অন্যান্য কলকাতা 

ঘৃণ্য পরিকল্পিত রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র থেকে দলিত মুসলিম সমাজকে রক্ষা করার দায় নাগরিক সমাজকে নিতে হবে

শেয়ার করুন

সেখ ইবাদুল ইসলাম: কাজী নজরুল ইসলাম খুব দুঃখ করে লিখেছিলেন পূজারী কাহারে দাও অঞ্জলি? /মুক্ত ভারতে ভারতী কই ?/আইন যেখানে ন্যায়ের শাসন/ সত্য বলে বন্দী হই! স্বাধীনতার ৭৭ বছর পর বিদ্রোহী কবির এই বার্তা আজ মর্মে মর্মে সত্যে প্রমাণিত হচ্ছে। গত ৮ই জুন পঞ্চায়েত নির্বাচন ঘোষণা হওয়ার দিন থেকে আজ পর্যন্ত নয়,নয় করে ৫০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

কেন মৃত্যু? জনসেবা করার জন্য লড়াই করছে আমাদের রাজ্যের রাজনীতিবিদরা! জনসেবা মানে জনগণের সেবা করা। নিঃসন্দেহে একটি পবিত্র কাজ! অবহেলিত বঞ্চিত মানুষকে ইনসাফ পাইয়ে দেওয়া এবং তাদের স্বার্থে কিছু করা নিঃসন্দেহে একটা বড় কাজ বলা যেতে পারে! কিন্তু জনগণের যারা সেবা করবেন তাঁরা নিজেদের মধ্যে এত লাঠালাঠি মারামারি খুনোখুনি করছেন কেন?  এটা আমরা ভেবে উঠতে পারছি না। সেই যে ১৯৪৬ সালে ভারতের স্বাধীনতা বিল যখন লন্ডন পার্লামেন্টে পেশ হয়েছিল তখন বিরোধী দলনেতা চার্চিল একটা মন্তব্য করেছিলেন যে আমাদের দেশ এমন একটা সময় ভারতকে স্বাধীনতা দিতে যাচ্ছে যখন সে দেশের যারা ক্ষমতার অংশীদারিত্ব পাবে তারা নিজেদের স্বার্থে কাজ করবে জনগণের স্বার্থে নয়। চার্চিল বলেছিলেন আমাদের এই স্বাধীনতা দেওয়া ভারতকে এই সময় ভুল হবে।

Advertisement

চার্চিল কত বড় রাজনীতিবিদ ছিলেন তা আমরা সকলেই জানি। কিন্তু সেদিন যখন লন্ডনের পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে চার্চিল ভারত এর স্বাধীনতা দেওয়ার বিপক্ষে মন্তব্য করেছিলেন সেদিন মহাত্মা গান্ধী থেকে শুরু করে আমাদের দেশের তাবড় তাবড় স্বাধীনতার সংগ্রামীরা তীব্র ভাষায় চার্চিলের এই মন্তব্যের বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু স্বাধীনতার ৭৫ বছর পর যখন দেশ স্বনির্ভর হওয়ার পথে তখন আমাদের দেশের রাজনীতিবিদদের এই আত্মঘাতী লড়াইয়ে এটা প্রমাণিত হচ্ছে চার্চিল যা বলেছিলেন তা মর্মে মর্মে সত্য।

পঞ্চায়েত নির্বাচনকে ঘিরে এই যে মানুষের মানবিকতাকে খুন করা হচ্ছে। মানুষের মৃত্যু মিছিল চলছে এটা কোনভাবেই মানা যায় না। আমাদের সকলের মনে রাখা উচিত এই মৃত্যুতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দলিত এবং মুসলিমরা। সত্য কথাটি হচ্ছে রাজনীতির আঙিনা থেকে এই সম্প্রদায় কোনভাবেই তেমন সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে না। তারপরেও আমরা দেখতে পাচ্ছি দলিত এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের নিম্নবিত্ত পরিবারের মানুষেরাই এই রাজনীতির শিকার হচ্ছে। পঞ্চায়েত নির্বাচন ঘোষণার দিন থেকে যার প্রথম মৃত্যু হয়েছিল তিনি হলেন মুসলিম দ্বিতীয় ব্যক্তি হলেন তফসিলি জাতি সম্প্রদায়ের। প্রশ্ন হচ্ছে লড়াই হচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস, বিজেপি, কংগ্রেস, সিপিএমের মধ্যে খুন হচ্ছে মূলত দলিত এবং মুসলিম কেন?

