অন্যান্য 

একজন সত্যিকার ব্যতিক্রমী কমিউনিষ্ট রাজনীতিবিদ ছিলেন অনিল বসু

শেয়ার করুন
  • 6
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সেখ ইবাদুল ইসলাম : আরামবাগের প্রাক্তন সাংসদ অনিল বসু এই পৃথিবীর মায়া কটিয়ে চলে গেলেন । নিরবেই বিদায় নিলেন তিনি । জানি না তাঁর কাছ থেকে যাঁরা নানা সুযোগ-সুবিধা পেয়েছিলেন তাঁরা আজ তাঁর মৃত দেহ সামনে হাজির হয়েছিলেন কিনা । অনিল বসুর নাম আমি আমার শিশু বয়স থেকেই শুনে আসছি । তাঁর বাম আন্দোলন আমি দেখিনি । কিন্ত তাঁকে ছোট বয়স থেকেই দূর থেকে দেখতাম । ভয় পেতাম । আমরা ভাবতাম অনিল বসু একজন দোদন্ডপ্রতাপ রাজনীতিবিদ । তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে কেউ কথা বলতে পারতেন না। তারপর কলেজে পড়াশোনা করার সময় বেশ কয়েকবার অনিল বসুকে দেখেছি , সবাই তাঁকে ভয় করতেন । তিনি আমাদের কলেজ খানাকুলের রাজা রামমোহন রায় মহাবিদ্যালয়ের পরিচালন সমিতির সভাপতি হিসেবে যখন আসতেন তখনও তাঁকে অনেকেই ভয় পেতেন । এমনকি ছাত্র সংসদের নেতারাও তাঁকে যথেষ্ট সমীহ করতেন ।

তারপর ছাত্র জীবন পার করে সূদুর খানাকুল থেকে কলকাতায় চলে আসি । রুটি –রুজির তাগিদে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করি । আমরা সাংবাদিকতায় এসেছিলাম টাকা রোজগারের আশায় নয় । সত্য কথাকে তুলে ধরার লক্ষ্যে । সাংবাদিকতার স্বার্থে অনিল বসুকে আমার কলমে অনেক আক্রমন করে লিখেছি । এমন কিছু শব্দ তাঁর সম্পর্কে ব্যবহার করেছি যা আজকের দিনে এসে মনে হয় সেগুলি ব্যবহার না করলেও ভাল হত । এভাবে একজন কমিউনিষ্টকে অপমান করা আমার ঠিক হয়নি । পরে সাংবাদিকতার স্বার্থে অনিল বসু সম্পর্কে যত খোঁজ-খবর নিয়েছি তাতে আমার মনে হয়েছে অনিল বসু ব্যতিক্রমী রাজনীতিবিদ ছিলেন । সিপিএম পার্টির নেতা হিসেবে তাঁর যে চরিত্র ছিল তার সঙ্গে ব্যক্তি অনিল বসুর চরিত্রের আকাশ-পাতাল তফাৎ ছিল । ব্যক্তিগতভাবে তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয়েছিল ২০০৪ সালে । তিনি কলকাতায় একটি অনুষ্ঠানে এসেছিলেন । সেই পরিচয় ।

তারপর একদিন তাঁর বাড়িতে গিয়ে  পরিচয় দিতেই বলেছিলেন, আপনি তো আমার সমালোচক । সমালোচনা করুন আমার আপত্তি নেই । তারপরেই বললেন, শুধু আমার নয় ,আমাদের দলেরও আপনি সমালোচক । এই কথা শুনে ভেবেছিলাম আমার কাজটা উনি হয়তো করেই দেবেন না। উনার সম্বন্ধে যা শুনে থাকি তাতে এটা ভাবছিলাম সমালোচক বলার পরও উনি আমাকে কেন বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে বলছেন না । একটু পরে আমিই সাহস করে বললাম দাদা আজ আসছি, ওই বিষয়টি একটু দেখবেন । তিনি বললেন, আমি নিজে খোঁজ নেব ।

