অন্যান্য 

অর্থনৈতিক-সামাজিক-রাজনীতি-সাংস্কৃতিকভাবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী হিসাবে সংখ্যালঘু মুসলিমরাও চাইছে জীবন-যাপনের সমস্ত ক্ষেত্রে সমতা,ন্যায় ও ক্ষমতায়ন : ড. আবদুস সাত্তার

শেয়ার করুন
  • 163
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আমাদের দেশ ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভের পর ৭২ টি বছর পার করেছে। আজও দেশের সাধারণ মানুষ সেই অর্থে স্বাধীনতা পেয়েছে কী ? ৭২ বছর পর হিসাব মেলাতে গিয়ে প্রাপ্তির চেয়ে অপ্রাপ্তির সংখ্যাটাই বেশি করে চোখে পড়ছে। ৭২ বছর পরও এদেশের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সামনের সারিতে আনার প্রতিশ্রুতি এখনও দেওয়া হয় দলিতসংখ্যালঘুরা এতদিন ধরে যে অর্জিত স্বাধীনতার সম্পদ ভোগ করে আসছিল তা আগামী দিনে থাকবে কিনা তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। দেশজুড়ে সংখ্যাগরিষ্ঠের জাতীয়তাবাদ এমন জায়গায় পৌছে গেছে যে আজ দেশের সব রাজনৈতিক দলই মন্দিরমুখী হয়ে পড়েছে স্বাধীনতার ৭২ বছর পর এদেশের দলিতসংখ্যালঘুদের নানা বিষয় নিয়ে বাংলার জনরব নিউজ পোর্টালের মুখোমুখি নব বালিগঞ্জ মহাবিদ্যালয়ের সিনিয়র অধ্যাপক এবং রাজ্যের সংখ্যালঘু উন্নয়ন মাদ্রাসা শিক্ষা দপ্তরের প্রাক্তন মন্ত্রী . আবদুস সাত্তার স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে প্রথম সাক্ষাৎকারটি  প্রকাশ করা হয়েছে ১৫ আগষ্ট আজ সপ্তম  কিস্তি প্রকাশ করা হচ্ছে এরপর থেকে প্রতিবার শনিবার রাতে ধারাবাহিকভাবে বিস্তারিত সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করা হবে। 

প্রশ্ন : সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলির এতো যে কথা , তাহলে কি সবই বাগাড়ম্বর ?

ড. আবদুস সাত্তার : তা হয়তো বলবো না । তবু , স্বাধীনতা পূর্ববর্তী ব্যবস্থাপনায় তুলামূলকভাবে ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিসাবে মুসলিমদের অনেক বলিষ্ঠ জায়গা / অবস্থান ছিল। মুসলিমরা অন্ততঃ ‘ধর্মীয় পরিচিতির‘ ভিত্তিতে তাঁদের সেই দাবিগুলি উচ্চারণ করতে পারতো । দেশভাগের লেলিহান শিখা –এর সব কিছুকে গ্রাস করে নেয় । শুধু পড়ে থাকে ধর্মাচরণের স্বাধীনতা ও নিজস্ব পচ্ছন্দ অনুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণের অধিকার । প্রসঙ্গত, উল্লেখ্য, ধর্মীয় অধিকারের তুলনায় রাজনীতির সংস্কৃতির অধিকারকে ‘এলোমেলো সম্ভাবনা ‘ হিসাবে  উপস্থিত করার ফলে ‘মুসলিম পরিচিতি‘র প্রশ্নটিও তাই বার বার ফিরে আসছে । নরেন্দ্র দামোদর মোদীর নেতৃত্বাধীন ভারতে আজ তাও আক্রান্ত ! সাচার কমিটির প্রতিবেদনে এই নির্দিষ্ট গন্ডির বাইরে গিয়ে স্বাধীনোত্তর ভারতে এই প্রথম ‘দেশের সম-নাগরিক হিসাবে সংখ্যালঘুদের অধিকারের বিষয়টিকে আর্থ-সামাজিক রাজনীতির বৃহত্তর মঞ্চে তুলে ধরার অনন্য সাধারণ গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করেছে । স্বভাবতই দেশের নাগরিক হিসেবে সংবিধান প্রদত্ত  সমান-সুযোগ , সমান অধিকার , উন্নয়নের ঘাটতি , নেতৃত্বের ঘাটতি – এর মতো বিষয়গুলি সমাজ-মানসে আলোচনা বির্তক-চুলচেরা বিশ্লেষণ হয়েছে এবং আজো হচ্ছে ! তার কারণ , সমস্যার সমাধান যে অধরা থেকে যাচ্ছে ! অর্থনৈতিক-সামাজিক-রাজনীতি-সাংস্কৃতিকভাবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী হিসাবে সংখ্যালঘু মুসলিমরাও চাইছে জীবন-যাপনের সমস্ত ক্ষেত্রে সমতা,ন্যায় ও ক্ষমতায়ন। ‘ধর্মাচরণের স্বাধীনতা পেয়েছে, এই তো যথেষ্ট ‘- এর দ্বারা চালিত হয়ে কেইবা ‘অ-সম নাগরিক‘ হয়ে বেচেঁ থাকতে চায় ? বহুমাত্রিক নাকি একমাত্রিক – কোন পরিচয় তাঁদের জীবনাচরণের ক্ষেত্রে প্রধান অবলম্বন হয়ে উঠবে ?