গত পঞ্চায়েত নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে ৫০ জন মানুষ খুন হয়েছে তাদের পরিবারের কথা, তাদের ছেলেমেয়ের কথা, তাদের স্ত্রীর কথা, তাদের মায়েদের কথা কি আমরা একবারও চিন্তা করে দেখেছি? রাজনীতির হাড়িকাঠে কত নারী বিধবা হয়ে যাচ্ছে ,কত সন্তান বাবা হারাচ্ছেন, কত মা তার সন্তানকে হারাচ্ছেন, কত পিতা তার সন্তানকে হারাচ্ছেন, একবারও হিসাব করতে আমরা বসেছি! নবান্ন থেকে ঘোষণা মতো ক্ষতিপূরণ ২ লাখ টাকার মধ্য দিয়ে কি ওই মৃতের সন্তানকে তার বাবাকে ফিরিয়ে দেওয়া যাবে? তার স্বামীকে ফিরিয়ে দেয়া যাবে ? ওই অসহায় মাকে তার পুত্রকে ফিরিয়ে দেওয়া যাবে? একবারের জন্য আমাদের রাজ্যের রাজনীতিবিদরা কেন চিন্তা করতে বসছেন না? কেন এত মানুষ খুন হবে একটা নির্বাচন করতে গিয়ে!

শাসক দলের মুখপাত্র বলছেন গর্বের সঙ্গে খুন হয়েছে তো আমাদের দলের নেতা কর্মী! কেন খুন হবে? যে শাসক দল তার নিজের কর্মীদের নিরাপত্তা দিতে পারেনা সেই শাসকদলের মুখপাত্র কোন মুখে এ কথা বলেন লজ্জা পায় না!

বিজেপি হুঙ্কার ছাড়ছে দেখে নেব মুখ্যমন্ত্রীকে নাকি কোমরের দড়ি পড়িয়ে ঘোরাবেন। বলছেন শুভেন্দু অধিকারী। কিন্তু কেন মৃত্যু মিছিল হবে? মানুষকে খুন করে কেন গঠিত হবে পঞ্চায়েত ?দরকার নেই এরকম পঞ্চায়েত! মানুষকে খুন করে পঞ্চায়েত দখল এটা চলতে পারে না। এটা গণতন্ত্রের পক্ষে লজ্জা। এটা দেশের পক্ষে লজ্জা। সভ্য সমাজের লজ্জা!

রাজনীতিবিদদের উপর আমাদের কোন আস্থা নেই, বিশ্বাস নেই। কারণ এরা ক্ষমতা দখলের জন্য মানুষের রক্ত চায়। তবে এই রাজ্যের যারা সুশীল সমাজ বিশেষ করে দলিত এবং মুসলিম সমাজের যারা আলোকিত মানুষ তারা তো ব্যবস্থা নিতে পারেন। তারা তো পাড়ায় পাড়ায় গিয়ে গ্রামে গ্রামে গিয়ে সাধারণ মানুষকে বুঝিয়ে বলতে পারেন রাজনীতির মঞ্চে রাজনীতি, রাজনীতির জন্য রক্ত নয়। এটা তাদের নৈতিক দায়িত্ব। যারা ইসলাম ধর্মের অনুসারী তাদের কাছে হযরত মুহাম্মদ সা এর শিক্ষা এটাই খুনোখুনি বন্ধ করে আদর্শ সমাজ গড়ে তুলুন। কিন্তু দুঃখের হলেও সত্য এই রাজ্যে জমিয়েত উলেমায়ে হিন্দ রয়েছে, জামাতে ইসলামী হিন্দের মত সংগঠন যার সামাজিকভাবে অনেকটাই দায়বদ্ধ ,এই ধরনের ঘটনা রোখার জন্য ।তারা তাদের সঠিক দায়িত্ব পালন করছে না।

তবে এই দায়িত্ব আমাদের সকলের! সকলকে রাস্তায় নামতে হবে অনেক দেরি হয়ে গেছে। এই মৃত্যু মিছিল থামাতে হবে। সাধারণ মানুষকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করতে হবে। বলতে হবে রাজনৈতিক মঞ্চে মমতা শুভেন্দু ,সেলিম, অধীর এবং নওশাদরা একে অপরকে আক্রমণ করলেও সামাজিকভাবে এরা পরস্পরের বন্ধু ।তাহলে গ্রামবাংলায় যে মানুষটি সিপিএম করেন, যে মানুষটি কংগ্রেস করেন, যে মানুষটি বিজেপি করেন, যে মানুষটি তৃণমূল করেন, তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব কেন থাকবে না! রাজনৈতিক মঞ্চে লড়াই হোক! কিন্তু সামাজিক মঞ্চে পরস্পরের মধ্যে বন্ধুত্ব অটুট থাক, এটাই ফেসবুক টুইটার ইন্টারনেটের যুগে হওয়া উচিত বলে আমরা মনে করি। রাজনৈতিক দলগুলির এই অভিসন্ধি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে বাংলার জনরব কাজ করবে বলে অঙ্গীকার করছে।


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত নিবন্ধ