অন্যান্য কলকাতা 

নওশাদের পর ফুরফুরায় হামলা পুলিশের! মমতার ভাবভূর্তি নিয়ে এই খেলা কারা খেলছে ?নেপথ্য রহস্য কী?

শেয়ার করুন

সেখ ইবাদুল ইসলাম: হুগলি জেলার ফুরফুরা শরীফ সময়ের বিচারে প্রায় ২০০ বছর ধরে বাংলার ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের কাছে পবিত্র স্থান বলে পরিচিত। শুধু বাংলার মুসলমান নয়। ভারতবর্ষের যে কোন প্রান্তে কিম্বা উপমহাদেশের যেকোন প্রান্তে গিয়ে ফুরফুরা শরীফের পরিচয় দিলে আলাদা একটা সম্মান এবং ইজ্জত রক্ষিত হয়। বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সঠিক জানেন কিনা জানিনা তবে তিনি পরীক্ষামূলকভাবে বিষয়টি পরীক্ষা করতে পারেন। ভারতবর্ষের যে কোন প্রান্তে গিয়ে বলতে পারেন আমি ফুরফুরা শরীফের মানুষ। নিঃসন্দেহে আমাদের মনে হয় তিনি আলাদা সম্মান এবং গুরুত্ব পাবেন।

১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দের ৬ ডিসেম্বর হযরত ফাতেহ আলী শাহ ওয়াইসী রহমাতুল্লাহ আলাইহির মৃত্যুর পর তার প্রধান শিষ্য হযরত আবু বক্কর সিদ্দিকী এই বাংলায় ইসলাম প্রচারের দায়িত্ব নেন। যিনি দাদা হুজুর পীর কেবলার নামে অবিভক্ত বাংলায় পরিচিত। হযরত ফাতেহ আলী শাহ ওয়াইসী রহমাতুল্লাহ আলাইহির মাজার বর্তমানে মানিকতলার মুন্সি পাড়ায় অবস্থিত। অর্থাৎ হযরত ফাতেহ আলী শাহ রহমাতুল্লাহ আলাইহির অন্যতম প্রধান শিষ্য হলেন ফুরফুরার দাদা হুজুর পীর কেবলা। অন্যদিকে ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দের ২৯ আগস্ট মারা গিয়েছিলেন আর একজন মহাপুরুষ। তিনি হলেন রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব। এই মহান আধ্যাত্মিক পুরুষের মৃত্যুর পর ভারত বর্ষ জুড়ে হিন্দু ধর্ম প্রচার এবং প্রসারের দায়িত্ব নিয়েছিলেন তার প্রধান শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ।

Advertisement

অর্থাৎ গুরুত্বের দিক থেকে দাদা হুজুর পির কেবলা এবং স্বামী বিবেকানন্দর সমসাময়িক মানুষ ছিলেন। স্বামী বিবেকানন্দ যখন সারা বিশ্ব জুড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তখন নিরবে দাদা হুজুর পীর কেবলা বাংলার নির্যাতিত অবহেলিত দুস্থ সমাজের পাশে দাঁড়িয়ে সেবা করে যাচ্ছেন তাদের শিক্ষার প্রসারে কাজ করে যাচ্ছেন। এহেন একজন মানুষেরই মাজার রয়েছে ফুরফুরা শরীফে আর সেই মাজারকে দর্শন করতে বা জিয়ারত করতে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ফুরফুরায় যাচ্ছেন। পশ্চিমবাংলার বাঙালি মুসলিম সমাজের কাছে তথা বাংলাদেশের মুসলমান সমাজের কাছে ফুরফুরা শরীফের গুরুত্ব অপরিসীম।

কিন্তু দুঃখের হলেও সত্য এই ফুরফুরা শরীফেরই সন্তান নওশাদ সিদ্দিকী ২০২১ এর বিধানসভা নির্বাচনে আচমকায় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। সাধারণ মানুষের কাছে সাংবিধানিক অধিকারকে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে নওশাদ সিদ্দিকী যে আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছেন তা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। তিনি যে রাজনীতি করছেন তা আজকের দিনে বড়ই প্রয়োজন। যে স্বপ্ন মহাত্মা গান্ধী থেকে শুরু করে মাওলানা আবুল কালাম আজাদ দেখেছিলেন সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করার জন্যই নওশাদ সিদ্দিকী কাজ করছেন। আমরা ভেবেছিলাম গণআন্দোলনের মধ্যে দিয়ে উঠে আসা নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নওশাদের এই কাজকে হার্দিকভাবে অভিনন্দন জানাবেন। মমতা নওশাদের কাজকে অভিনন্দন জানিয়েছেন অস্বীকার করার জায়গা নেই।

