প্রচ্ছদ 

অতিরিক্ত কংগ্রেস বিরোধিতা মমতার ‘কমিটেড ’ ভোট হাত ছাড়া হতে পারে!

শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সেখ ইবাদুল ইসলাম : পশ্চিমবাংলায় সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনের পর আমরা খূশি হয়েছিলাম এই কারণে যে বাংলার মতো কৃষ্টি-সংস্কৃতি প্রধান রাজ্যে বিজেপি দল ক্ষমতায় আসতে পারেনি । অবশ্য আসা সম্ভবও ছিল না । কতকগুলো মিডিয়ার প্রচারে বিজেপির এখানে উত্থান হয়েছিল এর বাইরে তাদের কোনো অস্তিত্ব ছিল না । মিডিয়ার প্রচার এতো তীব্র ছিল যে তৃণমূলের অনেক নেতা-মন্ত্রীও ভেবে নিয়েছিলেন এবার হয়তো বিজেপিই বাংলায় ক্ষমতায় আসবে । বর্ষীয়ান সাংবাদিক থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা মনে মনে ভেবে নিয়েছিলেন বিজেপি বাংলায় ক্ষমতায় চলে আসছে। তা কিন্ত হয়নি । আমরা প্রথম থেকেই বলে আসছিলাম এই রাজ্যে বিজেপির হাওয়ার নেপথ্যে মিডিয়ার ভূমিকা রয়েছে । এছাড়া তাদের কোনো সাংগঠনিক শক্তি নেই ।

আর সেটাই ঘটলো সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে । এই নির্বাচনে বিপুল গরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় চলে এলো ফের তৃণমূল কংগ্রেস । পর পর তিনবার মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সি বসলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় । জ্যোতিবাবুর পর একমাত্র তিনি দ্বিতীয় মুখ্যমন্ত্রী যিনি এই সুযোগ পেলেন । মহিলা মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে তিনি দেশের মধ্যে রের্কড সৃষ্টি করেছেন । বাংলার মানুষ বিজেপি বিরোধী প্রধান মুখ হিসাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে মেনে নিয়েছেন । বাংলার মানুষের মনে হয়েছে বিজেপির একমাত্র বিকল্প হলেন মমতা । তাই তারা এবারের নির্বাচনে কোনো পক্ষকে সমর্থন না করে সরাসরি তৃণমূলকে সমর্থন দিয়েছে । আর এক্ষেত্রে রাজ্যের সংখ্যালঘু মুসলিম সমাজের এক তরফা সমর্থনকে অস্বীকার করা যাবে না । তারা ধর্মনিরপেক্ষ দুই দল কংগ্রেস এবং বামেদেরকে ত্যাগ করে সরাসরি মমতাকে সমর্থন দিয়েছে এই কারণে যে মমতাই একমাত্র বিজেপির বিকল্প হতে পারেন।

কিন্ত দুঃখের বিষয় হলো,ভোটে জিতে তৃতীয়বার মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর এবার তিনি জাতীয় রাজনীতিতে পা দেওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠেছেন । ত্রিপুরা , অসম , গোয়া ও মেঘালয়ে সংগঠন বিস্তারের নাম করে কংগ্রেস দলকে ভাঙানোর খেলায় মেতেছেন । অবশ্য কংগ্রেস তার দায় এড়াতে পারে না । নিজের দলকে ধরে রাখার মতো ক্ষমতা না থাকলে দল  তো ভাঙবেই এটা স্বাভাবিক প্রবণতা বলে আমাদের মনে হয়েছে। কিন্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল তৃণমূল কংগ্রেস যে হুংকার দিয়ে ত্রিপুরায় গিয়েছিল পুরভোটের  ফল বের হওওয়ার পর তাদের আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না । কারণ, ২০২৩-এর বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিপ্লব দেবকে প্রমাণ করতে হতো বিজেপির জনপ্রিয়তা এখনও ত্রিপুরায় অটুট রয়েছে । আর এক্ষেত্রে তৃণমূলের অংশীদারিত্ব প্রয়োজন ছিল । কারণ ভোটের শতাংশের হিসাব বলছে , তৃণমূল প্রায় ১৬ শতাংশের বেশি ভোট কেটেছে পুরসভা নির্বাচনে ।ফলে বামেরা ভোট শতাংশের দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানেও থাকলেও পুরসভায় ৯৯ শতাংশ আসন দখল করে বিজেপি নিজেদের আধিপত্য কায়েম করতে পেরেছে । আর একাজে তাদের সহযোগী ছিল তৃণমূল কংগ্রেস এটা কোনো রাজনৈতিক ভাষ্যকার অস্বীকার করতে পারবেন না ।

