প্রচ্ছদ 

তৃণমূলের আমলে পঞ্চায়েত ও জেলাস্তরে দলিত-মুসলিমদের ক্ষমতায়ন হয়েছে সন্দেহ নেই, কিন্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্তরগুলিতে দলিত ও মুসলিমরা আজো পৌঁছাতে পারেনি : ড. আবদুস সাত্তার

শেয়ার করুন
  • 250
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আমাদের দেশ ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভের পর ৭২ টি বছর পার করেছে। আজও দেশের সাধারণ মানুষ সেই অর্থে স্বাধীনতা পেয়েছে কী ? ৭২ বছর পর হিসাব মেলাতে গিয়ে প্রাপ্তির চেয়ে অপ্রাপ্তির সংখ্যাটাই বেশি করে চোখে পড়ছে। ৭২ বছর পরও এদেশের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সামনের সারিতে আনার প্রতিশ্রুতি এখনও দেওয়া হয় দলিতসংখ্যালঘুরা এতদিন ধরে যে অর্জিত স্বাধীনতার সম্পদ ভোগ করে আসছিল তা আগামী দিনে থাকবে কিনা তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। দেশজুড়ে সংখ্যাগরিষ্ঠের জাতীয়তাবাদ এমন জায়গায় পৌছে গেছে যে আজ দেশের সব রাজনৈতিক দলই মন্দিরমুখী হয়ে পড়েছে স্বাধীনতার ৭২ বছর পর এদেশের দলিতসংখ্যালঘুদের নানা বিষয় নিয়ে বাংলার জনরব নিউজ পোর্টালের মুখোমুখি নব বালিগঞ্জ মহাবিদ্যালয়ের সিনিয়র অধ্যাপক এবং রাজ্যের সংখ্যালঘু উন্নয়ন মাদ্রাসা শিক্ষা দপ্তরের প্রাক্তন মন্ত্রী . আবদুস সাত্তার স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে প্রথম সাক্ষাৎকারটি  প্রকাশ করা হয়েছে ১৫ আগষ্ট আজ ষষ্ঠ কিস্তি প্রকাশ করা হচ্ছে এরপর থেকে প্রতিবার শনিবার রাতে ধারাবাহিকভাবে বিস্তারিত সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করা হবে।

প্রশ্ন : শুধু রাজ্যসভা , লোকসভা নয়, সরকার পরিচালনা দপ্তর বন্টনের ক্ষেত্রেও কি এই দূর্দশা ও বৈষম্যের ছবি ফুটে ওঠে না ?

. আবদুস সাত্তার : গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত সরকারের মন্ত্রিসভা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে । মুখ্যমন্ত্রী , পূর্ণমন্ত্রী ,উপমন্ত্রী , প্রতিমন্ত্রীর ভুমিকাও সাংবিধানিকভাবে স্থিরীকৃত । তাই মন্ত্রিসভায় কোন অংশের কতজন , কোনস্তরের প্রতিনিধিত্ব করছেন তা খুবইগুরুত্বপূর্ণ। কেননা, সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের ক্ষেত্রে তার প্রভাব অনস্বীকার্য । এই অংশের মানুষকে ভোট-রাজনীতিতে কাছে টানার ক্ষেত্রে তাইতো ‘চা-ওয়ালা ‘  ‘মৌলানা ‘ থেকে শুরু করে নানা রকম বিশেষণ বিভূষিত হতে কিংবা ধর্মীয় বেশভুষায় সজ্জিত হয়ে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে দেশের নেতা-নেত্রীরা ভীষণ ভাবে পচ্ছন্দ করেন । বিগত এক দশকে ভিন্ন মতাদর্শের দুটি সরকারের পরিসংখ্যানের দিকে একবার নজর দেওয়া যেতে পারে । ২০০৬-এ ২৩৫বিধায়ক আসন বিশিষ্ট বামফ্রন্ট মন্ত্রিসভায় ৪৪ জন সদস্যের মধ্যে মুসলিম ৫জন , তপশিলী জাতি ০৫ , তপশিলী উপজাতির ০২ জন মন্ত্রী ছিলেন । অপরদিকে ৩০জন অর্থাৎ ৬৮ শতাংশ উচ্চবর্ণের প্রতিনিধি । যা সিদ্ধার্থশংকর রায় মন্ত্রিসভা থেকে শতাংশের হারে ২ শতাংশ কম । তৃণমূল কংগ্রেস মুসলিমদের ক্ষেত্রে সিদ্ধার্থ জামানার শতাংশের হার পূরণ করলেও অর্থাৎ ১৩.৬৩ শতাংশ উপহার দিলেও তপশিলী উপজাতি জনগোষ্ঠীর মন্ত্রির সংখ্যা ৩ থেকে ১ হয়ে গেছে। অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির ক্ষেত্রে বামফ্রন্ট ও তৃণমূল , দুই সরকারের সংখ্যাটা হচ্ছে ০১।

