অন্যান্য 

যন্ত্রণার কথা হল যে, কংগ্রেস ও বামফ্রন্টের ৬৪ বছরের শাসনে নয়, তৃণমূল সরকারের এই আট বছরের শাসন কালে আরএসএস ও জনসঙ্ঘের উত্তরসূরি বিজেপি রাজ্যে বহুল  পরিমাণে শক্তিবৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছে । অবস্থা এমন হয়েছে যে, রাজ্যের রাজনীতিতে একমাত্র ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক শক্তি হিসাবেই আরএসএস বিজেপি-এর নেতা-নেত্রীদের হুমকির কম্পাঙ্কে সর্বশক্তিমান শাসককূল হম্বিতম্বিতেই মত্ত ! মহা-শক্তিমান পুলিশ –প্রশাসন নীরব ! শুধু রাজনৈতিক , প্রশাসনিক ক্ষেত্রেই নয় ;হিন্দুত্বের রাজনীতির যে মূলগত ভিত্তি, তা নিয়েও শুরু হয়েছে কেন্দ্রীয় ও রাজ্যের শাসক দলের মধ্যে এক উন্মত্ত প্রতিযোগিতা । : ড. আবদুস সাত্তার

শেয়ার করুন
  • 311
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আমাদের দেশ ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভের পর ৭২ টি বছর পার করেছে। আজও দেশের সাধারণ মানুষ সেই অর্থে স্বাধীনতা পেয়েছে কী ? ৭২ বছর পর হিসাব মেলাতে গিয়ে প্রাপ্তির চেয়ে অপ্রাপ্তির সংখ্যাটাই বেশি করে চোখে পড়ছে। ৭২ বছর পরও এদেশের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সামনের সারিতে আনার প্রতিশ্রুতি এখনও দেওয়া হয় দলিতসংখ্যালঘুরা এতদিন ধরে যে অর্জিত স্বাধীনতার সম্পদ ভোগ করে আসছিল তা আগামী দিনে থাকবে কিনা তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। দেশজুড়ে সংখ্যাগরিষ্ঠের জাতীয়তাবাদ এমন জায়গায় পৌছে গেছে যে আজ দেশের সব রাজনৈতিক দলই মন্দিরমুখী হয়ে পড়েছে স্বাধীনতার ৭২ বছর পর এদেশের দলিতসংখ্যালঘুদের নানা বিষয় নিয়ে বাংলার জনরব নিউজ পোর্টালের মুখোমুখি নব বালিগঞ্জ মহাবিদ্যালয়ের সিনিয়র অধ্যাপক এবং রাজ্যের সংখ্যালঘু উন্নয়ন মাদ্রাসা শিক্ষা দপ্তরের প্রাক্তন মন্ত্রী . আবদুস সাত্তার । আজ শেষ ‍কিস্তি ।

প্রশ্ন : বর্তমান প্রেক্ষাপটে অনেকেই মনে করছেন , সংখ্যালঘু মুসলিমদের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার স্বার্থে রাজ্যের মুসলিমদের একজোট হওয়া এবং কেরালার মতো স্বতন্ত্র দল গঠনের প্রয়োজনীয়তা আব্যশক হয়ে পড়েছে । কি বলবেন ?

