভা হয়েছে , তার মধ্যে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের  নেতৃত্বাধীন ২০০৬-২০১১ মন্ত্রিসভা সংখ্যালঘু উন্নয়নের ক্ষেত্রে কেন ব্যতিক্রমী তার বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা অবশ্যই করতে পারেন । শিক্ষিত-সংস্কৃতিপ্রবণ এই মানুষটির প্রশংসা অবশ্যই প্রাপ্য । অথচ নিয়তির পরিহাস এই যে , সংখ্যালঘু মুসলিমদের দ্বারা তিনিই সবথেকে বেশি নিন্দিত হলেন !

তৃণমূল কংগ্রেস সরকার আট বছর অতিক্রম করেছে । এটাই তো সূবর্ণ সময় তুলনামূলক আলোচনা করার । হোক না বস্তুনিষ্ঠ সামগ্রিক আলোচনা ; ইতিহাসের কষ্ঠিপাথরে সবই যাচাই হয়ে যাবে । নিউটাউনে আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ও তৃতীয় হজ্ব হাউস নির্মাণ ছাড়া সংখ্যালঘু মুসলিমদের জীবন মানের আর কোন উন্নয়ন এই সরকার করেছে ? আবার এ-ও মনে রাখতে হবে, নিউটাউনের শহর বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট সরকারেরই দান । সংখ্যালঘু মুসলিমদের উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা বির্তক থাকতেই পারে । কিন্ত একটি বিষয়ে বির্তকের কোন অবকাশ নেই যে , তৃণমূল সরকারের এই আট বছরের কাজ-কর্মে মৌলবাদ সাম্প্রদায়িক শক্তি রাজ্যে এক ভয়ঙ্কর সর্বনাশা বিপদ হিসেবে হাজির হয়েছে । এর ফলে সংখ্যালঘুদের জান -মাল ঈমানের নিরাপত্তা আজ এক বড় প্রশ্ন চিহ্নের মুখোমুখি ।

সাত . একদিকে সংখ্যালঘু ও মাদ্রাসা শিক্ষার উন্নয়নে বামফ্রন্টের মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম অপরদিকে এই সমস্ত গঠনমূলক কাজকে সাচার প্রতিবেদন-এর মাধ্যমে ‘ কিছুই হয়নি ‘-এর তত্ত্বকে সামনে রেখে বিরোধী দলগুলি পুঁজি-পোষিত সংবাদ-মাধ্যমে মানুষকে নানা ভাবে ভুল বোঝানোর কাজ করে চলেছে ।

জোর কদমে শুরু হয়েছে ধর্মকে রাজনীতির আঙিনায় যুক্ত করার খেলা । এই ধরনের পরিস্থিতিতে মানুষের সামনে সঠিক তথ্য তুলে ধরার জন্য পার্টির ‘ অনুমোদনহীন ‘ একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের জন্ম আমি দিতে বাধ্য হলাম । নাম : আওয়াজ । যদিও এটি সরকারী নিবন্ধীকরন কোনো সংগঠন ছিল না ।

আট . অবিভক্ত অন্ধপ্রদেশ সি.পি.আই (এম) সংখ্যালঘু  মানুষের নিরাপত্তা, উন্নয়ন সহ নানাবিধ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ‘ আওয়াজ ‘ নামে একটি সংগঠন গঠন করেছিল । সেই সংগঠনের সভায় বার কয়েক আমন্ত্রিত হয়ে আমি গিয়েছিলাম । এমন কী হায়দ্রাবাদের বিখ্যাত গান্ধী ভাবনে রাজ্যব্যাপী কনভেনশনেরও উদ্বোধন করেছিলাম । সেই নামেই এই রাজ্যের ক্ষেত্রেও নামকরণ করেছিলাম । এক সময়ে বামফ্রন্ট সরকারের প্রবল বিরোধী পশ্চিমবঙ্গ মাদ্রাসা ছাত্র ইউনিয়নের রাজ্যস্তরের পদাধিকারীগণ পরবর্তীকালে সংখ্যালঘু ও মাদ্রাসা শিক্ষার উন্নয়নের কাজকর্মে উৎসাহী হয়ে তাঁরা আমার সাথে যুক্ত হন । আমার পরামর্শ , সাহায্য-সহযোগিতায় শহিদুল ইসলাম , ড. ফজলুর হক মন্ডল ,আতিয়ার রহমান , শাহনওয়াজ হোসেন প্রমুখের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে ‘ আওয়াজ ‘ ।

বসিরহাট-এর পীরসাহেব সরফুল আমিন ও তাঁর পুত্র খোয়াইব আমিনও এর সঙ্গে যুক্ত হন । নেপথ্যে থেকে উৎপল দাসও নানাভাবে সাহায্য করেন। নেতৃত্বদানকারী ভূমিকায় শহিদুল ইসলাম । তাদেরই উদ্যোগে মুখ্যত উত্তর ২৪ পরগণার ব্লক স্তরে এই সংগঠন ভালোই সাড়া জাগিয়েছিল । সীমিত সামর্থ ও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বেশ কিছু সভার আয়োজন করাও সম্ভবপর হয় । ২০১১-এর বিধানসভা নির্বাচনের পূর্বে কেন্দ্রীয়ভাবে বসিরহাট টাউন হলের মাঠে ও বারাসতের রবীন্দ্র ভবনে বামফ্রন্টের সমর্থনে এক উপচে পড়া জমায়েত হয়েছিল ।