তুলনামূলক বিচারে এখানেই শেষ নয়, গভীর মনোযোগের সঙ্গে যদি লক্ষ্য করেন তাহলে দেখতে পাবেন , জনজীবনের সামগ্রিক ও সুষম উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত ,গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরগুলি যেমন অর্থ, স্বরাষ্ট্র , শিক্ষা , স্বাস্থ্য ,শিল্প রাজনৈতিক দলগুলির পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্দিষ্ট ঘেরাটোপে আবদ্ধ থেকে যায় । এর দ্বিবিধ কারণ হতে পারে – এক. হয়তো এই অংশের মানুষের যোগ্যতা ও দক্ষতা সম্পর্কে তাঁরা নিঃসন্দেহ নন ও দুই . সচেতনভাবেই সামাজিক প্রত্যাখান / বর্জন ( Social exclusion)- এর প্রক্রিয়া সমভাবেই চালু রয়েছে । এই ভাবনারই পরিণতিতে মুসলিম ও অনগ্রসর শ্রেণির মানুষেরা মুখরক্ষায় মতো অথবা স্ব-সম্প্রদায়ের ভাবাবেগ সম্পর্কিত দপ্তরের দায়িত্ব
পেয়ে থাকেন । আবার, একে তো তাদের মন্ত্রীর সংখ্যা কম , তার উপরে অর্ধাংশ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান । তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি আরো ভীষণভাবে প্রযোজ্য । প্রতিমন্ত্রীবৃন্দ আবার পূর্ণমন্ত্রীর অধীনস্ত ,যাঁদের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কোনো অধিকার থাকে না। বাস্তবেও , এই সমস্ত মন্ত্রীদের সেই ভাবে মন্ত্রকে গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজ থাকে না। পূর্ণমন্ত্রীর মুখাপেক্ষী হয়েই মন্ত্রিসভায় দিন গুজরান করতে হয় । মন্ত্রিসভায় মুসলিমদের সংখ্যা ও গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের নিরিখে স্বাধীনোত্তর বাংলায় সিদ্ধার্থশংকর রায়ের মন্ত্রিসভা এক্ষেত্রে কিছুটা হলেও এগিয়ে । কালের নিরিখেও , আজ থেকে প্রায় ৪৭ বছর আগে তিনি যা শুরু করতে পেরেছিলেন তা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া তো দূরের কথা ধরে রাখাও সম্ভবপর হয়নি। তাছাড়া , রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে ‘ পাখি সব করে রব / রাতি পোহাইল ‘। তপশিলী জাতি ও তপশিলী উপজাতিদের ক্ষেত্রেও একই ছবি বর্তমান । বিষয়টিকে কি বলবো গণতান্ত্রিক , ধর্মনিরপেক্ষ ? নাকি ভীষণ ভাবে অগণতান্ত্রিক ? বহুত্ববাদী ভাবনার চর্বিত চর্বন ? এই প্রশ্নগুলিই বাস্তব সত্য হয়ে চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে ।

প্রশ্ন : বর্তমান রাজ্য মন্ত্রিসভাতেও এই অংশের বেশিরভাগই আবার প্রতিমন্ত্রী সম্পর্কে কি বলবেন ?

