কলকাতা 

গাজায় গণহত্যা বন্ধের দাবিতে প্রেস ক্লাবে ‘ফ্রেন্ডস অফ প্যালেস্টাইন’ এর সাংবাদিক সম্মেলন

শেয়ার করুন

গাজায় গণহত্যা বন্ধের দাবিতে প্রেস ক্লাবে ‘ফ্রেন্ডস অফ প্যালেস্টাইন’ এর সাংবাদিক সম্মেলন। আগামীকালের সমাবেশে সকলকে যোগদানের আহ্বান।

যুদ্ধ সংক্রান্ত আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় শিশু, নারী সহ নিরীহ মানুষদেরকে নির্বিচারে গণহত্যা করছে ইসরায়েল। মানবতা ও মানবাধিকারের ঠিকা নেওয়া বিশ্ব মোড়লরা সব দেখছে। কিন্তু যুদ্ধ বন্ধ করে নিরীহ মানুষদের বাঁচাতে কোনও পদক্ষেপ করছে না। উল্টে যুদ্ধবাজ ইসরায়েলের পাশে দাঁড়িয়ে সাহায্য দিচ্ছে আমেরিকা, ব্রিটেন, ফ্রান্সের মতো পশ্চিমা দেশগুলো। এভাবেই একরাশ ক্ষোভ উগরে দিয়ে অবিলম্বে যুদ্ধ বিরতির দাবিতে সোচ্চার হল ‘ফ্রেন্ডস অফ প্যালেস্টাইন’। বৃহস্পতিবার কলকাতা প্রেস ক্লাবে গর্জে উঠলেন এই অরাজনৈতিক শান্তিকামী ফোরামের সদস্যরা।

ফোরামের আহ্বায়ক আব্দুল আজীজ বলেন, গাজায় যা হচ্ছে তার সূত্রপাত ৭ অক্টোবর ২০২৩ নয়। ইসরায়েল এর শুরু করেছিল ১৯৪৮ সালের ১৪ মে। বিগত সাড়ে সাত দশক ধরে গাজা তথা ফিলিস্তিনিদের ওপর পাশবিকতা ও বর্বরতা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। ফিলিস্তিনিদেরকে তাদের ঘরবাড়ি থেকে উৎখাত করে শরণার্থী ও উদ্বাস্তুতে পরিণত করেছে তারা। হামাস মানে জঙ্গি নয়, হামাস মানে হল প্রতিরোধ। অথচ হামাসকে ‘সন্ত্রাসী’ বলে দাগিয়ে দিয়ে বিশ্ববাসীকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। গত ২৬ দিনের একতরফা যুদ্ধে প্রায় ৯ হাজার গাজাবাসীর প্রাণ কেড়ে নিয়েছে ইসরায়েলী বাহিনী। স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, শরণার্থী শিবির সর্বত্র বোমা মারছে। তাঁর কথায়, হিটলার ও নরেন্দ্র মোদির রাজনীতিক দর্শন একই। যদিও হিটলার ছিলেন ইহুদি নিধনকারী, আর মোদির পলিসি সম্পূর্ণ উল্টো।

Advertisement

অধ্যাপক রতন খাশনবিস বলেন, ১৯৪৮ সালে বেইনসাফি করে ইসরায়েলকে অবৈধ রাষ্ট্র হিসেবে ফিলিস্তিনের বুক চিরে বসিয়ে দিয়েছিল আমেরিকা, ব্রিটেন। তাঁর মতে, হামাসকে পছন্দ না হতে পারে, কিন্তু গাজায় তো শুধু হামাসের লোকরাই থাকে না। হামাসের অজুহাতে সেখানকার নিরীহ মানুষজনকে নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে কোন যুক্তিতে। গাজাবাসী কোথায় যাবে? বিশ্বের সবথেকে ঘনবসতিপূর্ণ উপত্যকা গাজা। যাকে আজ বিশ্বের সবথেকে বড় উন্মুক্ত কারাগারে পরিণত করা হয়েছে। অথচ দুঃখজনক হল নরেন্দ্র মোদিও অত্যাচারী ও গণহত্যাকারী ইসরায়েলের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এটা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সব বিবেকবান মানুষকে তিনি এর প্রতিবাদে সোচ্চার হতে আহ্বান জানান। তিনি আরও বলেন, ভারত বরাবর ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা ও সংহতির পক্ষে। কিন্তু এই প্রথম দেখা গেল ভারত বিপরীত অবস্থান নিয়েছে। এটা দেশের রাজনীতির চরম দক্ষিণপন্থী বাঁক। তাঁর কথায়, ভারতের মানবিক অবস্থান নেওয়া উচিৎ ছিল।

প্রাক্তন বিচারক ও মাইনোরিটি কমিশনের চেয়ারম্যান ইন্তাজ আলি শাহ বলেন, মহাত্মা গান্ধী, পণ্ডিত নেহরু, ইন্দিরা গান্ধী থেকে বাজপেয়ী পর্যন্ত ফিলিস্তিনের পক্ষে ছিলেন। ১৯৭১ সালে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সেনা পাঠিয়ে বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র করতে সর্বাত্মক সাহায্য করেছিলেন। কিন্তু আজ নরেন্দ্র মোদি ফিলিস্তিনের স্বাধীন রাষ্ট্র হওয়ার পক্ষে নেই। তিনি উল্টো পথে হাঁটছেন। আবার গাজায় ত্রাণও পাঠাচ্ছেন। এই দ্বিচারিতা কেন? মমতা ব্যানার্জী পর্যন্ত গত ২৭ দিনে ফিলিস্তিন ইস্যুতে একটা শব্দও ব্যয় করেননি। এটা শুভ লক্ষ্মণ নয় বলে মন্তব্য করেন ইন্তাজ আলি শাহ। তাঁর প্রস্তাব, ফিলিস্তিন যাতে স্বাধীন রাষ্ট্র হতে পারে, সেই লক্ষ্যে ভারত উদ্যোগ নিক। তাহলে নরেন্দ্র মোদি নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত হতে পারেন।

