অন্যান্য 

যন্ত্রণার কথা হল মুসলিমদের ক্ষেত্রে দেশভাগের হাং ওভার ‘ যেন আর কাটতেই চাইছে না ; যে কোনো সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিষয়টা বড়ো হয়ে হাজির হয়ে যাচ্ছে ; তাই পশ্চাদপদতার অবসান হচ্ছে না ; সম-নাগরিকত্বের ধারণাও হারিয়ে যাচ্ছে ; নিজ দেশের নাগরিকদের সম্পর্কে তৈরি হচ্ছে এক ধরণের ভয়, ভীতির পরিবেশ ; তার কারণ , এক ধরণের বিচ্ছিন্নতাবোধ ; ‘আমরা ‘ আর ‘ ওরা ‘ এর ভেদও কাটছে না : ড.আবদুস সাত্তার

শেয়ার করুন
  • 270
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আমাদের দেশ ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভের পর ৭২ টি বছর পার করেছে। আজও দেশের সাধারণ মানুষ সেই অর্থে স্বাধীনতা পেয়েছে কী ? ৭২ বছর পর হিসাব মেলাতে গিয়ে প্রাপ্তির চেয়ে অপ্রাপ্তির সংখ্যাটাই বেশি করে চোখে পড়ছে। ৭২ বছর পরও এদেশের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সামনের সারিতে আনার প্রতিশ্রুতি এখনও দেওয়া হয় দলিতসংখ্যালঘুরা এতদিন ধরে যে অর্জিত স্বাধীনতার সম্পদ ভোগ করে আসছিল তা আগামী দিনে থাকবে কিনা তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। দেশজুড়ে সংখ্যাগরিষ্ঠের জাতীয়তাবাদ এমন জায়গায় পৌছে গেছে যে আজ দেশের সব রাজনৈতিক দলই মন্দিরমুখী হয়ে পড়েছে স্বাধীনতার ৭২ বছর পর এদেশের দলিতসংখ্যালঘুদের নানা বিষয় নিয়ে বাংলার জনরব নিউজ পোর্টালের মুখোমুখি নব বালিগঞ্জ মহাবিদ্যালয়ের সিনিয়র অধ্যাপক এবং রাজ্যের সংখ্যালঘু উন্নয়ন মাদ্রাসা শিক্ষা দপ্তরের প্রাক্তন মন্ত্রী . আবদুস সাত্তার । আজ দশম ‍কিস্তি । 

প্রশ্ন :  দেরিতে হলেও তপশিলী জাতির মানুষদের ক্ষেত্রে ‘ সামাজিক ন্যায় মঞ্চ‘ সিপিআইএম গঠন করলেও মুসলিমদের বিষয়ে সেই ধরনের কোনো সংগঠন নেই । ২০১৬ সালে গণশক্তির শারদ সংখ্যায় ` বির্তকের কেন্দ্রবিন্দু নাম ও খাদ্যাভাস` শীর্ষক লেখায় ক্ষোভও ব্যক্ত করেছিলেন তারপর আজো কিছুই হয়নি । এই প্রসঙ্গে ‍বিষয়টি যদি একটু বলেন ।

ড. আবদুস সাত্তার :  যা লিখেছিলাম তারই পুনরুক্তি করছি যাতে বিষয়টি বোঝার ক্ষেত্রে সুবিধা হয় । প্রশ্ন হলো সহজ সত্যে মুসলিম প্রসঙ্গটি কি বামপন্থীদের দলিল-দস্তাবেজও ঠাঁই পেতে সমর্থ হয়েছে ? ‘সংখ্যালঘু ‘ শব্দটি কোনোক্রমে উল্লেখ্য করে বামপন্থীরাও কী এক ধরনের স্বস্তিবোধ করেননি ? শ্রেণিহীন সমাজ গড়ার পথে ধর্ম, বর্ণ এক মস্ত বড়ো অন্তরায়, তাই কি এই  অনুল্লেখ ? গণপরিষদের সিদ্ধান্তের সঙ্গে এই বিষয়ে বামপন্থী দলগুলোর এক আশ্চর্য্য সাযুজ্য বর্তমান। আবার বি. আর আম্বেদকরের ১২৫ তম জন্মবাষির্কীর প্রাক্কালে দলিতদের সামাজিক- রাজনৈতিক –অর্থনৈতিক – সাংস্কৃতিক অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে গঠিত ‘ সামাজিক ন্যায় মঞ্চ ‘-এ মুসলিমরা ঠাঁই পায় না। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে , সংখ্যালঘু মুসলিমদের কি সামাজিক ন্যায় বিচারের লড়াই-এর প্রয়োজন নেই ? যদিও সাচার প্রতিবেদনে এর বিপরীত ভাষ্যের অনুপুঙ্খ উন্মোচন । ঐতিহাসিক রামচন্দ্র গুহ‘র মূল্যায়নে – ‘ আমি তপশিলী জাতিগুলির সঙ্গে অন্যান্য যেসব সংখ্যালঘু অংশের তুলনা করেছি তাদের মধ্যে তফাৎ গড়ে দিয়েছিলেন আম্বেদকরের উপস্থিতি । কেননা , মহাকরণ কিংবা সংসদে মুসলিমদের জন্য কোনো  সংরক্ষিত আসন ছিল না । আর স্বাধীন ভারতবর্ষে আম্বেদকরের মত বড়ো মাপের কোনো নেতাও তাদের ছিল না, যিনি কিনা তাদের প্রেরণা দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারতেন  – তাঁর  জীবৎকালেও না । তাঁর অনেক কাল পরেও না ‘। ( গাঁধী-উত্তর ভারতবর্ষ :  অনুবাদ আশীষ লাহিড়ী  )