. আবদুস সাত্তার : বলার আর কি আছে ? এই মন্ত্রিসভাতেও ৭ জনের মধ্যে ৪জনই প্রতিমন্ত্রী তাহলে বুঝুন অবস্থাটা ! আবার দপ্তর বন্টনের দিকে তাকালে তার করুণ চেহারাটা আরো ভীষণভাবে প্রকট হয়ে ওঠে ।
প্রশ্ন : ভারতের বেশ কিছু রাজ্যে মুসলিমরা সংখ্যায় ও শতাংশে তুলনামূলকভাবে কম হলেও, সেখানে মুসলিম মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন অথচ এই রাজ্যে এ বিষয়ে এত আড়ষ্টতা কেন ? নাকি যোগ্যতার অভাব ?
ড. আবদুস সাত্তার : এটা ঠিকই যে , মহারাষ্ট্র , কর্নাটক , রাজস্থান, বিহার ও অসম প্রদেশে মুসলিম রাজনীতিবিদ মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন । কিন্ত মনে রাখতে হবে , সবই কংগ্রেস শাসনকালে । ভারতের রাজনীতিতে কংগ্রেস ধর্মনিরপেক্ষতা , বহুত্ববাদকে তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্ব প্রদান করেছে । অন্য কোনো সর্বভারতীয় রাজনৈতিক দলে এই দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যায় না । এমনকী যাঁরা এই ধরনের বিষয়ে লেখা ও ভাষণে সব থেকে বেশি সোচ্চার, সেই বামপন্থী দলগুলিও এক্ষেত্রে চরম ব্যর্থতার পরিচয় প্রদান করেছে ।
দ্বিতীয়ত , যোগ্যতার প্রশ্নে বলতে গেলে বলতে হয় , দেশের মুখ্যমন্ত্রী থেকে সর্বোচ্চ প্রধানমন্ত্রী , রাষ্ট্রপতি পদেও যে সবাই স্নাতকোত্তর অথবা ডক্টরেট ছিলেন তা তো নয় । স্বাধীনোত্তরকালে জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে থেকে যে সমস্ত মুসলিম নেতা মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন তুলনামূলকভাবে বিচার করলে দেখা যাবে তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতা খুব কম, খুব খারাপ কিছু ছিল বলা যায় না।

প্রশ্ন : কিন্ত এটা তো স্বীকার করবেন, তৃণমূল সরকারের আমলে রাজ্যে বিধায়ক সংখ্যা শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এটা তো একটা ইতিবাচক পরিবর্তন মানবেন তো ?