শিখদের প্রতিনিধি সোহন সিং আতিয়ানা বলেন, গাজা ও পশ্চিমতীরকে এমনভাবে দু-টুকরো করা হয়েছে যে, তারা ভৌগোলিক দিক থেকে কখনও এক হতে পারবে না। কারণ, মাঝখানে বসে রয়েছে ইসরায়েল। হামাস স্বাধীনতার লক্ষ্যে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে ১৯৪৮ সাল থেকে। আদানি কোম্পানিকে ব্যাকআপ দিতেই মোদি ইসরায়েলকে সমর্থন দিচ্ছে। কারণ, আদানি ইসরায়েলের একটা সমুদ্র বন্দর কিনেছে। আদানির জন্য মোদি দেশের বহু কিছু ছেড়ে দিয়েছেন বা আদানিকে বিক্রি করে দিচ্ছেন। তাই ভারতের ফিলিস্তিনপন্থী ঐতিহ্যকেও তিনি ছেড়ে দিয়েছেন কেবল আদানি কোম্পানির স্বার্থে।

দীপংকর বসু বলেন, গাজাবাসীকে দক্ষিণাঞ্চলে চলে যেতে বলা হচ্ছে। সবকিছু ছেড়ে তারা কেন যাবে? ভারত ভাগের সময়েও অসংখ্য মানুষ এদেশ থেকে বাংলাদেশ এবং ওপার থেকে এপারে এসেছিল। সে যে কত কষ্টের ও দুর্বিষহ তা আমরা দেখেছি। তিনি আরও বলেন, স্ফুলিংগ থেকেই দাবানল ছড়ায়। সেবাবেই যুদ্ধ ধীরে ধীরে গাজা ছাড়িয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ছে। তাই অবিলম্বে এই যুদ্ধ বন্ধ করতেই হবে। সব মানুষকে যুদ্ধ বিরতির জন্য একযোগে আওয়াজ ওঠাতে হবে। আর যেন নিরীহ মানুষের প্রাণ না যায়, সে ব্যাপারে আমাদের নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব পালন করতে হবে।

ইমামে ঈদায়েন ক্কারী ফজলুর রহমান বলেন, ইসরায়েল রাষ্ট্র কীভাবে তৈরি হয়েছিল, তা আমরা কমবেশি জানি। এখন জানতে হবে, ইসরায়েলকে কেন ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে এনে বসানো হয়েছিল। পৃথিবীতে এত জায়গা থাকতে কেন মধ্যপ্রাচ্যের বুকের ওপর ইহুদিদের আবাসভূমি করে দেওয়া হল। ফিলিস্তিন তো জনমানবশূন্য মরুভূমি নয়। তবুও সেটা করা হল, কারণ ফিলিস্তিনেই রয়েছে জেরুসালেম এবং মুসলিম উম্মাহর প্রথম কিবলা পবিত্র বায়তুল মুকাদ্দাস। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম ও সুপ্রাচীন ইসলামী ঐতিহ্যবাহী এই মসজিদ নিয়ন্ত্রণ করছে ইসরায়েল। সেখানে নামায আদায় করতে গেলে মুসল্লিদের বাধা দেওয়া হয়, প্রহার করা হয়, এমনকি গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়।

তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রসংঘ তৈরি হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঠিক পরেই ১৯৪৫ সালের শেষদিকে। আর শুরুতেই ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রসংঘ ঐতিহাসিক ভুল করে বসল। রাষ্ট্রসংঘকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করে আমেরিকা, ব্রিটেন, ফ্রান্স এর মতো পশ্চিমা দেশগুলো। অথচ এইসব দেশেই ইসরায়েলী যুদ্ধের বিরুদ্ধে লাখ লাখ মানুষ প্রতিবাদ-বিক্ষোভ করছে। যদিও পশ্চিমবাংলা তথা ভারতবর্ষে সেভাবে বিক্ষোভ দেখা যাচ্ছে না। তাঁর কথায়, পশ্চিমাদের মদদে গাজায় কার্যত জেনোসাইড চালাচ্ছে ইসরায়েল। নেতানিয়াহু ও বাইডেনকে তিনি কসাই বলেও উল্লেখ করেন।

জামাআতে ইসলামী হিন্দের রাজ্য সেক্রেটারি শাদাব মাসুম জানান, আগামীকাল শুক্রবার ৩ নভেম্বর জুম্মার নামাযের পর বেলা দুটো নাগাদ কলকাতার ধর্মতলাস্থিত টিপু সুলতান মসজিদের পিছনে ও স্টেটসম্যান অফিসের সামনে জমায়েত হবে এবং সেখান থেকে প্রতিবাদী মিছিল বের হবে। গাজায় নরসংহার ও যুদ্ধ বন্ধের দাবিতে মার্কিন কনসুলেটে স্মারকলিপি জমা দেওয়া হবে। বিবেকের ডাকে সাড়া দিয়ে সকলকে এতে শামিল হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত নিবন্ধ