‘বামফ্রন্ট সরকার : একটি পর্যালোচনায় তারই  স্বীকারোক্তি ‘ – উপার্জনশীল কাজে , রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে সম্মিলিত করার ক্ষেত্রে ঘাটতির কথা উল্লেখ করে লেখা হয়েছে –“ আসলে ষাটের দশক থেকে নিরাপত্তাজনিত বিষয়কে যে গুরুত্ব সহকারে আমরা বুঝলাম , নব্বই-এর দশকের পরবর্তী সময়ে ‘ পরিচয় ‘ ও ‘অংশদারিত্বে ‘ র যে দাবি উঠে আসে সে বিষয়ে যথার্থ অনুসন্ধান সাপেক্ষে কর্মসূচি নির্ধারণে রাজনৈতিক সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে দূর্বলতা দেখা দেয়।” প্রশ্ন হলো –

এক. তাহলে বামপন্থীরা ধর্ম, বর্ণকে নিরিখ করে সামজিক ন্যায় বিচারের লড়াই-এর জন্য রাজনৈতিক মঞ্চ গঠনও করে থাকে । পিছিয়ে পড়া নিরিখ হয়ে উঠে না ।

দুই.  রাজ্যের প্রায় ৩০ শতাংশ মুসলিম জনগোষ্ঠী উন্নয়নের কোনো কোনো সূচকে তপশিলী জাতির মানুষদের থেকেও পশ্চাদপদ , সাচার প্রতিবেদনেই একথা বলা হয়েছে । এই অংশের  মানুষদের ন্যায় বিচারের বিষয়টি  তাহলে  কি হবে ?  তাদের জন্য আলাদা কোনো মঞ্চ বা সংগঠন রাজ্যে করা হলো না কেন ?

তিন . সিপিআই(এম)-এর কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দেশের সব রাজ্যে সংখ্যালঘু মুসলিমদের দাবি-দাওয়া অধিকার রক্ষার  লড়াইয়ে মঞ্চ / সংগঠনের জন্ম হলেও , পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থীরা এই প্রশ্নে আশ্চর্য রকমের নীরব । এই নীরবতা নানা প্রশ্নের জন্ম দেয় । তাই না ?

চার.  ফলত, দলীয় পর্যালোচনায় ‘ পরিচয় ‘ ও ‘ অংশীদারিত্বের ‘ দাবির বিষয়ে বিগত ৪ বছরে যথার্থ অনুসন্ধান সাপেক্ষে রাজনৈতিক সাংগঠনিক ক্ষেত্রে সেই দূর্বলতা কাটিয়ে উঠার কোনো লক্ষণ কি আমরা দেখতে পেলাম ? কথার সঙ্গে কাজের মিল কোথায় ? ফাঁক ও ফাঁকি কি থেকে যাচ্ছে না ? এস ওয়াজেদ আলী কথিত সেই ট্রাডিসন সমানে চলছেই শেষ পর্যন্ত জয়ী হচ্ছে ।

পাঁচ . শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে পড়া বা শ্রেণির বিষয় নয় , ধর্ম বর্ণ-এর ভিত্তিটাই বড়ো হয়ে হাজির হলো । খুবই দুঃখজনক ।

ছয় .  তপশিলী জাতি এবং তপশিলী উপজাতির মানুষেরাও  আজো অসহায় শিকার ।  তাদের সামগ্রিক সুরক্ষার প্রশ্নে লড়াই আন্দোলনের ক্ষেত্রে সংগঠন মঞ্চ গঠনের প্রয়োজনীয়তা তো অনস্বীকার্য এবং তা হয়েছে খুবই সুখের কথা । মুসলিমদের বিষয়েও রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখানোর আবশ্যিকতা ছিল । যন্ত্রণার কথা হল মুসলিমদের ক্ষেত্রে দেশভাগের হাং ওভার ‘ যেন আর কাটতেই চাইছে না । যে কোনো সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিষয়টা বড়ো হয়ে হাজির হয়ে যাচ্ছে । তাই পশ্চাদপদতার অবসান হচ্ছে না । সম-নাগরিকত্বের ধারণাও হারিয়ে যাচ্ছে । নিজ দেশের নাগরিকদের সম্পর্কে তৈরি হচ্ছে এক ধরণের ভয়, ভীতির পরিবেশ । তার কারণ , এক ধরণের বিচ্ছিন্নতাবোধ । ‘আমরা ‘ আর ‘ ওরা ‘ এর ভেদও কাটছে না ।


শেয়ার করুন
  • 270
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সম্পর্কিত নিবন্ধ

Leave a Comment