প্রচ্ছদ 

পার্টি প্রতিষ্ঠাতাদের দিকপাল ত্রয়ী মুজফ্ফর আহমদ, আবদুল হালিম , আবদুর রেজ্জাক খানের ক্ষেত্রে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতিকে ‘ আতুড়ঘর‘ – ও বলা যেতে পারে ; অথচ আজকের পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থী দলগুলিতে ‘ মুসলিম ‘ শব্দটাই যেন ‘ ব্রাত্য ‘ হয়ে গেছে ; আসলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ‘ দৃষ্টিভঙ্গি‘র প্রশ্নটাই বড়ো হয়ে উঠছে : ড. আবদুস সাত্তার

শেয়ার করুন
  • 238
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

 আমাদের দেশ ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভের পর ৭২ টি বছর পার করেছে। আজও দেশের সাধারণ মানুষ সেই অর্থে স্বাধীনতা পেয়েছে কী ? ৭২ বছর পর হিসাব মেলাতে গিয়ে প্রাপ্তির চেয়ে অপ্রাপ্তির সংখ্যাটাই বেশি করে চোখে পড়ছে। ৭২ বছর পরও এদেশের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সামনের সারিতে আনার প্রতিশ্রুতি এখনও দেওয়া হয় দলিতসংখ্যালঘুরা এতদিন ধরে যে অর্জিত স্বাধীনতার সম্পদ ভোগ করে আসছিল তা আগামী দিনে থাকবে কিনা তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। দেশজুড়ে সংখ্যাগরিষ্ঠের জাতীয়তাবাদ এমন জায়গায় পৌছে গেছে যে আজ দেশের সব রাজনৈতিক দলই মন্দিরমুখী হয়ে পড়েছে স্বাধীনতার ৭২ বছর পর এদেশের দলিতসংখ্যালঘুদের নানা বিষয় নিয়ে বাংলার জনরব নিউজ পোর্টালের মুখোমুখি নব বালিগঞ্জ মহাবিদ্যালয়ের সিনিয়র অধ্যাপক এবং রাজ্যের সংখ্যালঘু উন্নয়ন মাদ্রাসা শিক্ষা দপ্তরের প্রাক্তন মন্ত্রী . আবদুস সাত্তার । আজ দ্বাদশ ‍কিস্তি ।

প্রশ্ন : রাজ্যের ২৩ টি জেলার সম্পাদক / সভাপতি , মনোনয়ন / নির্বাচনের ক্ষেত্রে কি দল নির্বিশেষে উপরোক্ত ‘দৃষ্টিভঙ্গির‘ই প্রতিফলন ঘটছে ?

ড. আবদুস সাত্তার :  হতে পারে । তবে বাস্তব তথ্য এটাই যে –

এক. কমরেড মুজফ্ফর আহমদ, আবদুল হালিম , আবদুর রেজ্জাক খান-এর মতো মহান মানুষেরা কমিউনিষ্ট পার্টি গঠনের ক্ষেত্রে এক অনন্য-সাধারন ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছেন । আবার এও সত্য যে , রাজ্যের ২৩ টি জেলার মধ্যে প্রায় ১৪টি জেলায় ২০ থেকে ৬৭ শতাংশ মুসলিমের বসবাস অথচ সিপিআই (এম)-এর একজনও  জেলা সম্পাদক পদে বর্তমানে নেই । রাজ্য কমিটি , জেলা কমিটিগুলিতেও প্রতিনিধিত্বের হার খুব শোচনীয় । এমন – কী রাজ্য কমিটিতেও একজন মুসলিম মহিলাকে রাখা হয়নি । রাজ্য সম্পাদকমন্ডলীতে সবেধন নীলমনি মাত্র একজন !

দুই . মুসলিম বানীতে সোচ্চার রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস-এরও প্রায় একই অবস্থা ! কোনোক্রমে মালদহ জেলায় একজন আছেন । এর বেশি কোনো অগ্রগতি হয়েছে কি ?

তিন . কংগ্রেস (আই )-এর অবশ্য সম্ভবত তিনজন জেলা সভাপতি রয়েছেন । কিন্ত সাম্প্রতিককালে রাজ্যস্তরে যে সাংগঠনিক পুর্নগঠন হয়েছে তাতে ১১ জনের মধ্যে মাত্র ১ একজন রয়েছেন । তাই নয় কি ?