প্রশ্ন : একে তো উন্নয়নের এই অবস্থা , অপরদিকে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ , সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সর্বোপরি সাম্প্রদায়িক শক্তির বাড়বাড়ান্ত হচ্ছে এই রাজ্যে । এর অন্তনির্হিত কারণ কি ?

 ড. আবদুস সাত্তার : একশ্রেণির ক্ষমতাসীন লোকেদের ধারণা হলো , ভারতের অন্যান্য রাজ্যে ভয়-ভীতি দাঙ্গার পরিবেশ রয়েছে সেক্ষেত্রে তুলনায় পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা ভালো । কাঙ্খিত উন্নয়ন না হলেও জান-মাল-ঈমানের নিরাপত্তা তো এই রাজ্যে আছে । ফলত, তারা নিরাপত্তার স্বার্থেই শাসক শ্রেণিকে ভোট দেবে । কোথায় আর যাবে ? সমস্যাটা এখানেই । স্বাধীনোত্তর পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে রাজনৈতিক দল নির্বিশেষে তথা কথিত ধর্মনিরপেক্ষ , উচ্চবর্ণ সমন্বিত সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদের দ্বারা পরিচালিত ক্ষমতার আগল ভেঙে সাম্প্রদায়িক শক্তি বেগবান হয়ে উঠছে । পার্থক্যটা দাঁড়ায় পিঠ আর পেটের মধ্যে । কেউ পিঠে মেরে ঝাড়ে-বংশে নির্মূল করতে চাইছে । সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি সম্পন্ন রাজনৈতিক দলটি বার্তা দিতে চায় এদেশে থাকতে হলে সেই দলের নির্ধারিত শর্তে  বেঁচে থাকতে হবে । কারণ , তারা ধর্মীয়ভাবে সংখ্যালঘু । ভাগবতীয় কথায় হিন্দী, হিন্দু , হিন্দুত্ব । এর ভিত্তিতে রচিত হবে হিন্দুরাষ্ট্র । যুক্তি হিসাবে খাঁড়া করা হচ্ছে , ব্রিটিশদের জন্য ব্রিটেন , আমেরিকানদের জন্য আমেরিকা , ভারত-ও তেমনিভাবে হিন্দুরাষ্ট্র । কিন্ত সমস্যা হলো, এই মতের প্রবক্তারা ভুলে যাচ্ছেন, ব্রিটিশ বা আমেরিকা কোনো বিশেষ ধর্ম নয় । আর এই ভাবনার প্রবল চাপে রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভাবনার পদচিহ্নবাহী তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দলগুলিও হয় অসহায় নয়তো ধর্মভিত্তিক সংখ্যাগুরুবাদের রাজনীতির আশ্রয়ে নিজেদের রক্ষা করতে চাইছে । তাই তাঁরাও মুসলমানদের পিঠে মারতে চায় না ঠিকই কিন্ত দীর্ঘমেয়াদে পেটেরতা স্থায়ী সুরাহা করতে চায় না । না হলে স্বাধীনতার পরবর্তী সত্তর বছর ধরে ধর্মনিরপেক্ষ. বিভিন্ন মর্তাদর্শের ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক দল রাজ্য প্রশাসন পরিচালনা করেছে অথচ রাজনৈতিক সদিচ্ছার সেই প্রমাণ কোথায়? বিভিন্ন কমিটি-কমিশনের প্রতিবেদনে আজো কেন পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমদের বিষয়ে দূর্দশার ছবি প্রকটিত হয়ে জনমানসে নিত্য নতুনভাবে হাজির হয়ে চলেছে ? কে দেবে এর উত্তর ? আবার মানসিকতার দিক থেকে এর সব থেকে বড়ো ও সাম্প্রতিকতম উদাহরণ হলে রোহিঙ্গা জনজাতির বিষয়টি ।