ড. আবদুস সাত্তার :  এক. স্বাধীনতা পরবর্তী ৭২ বছরের ইতিহাস এই শিক্ষাই আমাদের দেয় যে , ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করা, রাজনৈতিক দল পশ্চিমবঙ্গ ও স্বাধীন বাংলাদেশ অর্থাৎ দুই বাংলাতেই মানুষের জনসমর্থন লাভে সমর্থ হয়নি । জনসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জিও দেশভাগ উত্তর পশ্চিমবঙ্গ-এর রাজনীতিতে খুব বেশি সমর্থন পাননি । হিন্দু মহাসভার নেতা ও বাংলা ভাগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবক্তা প্রয়াত এনসি চ্যাটার্জির রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের ইতিহাসও এ- প্রসঙ্গে খুবই গুরুত্বপূর্ণ । তাঁরই পুত্র প্রয়াত সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের রাজনীতির ইতিবৃত্ত সকলেরই জানা । যন্ত্রণার কথা হল যে, কংগ্রেস ও বামফ্রন্টের ৬৪ বছরের শাসনে নয়, তৃণমূল সরকারের এই আট বছরের শাসন কালে আরএসএস ও জনসঙ্ঘের উত্তরসূরি বিজেপি রাজ্যে বহুল  পরিমাণে শক্তিবৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছে । অবস্থা এমন হয়েছে যে, রাজ্যের রাজনীতিতে একমাত্র ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক শক্তি হিসাবেই আরএসএস বিজেপি-এর নেতা-নেত্রীদের হুমকির কম্পাঙ্কে সর্বশক্তিমান শাসককূল হম্বিতম্বিতেই মত্ত ! মহা-শক্তিমান পুলিশ –প্রশাসন নীরব ! শুধু রাজনৈতিক , প্রশাসনিক ক্ষেত্রেই নয় ;হিন্দুত্বের রাজনীতির যে মূলগত ভিত্তি, তা নিয়েও শুরু হয়েছে কেন্দ্রীয় ও রাজ্যের শাসক দলের মধ্যে এক উন্মত্ত প্রতিযোগিতা ।

দুই , বাঙলার মাটি , বাঙালির মননে স্বাধীনতা-উত্তরকালে ঝঞ্জা-ক্ষুদ্ধ সময়েও ধর্ম , সাম্প্রদায়িক ভিত্তিক রাজনীতি বড়ো হয়ে ওঠেনি । হয়তো তার কারণ হলো,চিন্তা-চেতনার ক্ষেত্রে বাঙালির প্রাগ্রসর মনোভাব । মানুষ, মনুষ্যত্ব ,মানবতার জয়গান কালে-কালোত্তরে ধ্বনিত হয়ে বাঙালির সৃজনীশক্তি কে আরো উর্বর করেছে । তাই  বাঙলার মানুষ , বাঙালির মনে হয়েছে , একটা রাজনৈতিক দল শুধুমাত্র একটা ধর্মের  সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও মানুষের জন্য তো হতে পারে না  । আর সে কারণেই পূর্ব পাকিস্থান তথা আজকের স্বাধীন প্রজাতান্ত্রিক বাংলাদেশে ‘ আওয়ামী মুসলিম লীগ ‘-এর নাম পরিবর্তন করে ‘আওয়ামী লীগ ‘ করা হয় । এই কাজে যাঁরা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাঁদের সর্বাগ্রগন্য হলেন মৌলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ।

তিন . এই ধরনের চিন্তাভাবনা হবে ধর্মনিরপেক্ষ ভাবনা ও ঐতিহ্যের পরিপন্থী । এই ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়ায় সংখ্যাগরিষ্ঠ সাম্প্রদায়িকতার পথই প্রশ্স্ত হবে । সমগ্র ভারতবাসী –এর বিষময় ফল প্রত্যক্ষ করছেন। পশ্চিমবঙ্গেও সেইদিন হয়তো বহুদূরে নয় ।

চার . সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার লড়াই –সংগ্রামে ধর্ম বর্ন নির্বিশেষে সকল মানুষকেই সক্রিয় ও সচেতন হতে হবে । দাবি আদায় করার সংগ্রামকে জোরদার করার জন্য রাজনীতি নির্বিশেষে প্রগতিশীল অংশকে সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে । উদ্বাস্তু আন্দোলন-এর ক্ষেত্রে যেমনটি হয়েছিল । রুজি-রুটি , কর্মসংস্থানের লড়াইকে অগ্রাধিকার প্রদান করতে হবে ।

পাঁচ . আমাদের মনে রাখতে হবে , অঞ্জানতা , কুসংস্কার , শোষণ, অত্যাচারের সহায়ক , শাসকের শক্তি । অঞ্জতাই বিভেদকামী মানসিকতাকে আপনার ঘরে ডেকে নিয়ে আসছে । ঞ্জানের অভাবই মানুষে-মানুষে বৈরিতা ও হিংসার মূল উৎস নিহিত রয়েছে । তাই ঞ্জানের আলোক সর্বক্ষেত্রে প্রোজ্জ্বলিত করতে হবে ।

