অন্যান্য 

সামগ্রিক এই রাজনৈতিক পরিমন্ডলে , সংখ্যালঘুদের স্বল্প অধিকার নিয়ে রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকার কাজটা যে কতটা কঠিন , তা ভুক্তভোগী মাত্রেই জানেন : ড. আবদুস সাত্তার

শেয়ার করুন
  • 160
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আমাদের দেশ ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভের পর ৭২ টি বছর পার করেছে। আজও দেশের সাধারণ মানুষ সেই অর্থে স্বাধীনতা পেয়েছে কী ? ৭২ বছর পর হিসাব মেলাতে গিয়ে প্রাপ্তির চেয়ে অপ্রাপ্তির সংখ্যাটাই বেশি করে চোখে পড়ছে। ৭২ বছর পরও এদেশের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সামনের সারিতে আনার প্রতিশ্রুতি এখনও দেওয়া হয় দলিতসংখ্যালঘুরা এতদিন ধরে যে অর্জিত স্বাধীনতার সম্পদ ভোগ করে আসছিল তা আগামী দিনে থাকবে কিনা তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। দেশজুড়ে সংখ্যাগরিষ্ঠের জাতীয়তাবাদ এমন জায়গায় পৌছে গেছে যে আজ দেশের সব রাজনৈতিক দলই মন্দিরমুখী হয়ে পড়েছে স্বাধীনতার ৭২ বছর পর এদেশের দলিতসংখ্যালঘুদের নানা বিষয় নিয়ে বাংলার জনরব নিউজ পোর্টালের মুখোমুখি নব বালিগঞ্জ মহাবিদ্যালয়ের সিনিয়র অধ্যাপক এবং রাজ্যের সংখ্যালঘু উন্নয়ন মাদ্রাসা শিক্ষা দপ্তরের প্রাক্তন মন্ত্রী . আবদুস সাত্তার । আজ ত্রয়োদশ ‍কিস্তি ।

প্রশ্ন : আবদুল হালিমও আবদুর রেজ্জাক খাঁ-এর কথা তো এখন আর কেউ সেইভাবে স্মরণ করে না । মুজফ্ফর আহমদ (কাকাবাবু) একমাত্র ব্যতিক্রমী হয়েই থেকে গিয়েছেন । তাই নয় কি ?

ড. আবদুস সাত্তার :  এক . ভারতের কমিউনিষ্ট পার্টি প্রতিষ্ঠার শতবর্ষ উদযাপন-এর কথা শোনা যাচ্ছে । বর্তমানে ভারত ও বাংলার রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এই ধরণের বিষয় সম্পর্কিত আলোচনা ও চর্চা ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক বলেই আমার মনে হয় । কেননা , মার্কসবাদ ও মার্কসবাদীদের বিভিন্ন গঠন সত্ত্বেও ভারতের বৌদ্ধিক জীবনে এক অসামান্য অবদান তাঁরা রাখতে সমর্থ হয়েছে । মার্কসবাদীদের কাজ ও তার উত্তরাধিকার প্রজন্ম পরম্পরায় বুদ্ধিজীবী, চিন্তাশীলদের চিন্তা –চেতনাকে অনুপ্রাণিত করে চলেছে । এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই । দাঙ্গাহীন প্রশাসন, উদ্বাস্ত পুনর্বাসন ও উন্নয়ন , বৈষম্য দূরীকরণের লক্ষ্যে বহুমুখী কার্যক্রম পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থীদের উল্লেখ্যযোগ্য সাফল্য-ও। কিন্ত রাজনৈতিকভাবে মুসলিমদের সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি কি অপরিবর্তিত থেকেছে?