প্রশ্ন : রাজ্যের রাজনৈতিক দলগুলি বিশেষত বামপন্থীরা মানুষের সংকটকালীন সময়ে পাশে দাঁড়িয়ে সাহায্য করেন । রেহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে সেইভাবে দেখা গেল না কেন ?

 ড. আবদুস সাত্তার : আঞ্চলিক , সংকীর্ণ ভাবনার অধিকারী রাজনৈতিক দলগুলির নেতা-নেত্রীর কথা না হয় ছেড়েই দিলাম । কিন্ত মর্তাদর্শগতভাবে ঘোষিত আন্তর্জতিকতাবাদে বিশ্বাসী, শান্তি সংহতির প্রবক্তাদের ও এক্ষেত্রে ভুমিকাটি কী ছিল ? ধর্মনিরেপক্ষ প্রগতিশীল যে সমস্ত নেতানেত্রীরা কিছু্ হলে তালতলা, মল্লিকবাজার পার্কসার্কাস, রাজাবাজার অঞ্চলে মানবতার সেবায়, সাহায্যে চাঁদা তোলার জন্য সোচ্চারে হাজির হয়ে যান । অথচ রেহিঙ্গা জনজাতির মানুষদের সাহায্যার্থে তারাই অদ্ভূতভাবে , আশ্চর্য রকমের নীরব । এই ঘৃন্য কাজের জন্য বিশ্বব্যাপী আলোড়ন হলেও বাংলার রাজনৈতিক নেতানেত্রীরা দায়সার গোছের বিবুতি দিয়েই নিজেদের দায়িত্ব  যেন সুন্দরভাবে পালন করলেন । অথচ মায়ানমার সরকারের রেহিঙ্গা মুসলিম জনজাতির নির্মূলকরণ অভিযানের বিরুদ্ধে ও মানবতার সপক্ষে এই বাংলার মানুষের সাহায্য নানা অর্থে এই অসহায় দূর্গত মানুষদের সহায়ক হতে পারত । সীমান্তে জীবন-মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এই সমস্ত মানুষগুলি পেতে পারত বেঁচে থাকার এক অমোঘ রসদ ।

ভাবতে অবাক লাগে ছিন্নমূল হওয়ার যন্ত্রণা যাঁদের রাজনৈতিক শোণিতে, দলীয় ক্ষমতার বৃত্তে বর্তমান তাঁরাও কিনা রইলেন মানবতার এই সংকটময় সময়ে দূরে, বহুদূরে ? এক ধরনের শৈত্য, নীরবতাই ও শেষ পর্যন্ত তাঁদেরও আশ্রয় হয়ে উঠল ? নাকি একটা নির্দিষ্ট ধর্মীয় জনজাতির মানুষের কান্না কি ভোট- রাজনীতির জটিল, রহস্যময় অঙ্কে ভিজে আর স্নিগ্ধ হয় না ? হয়তো এই ভেবে যে, রেহিঙ্গাদের সাহায্যের প্রশ্নে ময়দানে অবতীর্ণ হলে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান ঘূর্ণায়মান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাবাবেগ রক্ষার্থে সাম্প্রতিক রাজনীতির যে- নির্মাণ, তাতে সমস্যা হবে ! ‘সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষে‘র মনে ভুল বার্তা যাবে বলে ,এই ভাবনার বশবর্তী হয়েই কি এই পশ্চাদগমন ? কোন সুপ্ত ভাবনা, বীজ নিহিত রয়েছে এর মূলে ? নাকি এই ভাবনা, বীজ , ফুলে-ফলে পল্লবিত হয়ে অনুচ্চারিতভাবে হলেও আর শ্রেণি নয় , সংখ্যাগরিষ্ঠের চিন্তা-চেতনা ভাবনাই যুগ পরম্পরায় বহমান থেকেছে ?


শেয়ার করুন
  • 163
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সম্পর্কিত নিবন্ধ

Leave a Comment