এক মাসের মাথায় তিনি ওই কাজটি করে দিয়েছিলেন । ফোনে কৃতঞ্জতা প্রকাশ করতে গেলে উনি বললেন , মানুষের কাজ করাটা আমাদের দায়িত্ব । তারপরও আমার কলমে অনিল বসুর প্রশংসা দেখা যায়নি । কিন্ত ব্যক্তি অনিল বসুকে শ্রদ্ধা করতাম । একটা বিষয় ২০০৪ সালের পর থেকে ভাবতাম হুগলী জেলার মানুষ হিসেবে আমি যতই অনিল বসু কিংবা বামেদের সমালোচনা করি না কেন , ব্যক্তি অনিল বসু আমাকে কিছুই বলবেন না । বরং বিপদে পড়লে কিংবা তাঁর পার্টির ক্যাডার হাতে আক্রান্ত হলে তিনিই ত্রাতা হিসেবে কাজ করবেন । আজ এ কথা দৃঢ় কন্ঠে বলছি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের আমলে আমরা এভাবে সমালোচনা করলে কোনো মন্ত্রী-সাংসদ আমাদের সঙ্গে ভাল ব্যবহার করবে এটা কল্পনা করা যায় না ।

একবার অনিল বসু আমাকে বলেছিলেন, সবাই আমার কাছ থেকে অনেক কিছু চেয়েছে ব্যতিক্রম আপনি ? সত্যিই আমি কিছু চাইনি । চাইলে হয়তো পেতাম । কিন্ত বাম নেতাদের মধ্যে অনিল বসুকেই আমার মনে হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিবিদ । মুসলিমদের জন্য তিনি অনেক কাজ করার চেষ্টা করে গেছেন । তবে অনিল বসুর মাধ্যমে শেষের দিকে অনেক গরীব-অভাবী মানুষদের ইনসাফ পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছি ।

২০১৫ সালে চুচঁড়া গোর্খা ময়দানে বেশ কয়েক বছর পর আমার সঙ্গে অনিল বসুর সঙ্গে দেখা হয়েছিল । স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে প্রণাম করতে যাওয়ার সময় তিনি বাধা দিলেন । তারপর বললেন কেমন আছেন ? বললাম ভালো । তাঁকে জিঞ্জাসা করেছিলাম আপনি কেমন আছেন ? তিনি বললেন ভালো নেই । শরীরটা ভালো যাচ্ছে না, মনটা ভালো নেই । হুগলী জেলার এক সময়ের বেতাজ বাদশাহ-র মন ভাল নেই এই কথাটাই একটা চমক লেগে ছিল, কিন্ত আমার মনটাও ভারক্রান্ত হয়েছিল ।

যে মানুষটা আরামে-আয়াসে জীবন কাটাতে পারতেন, সেই মানুষটাই কমিউনিষ্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বাবা-মাকে ত্যাগ করেছিলেন । বেছে নিয়েছিলেন যাযাবর জীবন । জন্মভিটা ছেড়ে খানাকুলকে কমিউনিষ্ট আন্দোলনের পীঠস্থানে পরিণত করেছিলেন । সেই মানুষটির অক্লান্ত পরিশ্রমে প্রফুল্ল সেনের আরামবাগ, শান্তিমোহন রায়ের খানাকুলকে লালদূর্গে পরিণত করেছিলেন । তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতাকে বিন্দুমাত্র সম্মান না দিয়ে বিমান বসুরা যেভাবে তাঁকে দল থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন তা এক কথায় অনৈতিক ।

যাইহোক অনিল বসু চলে গেলেন । একটা যুগের অবসান হল । অনেকে তাঁকে দাম্ভিক নেতা বলে ব্যঙ্গ করেছেন , তিনি নাকি আরামবাগের ভগবান হয়ে গিয়েছিলেন । তিনি বেশ কয়েক বছর ক্ষমতা থেকে অনেক দূরে ছিলেন তারপরেও কী হুগলী জেলার মানুষ অন্য দাম্ভিক নেতাদের দেখছেন না ? তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রধান বৈশিষ্ট্য কোনো বিষয় ঠিক মতো বুঝিয়ে দিতে পারলে তিনি তাঁর সঠিক সমাধান করে দিতেন । রাজনীতি রং দেখে নয় মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই । তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি ।

 

 


শেয়ার করুন
  • 6
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সম্পর্কিত নিবন্ধ

Leave a Comment