গৌতম দেব , অমিতাভ বসু , অমিতাভ নন্দীসহ অনেকেই অংশগ্রহণ করেছিলেন । বসিরহাটের সভায় হজরত মহম্মদ (সাঃ)কে নিয়ে গৌতম দেবের করা একটি উক্তি বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে সেই সময় বিরোধীরা বিরূপ প্রচারের অঙ্গও করেছিল ।

নয়. ২০১১-এর বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর সন্ত্রাস কবলিত হাড়োয়া বাজারে আওয়াজ-ই  প্রথম  এগিয়ে এসে সভা করেছিল । সভায় সাহিত্যিক আবুল বাশারও হাজির ছিলেন । কেননা, সেই সময় পার্টির ব্যানারে সভা করা সম্ভবপর হচ্ছিল না । পরবর্তীকালে এই সংগঠনকে আরো বিস্তৃততর রূপ দেওয়ার জন্য রাজ্য সম্পাদকমন্ডলীর এক সদস্যকে দু‘বার লিখিত প্রস্তাব প্রদান করা হয়েছিল । ‘ সমানাধিকার ‘-এর বিষয়টি ‘ প্রস্তাবিত নোট ‘-এ গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়ায় আমাকে শুনতে হয়েছিল – মনে রেখো মুসলিমদের সমানাধিকার দিলে , এ দেশটাকে তারা পাকিস্থান বানিয়ে ছাড়বে ।মুসলিমরা তো কারো সঙ্গে থাকতে পারে না । দেখছ না পাকিস্থান, বাংলাদেশের কী অবস্থা ? মুসলমানরা তো তিনটে বিয়ে করে ইত্যাদি ।

দশ. ইতোমধ্যে রাজ্যের মানুষের মতামত নিয়ে বামফ্রন্ট সরকার : একটি পর্যালোচনা ‘ শীর্ষক দলিল রাজ্য সম্মেলনে গৃহীত হলো । সংখ্যালঘু প্রশ্নে উপার্জনশীল কাজে , রাজনৈতিক –সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে সম্মিলিত করার ক্ষেত্রে খাটতির কথা উল্লেখ করে লেখা হলো-আসলে ­ষাটের দশক থেকে নিরাপত্তাজনিত বিষয়কে যে গুরুত্ব সহকারে আমরা বুঝলাম, নব্বই-এর দশকের পরবর্তী সময়ে ‘ পরিচয় ‘ ও ‘ অংশীদারিত্বে‘র যে দাবি উঠে আসে সে বিষয়ে যথার্থ অনুসন্ধান সাপেক্ষে রাজনৈতিক সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক দূর্বলতা দেখা দেয় ।  এখন প্রশ্ন হলো, তারপরে আরো একটি রাজ্য সম্মেলন হয়েছে । রাজনৈতিক- সাংগঠনিক ক্ষেত্রে কোনো দিক পরিবর্তন হয়েছে কি ?

এগোরো . পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি সম্ভবত বছর দুই পূর্বে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল , দেশের সমস্ত রাজ্যে সংখ্যালঘুদের নিয়ে সমাজের অন্যান্য অংশের মতো একটি সামাজিক সংগঠন গড়ে তোলা হবে । বিধানসভা নির্বাচনের পূর্বে কেরালায় এই ধরনের সংগঠনের জন্ম হয় ও নির্বাচনে পার্টি প্রভূত পরিমানে লাভবান হয় । অথচ এখানে তা করা যায়নি । কেন এবং কী কারণে ?

বারো . যা করা যেতে এক দশক পূর্বে , তাই-ই হলো অবশেষে ! এ-ও কি এক মহা ভুল ? আবার, মূল্যায়ন হলেও রাজনৈতিক –সাংগঠনিক ক্ষেত্রে সদিচ্ছা নীতিজনিত দৃষ্টিভঙ্গির কোনো মৌলিক পার্থক্য বিগত প্রায় চার বছরে রাজ্যের মানুষ বিশেষত সংখ্যালঘু মুসলিমরা দেখতে পেল না । দ্বিতীয়ত, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি প্রকাশিত পুস্তিকায়  আগামীদিনে রাজ্য সরকারে আসীন হলে  কি করা হবে , তার কোনো দিকনির্দেশ কি আছে ?  সংখ্যালঘুদের উন্নয়নে যাবতীয় মৌলিক কাজ বামফ্রন্ট সরকার করেছে , তৃণমূল কংগ্রেস সরকার সেই অর্থে কিছু করেনি বলেই কি চুপ থাকবেন ! তৃণমূল কংগ্রেসের ইশতেহার-এ দেওয়া প্রতিশ্রুতি কে , কোনদিন গুরুত্ব সহকারে দেখেছে ? তৃণমূল কংগ্রেস যা বলে তা করে না , যা বলে না তাই করে , এই তো অবস্থা ! সর্বোপরি নিরাপত্তার বিষয়টি । রাজ্যের বর্তমানে যা পরিবেশ তাতে করে সংখ্যাগুরুকেই ধরে রাখা যাচ্ছে না । বামফ্রন্টের ভোট শতাংশের হার তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের এই আট বছরের রাজনৈতিক রূপান্তরে এখন বিজেপি-র ঝুলিতে , অন্যদিকে বিজেপি-এর ভোট শতাংশের হার একটু কমবেশি বামফ্রন্টের ঝুলিতে ! আর সংখ্যালঘু মুসলিমদের কথন ! তবু , শতাব্দীর এক  অন্তহীন আগুন নিয়ে আশায় বুক বাঁধি !


শেয়ার করুন
  • 137
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সম্পর্কিত নিবন্ধ

Leave a Comment