দুই. সাংবাদিক অঞ্জন বসু‘ বাংলায় বামেরা : রাজপথে ও রাজ্যপাটে (১৯২০-২০১১) ‘ শীর্ষক গ্রন্থে বিষয়টি সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন । তাঁর ভাষায় : ‘,,,,, দুই তিনের দশকে বাংলায় কমিউনিষ্ট পার্টি গঠনে মুজফ্ফর আহমদের পাশে তিনি ( আবদুল হালিম ) ছিলেন অন্যতম প্রধান সংগঠক । তিনের দশকের একেবারে গোড়ায় কলকাতাকে কেন্দ্র করে পার্টি সংগঠন গড়ে তোলা ও তারপর সর্বভারতীয় কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের কাজেও তিনি ছিলেন অন্যতম প্রধান উদ্যোগী । অথচ পরবর্তী সময়ে অত্যন্ত বিস্ময়করভাবে অমন একজন নেতার কথা প্রায় ভুলেই যাওয়া হয়েছে । বর্তমান প্রজন্মের বামপন্থী নেতা ও কর্মীরা ক‘জন তাঁর বিষয়ে জানেন তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে যথেষ্ট । মুজফ্ফর আহমদকে যতটা স্মরণ করা হয় এখনও , আবদুল হালিমের ক্ষেত্রে তার কিছুই নয় । সেই যুগের নেতাদের লেখা বইয়ের পাতাতেই তিনি আবদ্ধ হয়ে আছেন ।‘ ( পৃষ্ঠা নং ৩০ )।‘বিস্ময়করই ‘ বটে !

তিন . আবার, আবদুর রেজ্জাক খাঁ তো বিস্মৃতির অতল গহ্বরে তলিয়ে গেছেন। শ্রী বসু‘র লেখনিতে –

‘…. উত্তর ২৪ পরগণার স্বরূপনগরের হাকিমপুর গ্রামের ছেলে আবদুর রেজ্জাক খাঁ দুইয়ের দশকের গোড়ায় মুজফ্ফর আহমদ ও আবদুল হালিমের সঙ্গে কমিউনিষ্ট পার্টি গড়ার প্রাথমিক কাজ শুরু করেন। তাঁর পূর্বপুরুষ ছিলেন ওয়াহাবি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত । যে আন্দোলন ছিল ওয়াহাবী-বিরোধী , সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী এবং শ্রমিক কৃষক বান্ধব ।…‘ ওই রকম পরিবারের ছেলে হওয়ায় স্বাধীনতা-চেতনা রেজ্জাকের রক্তের মধ্যেই ছিল । প্রথম বিশ্বযুদ্ধ তিনি ইন্ডিয়ান ডিফেন্স ফোর্সে ছিলেন । তারপর যুদ্ধ শেষে ফিরে আসার কিছুদিন পর সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের সুবাদে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন । খিদিরপুর ডক জেলে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় হালিমের । জেল থেকে বেরিয়ে হালিমের সঙ্গে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির কার্যালয়ে যাওয়া শুরু হয় । পরিচয় হয় মুজফ্ফর আহমদের সঙ্গেও । তারপর ওঁদের দু‘জনের মতো কমিউনিষ্ট পার্টি গড়ার কাজে নেমে পড়েন । প্রথম যুগে কলকাতা  ও বাংলায় পার্টি গড়ার কাজে তাঁর অবদানও কম ছিল না ।‘ ( পৃষ্ঠা ৩১ )।

চার . ১৯৪৩ সালের ১২ মে মুম্বাইতে ভারতের কমিউনিষ্ট পার্টির প্রথম বৈধ কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয় । সম্পাদক নির্বাচিত হন পি.সি. যোশী। এই সময়-পর্বের প্রেক্ষিত পর্যালোচনা করে শ্রী বসু লিখেছেন –

‘ এখানে লক্ষ্য করার বিষয় মুজফ্ফর আহমদকে কিন্ত খুব বড় কোনও দায়িত্ব দেওয়া হয়নি । শুধু এই প্রথম বৈধ সম্মেলন বলে নয় , দুই দশক পরে সিপিএম গঠনের পরও তিনি কেন্দ্রীয় কমিটির বেশি আর দায়িত্ব পাননি ।তাঁর নিজেরই কি বড় দায়িত্ব নেওয়ায় অনীহা ছিল ? অব্শ্য , সিপিএম আই ( এম ) যখন গঠিত হয় ( ১৯৬৪ ) তখন তাঁর বয়স অনে্কটাই হয়ে গিয়েছে ।‘

প্রশ্ন : এই সমস্ত কারণেই কি প্রথম ও শেষ পরিচয়ে ‘ ধর্মীয় গুরু‘ স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে সিপিআই( এম )-এর কার্যক্রম , এমন -কী জন্মের সার্ধশতবর্ষে স্বতন্ত্র পুস্তক প্রকাশ করলেও রাজ্যের মানচিত্রে আরো একজন ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, বাংলার ও বাঙালির অন্যতম শ্রেষ্ঠ পুরুষ পীর আবু বক্কর সিদ্দিকি (রহ) সম্পর্কে এই ধরনের কিছু তো তারা করেন না । কি বলবেন ?