পশ্চিমবাংলার একটিমাত্র বিধায়ক ধর্মনিরপেক্ষ এই মুহূর্তে তার নাম নওশাদ সিদ্দিকী। তাকে ৪২ দিন ধরে জেলের মধ্যে রেখে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এটা প্রমাণ করেছেন তিনি ধর্মনিরপেক্ষ বিধায়কদের প্রশ্রয় দেন না, তুলনায় গেরুয়া শিবিরের যারা নেতা তারা যত অন্যায় করুক না কেন তাদের ক্ষেত্রে সাত খুন মাফ। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সজ্ঞানে করেছেন এ কাজ এটা আমরা বিশ্বাস করি না। আমরা বিশ্বাস করি এই রাজ্যের প্রশাসনিক স্তরে এই মুহূর্তে আরএসএস এবং বিজেপির লোকেরা ভরে গেছে এমনকি তৃণমূল দলের অভ্যন্তরে বেশ কিছু নেতা নেত্রী আরএসএস এবং বিজেপির পক্ষে সুবিধা করার জন্য নানারকম বিরূপ মন্তব্য করে চলেছেন।

তবে বিস্ময়ের বিষয় হলো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত একজন  দূরদর্শী সম্পন্ন এবং অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ বিষয়টি বুঝতে পারছেন না তা আমরা ভেবে পাচ্ছি না। তবে বিশ্বাস করতে পারছি না। নওশাদ সিদ্দিকী ৪২ দিন জেলে ছিলেন তার ভেতরে রাজনীতির কারণ থাকতে পারে কিন্তু গত শুক্রবার ১১ই জুলাই যে কান্ড ঘটে গেল ফুরফুরা শরীফে তা মেনে নিতে পারছি না।

সিসি টিভি ফুটেজ কিংবা বিভিন্ন ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত ফুটেজ থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি পুলিশ পীরজাদাদদের বাড়ি লক্ষ্য করে ঢিল ছুড়ছে। অভিযোগ উঠেছে এক পীরজাদার বাড়িতে তার দরবারে জুতো পড়ে ঢুকে পড়ে পুলিশ। আরেকটি ঘটনার কথা যেটা এই রাজ্যের প্রতিটি নাগরিককে আহত করেছে তা হল ফুরফুরা শরীফের বর্ষিয়ান পীর ইব্রাহিম সিদ্দিকীরকে লক্ষ্য করে ঢিল ছোড়া এবং সেই ঢিলের আঘাতে ইব্রাহিম সিদ্দিকীর মাথা ফেটে যাওয়া অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। যদিও পুলিশের পক্ষ থেকে এই ঢিল ছোড়াকে অস্বীকার করা হয়েছে তবে এটার দায় পুলিশকে নিতে হবে কারণ পুলিশের উপস্থিতিতে ঢিলটা ইব্রাহিম সিদ্দিকীর মাথায় লেগেছে। অতএব এতগুলি পুলিশ উপস্থিত ছিল অথচ একজন বর্ষীয়ান পীর আহত হলেন পুলিশ কিছু করলেন না এটাতে আমরা যথেষ্ট বিস্মিত।

অনেকেই অবশ্য বলছেন পুলিশের এই কাণ্ডজ্ঞানহীন কাজ কর্মের নেপথ্যে শাসকদল কেন দায়ী হবে? আমরাও বিশ্বাস করি পুলিশ যে কাজ করেছে সেটা ধিক্কারজনক! কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাবমূর্তি খারাপ করার জন্য রাজ্য সরকারের উচিত ছিল এক্ষুনি জাঙ্গিপাড়ার ওসি থেকে শুরু করে হুগলি জেলার এসপিকে পর্যন্ত সাসপেন্ড করা! তা কিন্তু করা হয়নি! মনে রাখতে হবে ফুরফুরা শরীফের পীরজাদাদের বাড়িতে হামলা চালিয়ে আসলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাবমূর্তি শুধু বাংলায় নয় বা ভারতে নয়, আন্তর্জাতিক স্তরেও ক্ষুন্ন হয়েছে! আমার রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর ভাবমূর্তিকে এইভাবে ক্ষুন্ন করেছে পুলিশ তা আমাদের মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আমরা অত্যন্ত শ্রদ্ধা করি সম্মান জানাই শুধু সম্মান জানায় আমরা নয় বিশ্বের একাধিক দেশের মানুষও সম্মান জানায়। বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আলাদা চোখে দেখেন। কিন্তু ফুরফুরা শরীফের ঘটনায় নওশাদের ৪২ দিন জেল  এবং সাম্প্রতিক কালে পুলিশের উপস্থিতিতে পীরজাদাদাদের বাড়িতে হামলা নিঃসন্দেহে মুখ্যমন্ত্রীর ভাবমূর্তি আন্তর্জাতিক স্তরেও খারাপ হয়েছে।

সুতরাং অবিলম্বে মুখ্যমন্ত্রীকে করা পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। শুধু ইমাম সম্মেলন করলে হবে না সেই সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কে সতর্ক পদক্ষেপ করতে হবে রাজনীতির মঞ্চে রাজনীতি হবে এটা যেমন ঠিকই সেটাও স্বাদের সঙ্গে তৃণমূলের গন্ডগোল হতে পারে কিন্তু তা বলে ফুরফুরা শরীফের উপর অহেতুক হামলা করা হলে তা বাংলার মানুষ মেনে নেবে না। তবে রাজনীতির অংক যদি অন্য কিছু হয়ে থাকে তাহলে আর বলার কিছু নেই যদি তৃণমূল নেতৃত্ব নিয়ে থেকেই চান এই রাজ্যে বিজেপি আসুক তাহলে তারা সঠিক পথেই হাঁটছে বলে আমাদের মনে হয়েছে।


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত নিবন্ধ