ত্রিপুরার কথা ছেড়েই দিন ! এবার আসা যাক গোয়ার কথায় । ত্রিপুরাতে তৃণমূল কংগ্রেসের সম্ভাবনা খানিকটা হলেও আছে , গোয়াতে ? এখানে কিন্ত কিছুই নেই । আসলে আসন্ন গোয়া বিধানসভা নির্বাচনে ওই রাজ্যের আঞ্চলিক দল এবং কংগ্রেস দল যেভাবে কাছাকাছি এসেছে তাতে বিজেপির জয় অনেকটাই কঠিন হয়ে গেছে । আর তৃণমূল কংগ্রেস গোয়া বিধানসভা নির্বাচনে প্রার্থী দিলে প্রতিটি বিধানসভা ক্ষেত্রে যদি দুই থেকে চার হাজার ভোট পায় তাতেই সমীকরণ বদলে যেতে পারে । এই রাজ্যে বিধানসভার আসনগুলিতে কম ভোটের ব্যবধানে জয় পরাজয় নির্ধারণ হয় , ভোটার সংখ্যা গড়ে ২৫ হাজার । ফলে তৃণমূল কংগ্রেস এখানে এককভাবে লড়াই করলে আখেরে লাভ হবে বিজেপির । কারণ চর্তুমুখী লড়াইয়ে যে প্রার্থী ছয় হাজার ভোট পাবে তারই জিত হয়ে যেতে পারে ।

একথা অস্বীকার করা যাবে না, বহুদলীয় গণতন্ত্রে যেকোনো দল নির্বাচনে অংশ নিতে পারে । এতে আপত্তির কিছু নেই । তৃণমূল কংগ্রেসও বিভিন্ন রাজ্যে নির্বাচনে অংশ নিলে আপত্তির কিছু থাকে না । কিন্ত বিজেপির বিরোধিতা করব অথচ বিজেপির সুবিধা করে দেওয়ার জন্য যে রাজ্যে সংগঠন নেই সেই রাজ্যে গিয়ে নির্বাচনে লড়াই করবো এতে শাসক দল বিজেপির সুবিধা হবে ।

২০২৪ এর লোকসভা নির্বাচনে যদি কেন্দ্রে বিকল্প সরকার গঠন করার জন্য প্রস্ততি নিতে হয় তাহলে বিজেপি বিরোধি সব রাজনৈতিক দলকে এক মঞ্চে আসতে হবে । আর সেক্ষেত্রে কংগ্রেসকে অবশ্যই সঙ্গে নিতে হবে । কংগ্রেসকে বাদ দিয়ে বিজেপি বিরোধী বিকল্প যাঁরা গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছেন তাঁরা গোপনে বিজেপির সুবিধা করে দিচ্ছেন । একথা খুব জোর দিয়ে বলেছে, এক সময়ের বিজেপির জোট সঙ্গী শিবসেনা । তারা বলছে, বিজেপি বিরোধী জোটকে বিশ্বাসযোগ্য করতে হলে কংগ্রেসকে সঙ্গে নিতে হবে । শিবসেনার এই অবস্থানের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃতীয় ফ্রন্ট গড়ার স্বপ্ন অনেকটাই ধুলিসাৎ হয়ে গেল ।

কারণ উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি দল যদিও হেরেও যায় তাহলেও অখিলেশকে সরকার গঠন করতে হলে কংগ্রেসের সমর্থন দরকার হবে । কারণ প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বিগত ৫ বছর ধরে যে পরিশ্রম করেছেন উত্তরপ্রদেশে তার প্রতিদান তিনি পাবেন । ফলে একটা সময় তৃণমূল নেত্রী অনেকটাই একা হয়ে যাবেন বলে আমাদের মনে হয় ।

কারণ বঙ্গ রাজনীতিতে প্রচার শুরু হয়ে গেছে মোদী-দিদি গটআপ । এতদিন এই শ্লোগান বামেরা দিত, কংগ্রেস দিত । এখন আম জনতা দিচ্ছে । ফলে দিল্লি দখলের স্বপ্ন দেখতে গিয়ে বাংলায় সমর্থন হারাতে পারেন মমতা ।  কারণ মনে রাখতে হবে এই বাংলায় আরএসএস বা বিজেপি তার কাজ বন্ধ করে দেয়নি । তৃণমূল থেকে যাওয়া কতকগুলো ধান্দাবাজ নেতা শাসক দলেও ফিরে এলেও তাতে তৃণমূলের ভোট বাড়বে না । বরং কমিটেড ভোট কমার সম্ভাবনা রয়েছে ।

আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যত কংগ্রেসের বিরুদ্ধে সুর চড়া করবেন ততই তাঁর বিজেপি বিরোধিতা নিয়ে জনমানষে প্রশ্ন উঠবে । আর এই প্রশ্ন যত দীর্ঘায়িত হবে ততই মমতার কমিটেড ভোটে ফাটল ধরবে । সংখ্যালঘু ভোটের ৫ থেকে সাত শতাংশ ছাড়া হলেই এই রাজ্যে বিজেপি আবার দাপট দেখাতে শুরু করবে । আর যদি সংখ্যালঘু ভোটের ভাল অংশ কংগ্রেস কিংবা বামেরা পেয়ে যায় তাহলে আগামী  দিনে এই রাজ্যে তৃণমূল যে সংকটে পড়বে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই । তাই সাধু সাবধান!


শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সম্পর্কিত নিবন্ধ