ড, আবদুস সাত্তার : কথাটা সর্বৈব সত্য । সমস্যাটা হলো , ভারতের রাজনৈতিক দলগুলি সাংবিধানিকভাবে নিরপেক্ষ অথচ জাতিগতভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের চিহ্নবাহী। বাংলার মার্কসবাদীরাও তার থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন নি । এই ভাবনার মধ্যে তাঁরাও বিচরণ করে চলেছেন ।

দুই . শুধু তাই নয় ,অন্যদের ক্ষেত্রে নারীত্বের প্রথম ও আধুনিক প্রবক্তা রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনকে নিয়ে আজ পর্যন্ত কোনো ফাউন্ডেশন হয়েছে কি ? অর্থাৎ ধর্মীয় বিদ্বান , নারী জাগৃতির অন্যতম সাধক, কাউকে নিয়েই উপরোক্ত ধরনের কোনো ভাবনা হয়নি । অথচ হলে শুধু সমাজই নয় , দলও সার্বিকভাবে লাভবান হতে পারত ।

প্রশ্ন : রাজ্যে সব রাজনৈতিক দলেই নেতৃত্বের প্রশ্নে সংখ্যালঘু-মুসলিমদের নানা ধরনের সমস্যার মধ্যে দিয়ে যেতে হয় । এ সম্পর্কে কি বলবেন ?

ড. আবদুস সাত্তার : স্বাধীনতা আন্দোলনের দিনগুলি কিংবা দেশভাগ পরবর্তী ভারতের ইতিহাস সম্পর্কে যাঁরা লেখাপড়া করেন তাঁদের কাছে বিষয়টি নতুন কিছু নয় । বলা যায় ‘অবিশ্বাসী প্রিয়ারে বেসেছি ভালো ‘-এর মতো অবস্থা । তার কারণ, যে কোনো রাজনৈতিক দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক কর্মীকে শুধুমাত্র তার প্রতিপক্ষ , বিরোধী দলের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয় কিন্ত ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রে তা রূপান্তরিত হয়ে যায় ত্রিবিধ লড়াই-এ।

প্রথমত, সংখ্যাগুরু‘র মতোই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে সংখ্যালঘুরও লড়াই ।

দ্বিতীয়ত , নিজ দলেরর মধ্যেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিশ্বস্ততা , আনুগত্য প্রমাণের সংগ্রাম- লড়াই ।

তৃতীয়ত, নিজ ধর্মাবলম্বী ও জনগোষ্ঠীর মানুষের কাছে রাজনৈতিক ও উন্নয়নমূলক নানাবিধ কর্মকান্ড বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দলের নেতা হিসাবে বিশ্বাসযোগ্যতার পরিচয় দিতে হয় ।

স্বভাবতই , সামগ্রিক এই রাজনৈতিক পরিমন্ডলে , সংখ্যালঘুদের স্বল্প অধিকার নিয়ে রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকার কাজটা যে কতটা কঠিন , তা ভুক্তভোগী মাত্রেই জানেন । আবার, কঠোর, কঠিন , শৃঙ্খলার নিগড়ে আবদ্ধ ক্যাডারভিত্তিক দলে এই সমস্যাটা আরো বেশি । মতাদর্শগত এই ব্যবস্থাপনায় সব কিছুরই নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে পার্টি । ফলশ্রুতিতে রাজনৈতিক , সাংগঠনিক বিচারে মুসলিমদের প্রতি বঞ্চনা, শোষণের, বিষয়টি প্রয়োজনে ‘ তোষণের‘ অমোঘ হাতিয়ার হিসাবে হাজির হয়ে যায় ।

 

 


শেয়ার করুন
  • 160
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সম্পর্কিত নিবন্ধ

Leave a Comment