চার . তপশিলী জাতি ও তপশিলী উপজাতির ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সময়গুলিতে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের হার দল নির্বিশেষে বৃদ্ধি পেয়েছে । হয়তো বিজেপি-এর বাড়বাড়ন্তের তাড়নায় !

পাঁচ . এ বিষয়ে একটা কথা অবশ্য রাজনৈতিক দলগুলিতে বহুল প্রচলিত যে , ‘ হিন্দু-মুসলিম ‘ ভেবে তো আর নেতা নির্বাচন , কমিটিতে রাখা হয় না । যোগ্যতাই হলো একমাত্র মাপকাঠি । এই ভাবনা , দৃষ্টিভঙ্গিতে নিশ্চয়ই সংখ্যালঘু মুসলিমরা ‘যোগ্য‘ হয়ে উঠতে পারেন নি । তাই তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় রাখা হয়নি । অতএব যোগ্য হও ! উন্নয়ন ঘাটতির মতো রাজনৈতিক নেতৃত্ব-দানের গুণের ঘাটতিও হয়তো থেকে যাচ্ছে । এছাড়া আর কী-ই বা বলা যায় ?

প্রশ্ন : রাজ্যে সবথেকে বড়ো বামপন্থী দল সিপিআই( এম ) তাদের মুখপত্র ‘ গণশক্তি‘-র মধ্যে দিয়ে প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনা প্রচার ও প্রসারের কথা সোচ্চারে বলে থাকে । আবার ‘গণশক্তি‘ই সম্ভবত রাজ্যের একমাত্র দৈনিক সংবাদপত্র যেখানে একজনও মুসলিম সাংবাদিক নেই । কি বলবেন ?

ড. আবদুস সাত্তার : এক .  সাংবাদিক না থাকলেও চতুর্থ শ্রেণির ( গাড়ির চালক, দারোয়ান প্রমুখ ) কর্মি তো আছেন !

দুই . চন্ডীপ্রসাদ সরকার তাঁর ‘ বাঙালি মুসলমান( ১৮৬৩-১৯৪৭) ‘ গ্রন্থে যা লিখেছেন তা এই ক্ষেত্রে আমাদের সহায়ক হতে পারে । তাঁর ভাষায় – ‘ কমিউনিষ্ট সাংবাদিকতার প্রকৃত প্রচেষ্টা চলেছিল ১৯৩০-এর দশকে । এই প্রচেষ্টায় অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন আবদুল হালিম । মজুর-চাষী, মার্কসবাদী ,মার্কসপন্থী , গণশক্তি প্রভৃতি তাঁর প্রচেষ্টায় প্রকশিত হয় ।‘