. আবদুস সাত্তার : অবশ্যই ইতিবাচক পরিবর্তন । কোনো সন্দেহ নেই ।  সত্যকে মানতে অসুবিধা কোথায় ? কিন্ত ঐ পর্যন্ত । কোনো গুণগত পরিবর্তন হয়নি বললেই চলে । সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের কাজকর্মেই তার প্রমাণ পাওয়া যায় । কিন্ত এর সঙ্গে এটা স্বীকার করতে হবে যে , সাচার প্রতিবেদনের ফলে মুসলিম জনমানসে যে সচেতনতার সঞ্চার হয়েছে , সেই বিষয়টিকে কোনো রাজনৈতিক দলই অস্বীকার করতে পারেনি। তারই পরিনতিতে এই সামান্য আচড়মাত্র ।
দ্বিতীয়ত, বৃদ্ধির গুণগত বিষয়টিকে স্বীকার করে নিয়েই বলছি- এর ফলে কি রাজ্যস্তরে মুসলিমদের সেইভাবে রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি পেয়েছে ? এক কথায় বলতে গেলে পূর্বের তুলনায় ত্রিস্তর পঞ্চায়েত , পৌরসভার ক্ষেত্রে ক্ষমতায়ন অবশ্যই বৃদ্ধি পেয়েছে । বিশেষ করে মুসলিম মহিলারা রাজনীতির মূলস্রোতে উঠে এসেছেন। জেলা সভাধিপতি , পৌরপ্রধান হয়েছেন জেলাগুলিতে । কিন্ত কাক্ষিত স্তরে পৌঁছায়নি। মতাদর্শ নির্বিশেষে সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলি কম-বেশি প্রায় একই পথের পথিক । সিদ্ধান্ত গ্রহণের  স্তরগুলিতে মুসলিম ও দলিত মানুষেরা আজো পৌঁছাতে পারেননি। সেই স্তরগুলি আজো উচ্চবর্ণের জন্য বিশেষভাবে সংরক্ষিত । তাই নয় কি ? কোথায় দলিত , মুসলিমরা আছেন ? মূলত , এই জনগোষ্ঠীর মানুষদের একটা নির্দিষ্ট গন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। স্বাধীনতার সত্তর বছর পরেও এই তো তাদের ফলকনামা !

গণপরিষদে উচ্চারিত মুসলিম ও দলিত সমাজের দুই বিশিষ্ট প্রতিনিধির সাবধানবানী বিষয়টি বোঝার ক্ষেত্রে আমাদের সহায়ক হতে পারে । বোঝা যাবে আমরা কতদূর এগিয়েছি ।
এক . মাদ্রাজের বি. পকার বাহাদুর বলেছিলেন – ‘ এই মুহূর্তে এদেশে যে অবস্থা বিরাজ করছে , তাতে মুসলিম সম্প্রদায়ের চাহিদা আর প্রয়োজনগুলি যে কী তা অমুসলিমদের পক্ষে হৃদয়ঙ্গম করা খুবই কঠিন  ।—–‘
দুই . সেন্ট্রাল প্রভিন্সের জে. এইচ. খন্দেকর-এর জবানিতে –
‘ আমরা যে অযোগ্য , তার দায় আপনাদেরই ওপরেই বর্তায় । হাজার হাজার বছর ধরে আমাদের অবদমিত করে রাখা হয়েছে । আপনারা আপনাদের স্বার্থ সাধনের উদ্দে্শ্য নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন আর আমাদের এতই অবদমিত করে রেখেছিলেন যে , আমাদের মন ,আমাদের দেহ, এমনকী আমাদের হৃদয় পর্যন্ত কাজ করে না , আমরা সামনের দিকে এগোতে পারি না । এই হল অবস্থা । আপনারাই আমাদের এই অবস্থায় নামিয়ে দিয়েছেন , তারপর আপনারাই বলছেন আমরা যোগ্য নই , আমরা যথেষ্ট নম্বর পাইনি। কী করে আমরা নম্বর পাব ? বলার আর কী কিছু আছে ?

আমাদের রাজ্যে তপশিলী উপজাতি সম্প্রদায়ের মানুষ ৫.৫ শতাংশ ; তাদের জন্য নির্ধারিত সংরক্ষণ জনসংখ্যার থেকেও বেশি ৬ শতাংশ । অথচ এই মানুষগুলির কী অবর্ণনীয় দূর্দশা ! পিপঁড়ের ডিম খেয়ে নাকি তাদের বেঁচে থাকতে হয় । জঙ্গলে শালপাতা কুড়ানো তাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ ।নিম্ন মানের শিক্ষা , স্বাস্থ্য , পরিকাঠামো যাবতীয় প্রতিকূলতা তাদের ঘিরে থাকে । বছরের পর বছর ধরে চলছে । কি বলবেন ? কি বলার থাকতে পারে ? ( চলবে )


শেয়ার করুন
  • 250
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সম্পর্কিত নিবন্ধ

Leave a Comment