ছয় . কোনো সরকারই সংখ্যালঘু মুসলিমদের জন্য বিশেষ- কিছু করবে না । এই ধরনের ভাবনা সর্বত্রই আজ বিরাজমান । অবশ্য এই ভাবনার পেছনে দেশ ও রাজ্যের প্রতিষ্ঠিত তথা-কথিত ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলির অবদান সব থেকে বেশি । তার করাণ হল ,স্বাধীনতা উত্তর ৭২ বছরের শোষণ, বঞ্চনা, উপেক্ষা সর্বোপরি প্রতিনিধিত্ব হীনতার এক দীর্ঘ করুণ অধ্যায় । যে অধ্যায়ে সংবিধান প্রদত্ত ধর্মনিরপেক্ষ উন্নয়ন নয় ; দাঙ্গা হীনতা , দাঙ্গা হীন প্রশাসনের কথাটাই সংখ্যালঘু মুসলিমদের সামনে মূল বিষয় বস্তু হিসেবে হাজির করা হয়েছে । এতদসত্ত্বে ,পথটা হচ্ছে ধারাবাহিকভাবে গণ-আন্দোলনের । যার ভাষা হবে শান্তি , সম্প্রীতি , সকল মানুষের উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন। এর সঙ্গে যুক্ত  করতে হবে  সম্প্রদায়গত উদ্যোগকে ।

সাত . তাই স্বতন্ত্র রাজনৈতিক দল নয় ; চাই অধিকার রক্ষার জন্য বহুমুখী প্রতিভাসম্পন্ন সংগঠক ও চেতনাবাহী সংগঠন । চাই পথ প্রদর্শক , পথ  প্রদর্শনকারী , যাদের আলোকোজ্জ্বল ছোঁয়ায় সমাজ আলোকিত হয়ে উঠবে ।

আট . এই অধিকার রক্ষার সংগ্রামে ধর্মনিরপেক্ষ সহায়ক শক্তিকে জেনে বুঝে বাছাই করতে হবে । মিথ্যা প্রলোভন, ভাঁওতা, জুলুমবাজী , দূনীর্তি পরায়নতা, ছদ্মবেশীদের হাত থেকে সংবিধান প্রদত্ত মানুষের  অধিকারের লড়াইকে রক্ষা করতে হবে।

নয় . দেশের ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দলগুলির নেতৃবৃন্দকেও এ কথা মনে-প্রানে উপলব্ধি করতে হবে যে রাজ্যে ২৮ শতাংশ ও দেশের ১৮ শতাংশ সংখ্যালঘু মুসলিম এদেশের সব কিছুর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত । এই বৃহৎ অংশের মানুষ যদি সবদিক থেকে পিছিয়ে পড়ে থাকে , তাহলে  সামাগ্রিকভাবে দেশের উন্নয়ন হবে কি করে ? দেশ বলতে তো সব অংশের মানুষের সমাহার । তাই সবার উন্নয়ন চাই । কোনো  নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মানুষকে দাঙ্গা , নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে পিছিয়ে রাখার যে মানসিকতা , সেই মানসিকতাকে সমূলে উৎপাটন করতে হবে । এই দৃঢ় প্রত্যয় মনের মধ্যে জাগাতে হবে , এই দেশ আমারও । এর যাবতীয় ভালো-মন্দের অংশীদার আমিও । তাই মূলস্রোতের ধর্মনিরপেক্ষ কল্যাণকামী রাজনৈতিক ভাবধারার মধ্যেই শোষণ-বঞ্চনার  অবসানের পথ খুঁজতে হবে । এই কল্যাণকামী পথেই আসবে শান্তি, সম্প্রীতি, এমন- কী  সার্বিক কাক্ষিত উন্নয়নও ।


শেয়ার করুন
  • 311
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সম্পর্কিত নিবন্ধ

Leave a Comment