তিন . আবার , আমাদের এও মনে রাখতে হবে যে, কমরেড মুজফ্ফর আহমেদ , কবি কাজী নজরুল ইসলাম , কমরেড আবদুল হালিম-এর মতো দূরদৃষ্টি সম্পন্ন মানুষেরা প্রায় সকলেই কোনো না কোনোভাবে ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা‘র সঙ্গে প্রথম জীবনে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন । এই পর্বে অনেকটা সময় কমরেড মুজফ্ফর আহমদ ও কাজী নজরুল ইসলাম বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকার ‘মেস‘-এ থেকেছেন । কমরেড মুজফ্ফর আহমদ এই পত্রিকায় কাজও করতেন । বর্তমান গবেষকদের অনেকের লেখায় অজানা তথ্য নিত্য-নতুন বিষয় উঠে আসছে । যেমন,  অক্সফোর্ড-বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে গবেষণারত , মালদার কালিয়াচক-এর অন্যতম মেধাবী সন্তান শাহনওয়াজ আলী রাইহান ।  তিনি মনে করেন – “ — আমাদের দেশের কমিউনিষ্ট আন্দোলন চর্চায় বাইরের প্রভাবগুলো নিয়ে খুব একটা চর্চা নেই । ‘ধর্ম ‘ আর ‘ সম্প্রদায়ে‘র উর্ধ্বে উঠে ইতিহাস চর্চা করতে গিয়ে আলিমুদ্দিন আমাদের যে যে কথাগুলি বলেনি , এবার সেগুলোর চর্চা দরকার পার্টির সঠিক ইতিহাস জানতে । যেমন প্যান ইসলামিজম কী করে অবিভক্ত ভারতে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের বুনিয়াদ তৈরি করে । আর যখন মুসলিমরা তৃণমূল-ত্বহাতে বিভক্ত , সইফুদ্দিন – মইনুল হাসানরা দলত্যাগ করছে , তখন সেই প্রাক-বলশেভিক সময়ে আফগানির কলেজ স্ট্রিট কফি হাউসের ভাষণ থেকে উর্দুভাষী মুসলিমদের খিদিরপুর ডক-এ শ্রমিক ইউনিয়ন তৈরি, ওয়াহাবি পরিবারের আবদুর রাজ্জাক খান আর খিলাফত আন্দোলনের হালিমদের নিয়ে মৌলানা আজাদের সহকারী কুতুবউদ্দিন আহমেদের কলিন লেনের বাড়ির লাইব্রেরিতে একদা বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমাজের সর্বক্ষণের কর্মী মুজফ্ফর আহমেদের মার্কসবাদ চর্চা, ফজলুল হকের টাকায় কী করে মেডিকাল কলেজের সামনের বাড়িটায় কাকাবাবু –নজরুল প্রথম সমাজতান্ত্রিক প্রেসের ভিত্তি রাখেন ­– এইসব আলোচনা ব্যতিরেকে বাংলার কমিউনিষ্ট আন্দোলনের সহি ইতিহাস বোঝা সম্ভব না । এসব না জেনে বোঝা বা চর্চা যে একদম হবে না তা না । হবে , এতদিন তা-ই হয়ে আসছে । তবে ‘ জাতি-বর্ণ‘-এর উর্ধ্বে উঠে আলিমুদ্দিনের উচ্চবর্ণের বাবু সমাজ যেভাবে  করেছে সেইভাবেই !“

চার. বিশিষ্ট সাংবাদিক অঞ্জন বসু‘র  মতে , নবযুগ , লাঙল , গণবানী আক্ষরিক অর্থেই বেআইনী কমিউনিষ্ট পার্টির বেসরকারী মুখপত্র হয়ে উঠেছিল ।

পাঁচ . আমাদের এ-ও স্মরণে রাখতে হবে যে , ম্যাক্সিম গোর্কির বিশ্ববন্দিত সাড়া জাগানো উপন্যাস ‘মা ‘ কাজী নজরুল ইসলাম সম্পাদিত ‘লাঙল‘ পত্রিকাতেই প্রথম প্রকাশিত হয় । আবার , নজরুলের ‘ সাম্যবাদী ‘ কবিতা টি এই পত্রিকাতেই প্রথম মুদ্রিত হয় । কমরেড মুজফ্ফর আহমদ সম্পাদিত ‘গণবানী‘ পত্রিকা কমিউনিষ্টদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত যাবতীয় কুৎসা-অভিযোগের জবাব কৃষক-শ্রমিকের কাছে সহজবোধ্য ভাষায় পৌছিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে এক অসমান্য ভূমিকা পালন করেছে । এইভাবে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি ও তার মুখপত্র বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা কমিউনিষ্ট মর্তাদর্শের প্রচার ও  প্রসারে এক নতুন দিগন্ত , অনাগত ভবিষ্যতের সূচনা করেছিল । কেননা, পার্টি প্রতিষ্ঠাতাদের দিকপাল ত্রয়ী মুজফ্ফর আহমদ, আবদুল হালিম , আবদুর রেজ্জাক খানের ক্ষেত্রে বঙ্গীয় মুসলমান  সাহিত্য সমিতিকে  ‘ আতুড়ঘর‘ – ও বলা যেতে পারে । অথচ আজকের পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থী দলগুলিতে ‘ মুসলিম ‘ শব্দটাই  যেন ‘ ব্রাত্য ‘ হয়ে গেছে । আসলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ‘ দৃষ্টিভঙ্গি‘র  প্রশ্নটাই বড়ো হয়ে উঠছে ।


শেয়ার করুন
  • 238
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সম্পর্কিত নিবন্ধ

Leave a Comment