কলকাতা 

রাজ্যের প্রায় এক তৃতীয়াংশ মানুষকে  আর কতদিনই বা ‘তোষণ‘, ‘দাঙ্গা না হওয়া‘র তত্ত্বে তমসাচ্ছন্ন করে রাখা হবে ? : ড. আবদুস সাত্তার

শেয়ার করুন
  • 156
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আমাদের দেশ ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভের পর ৭২ টি বছর পার করেছে। আজও দেশের সাধারণ মানুষ সেই অর্থে স্বাধীনতা পেয়েছে কী ? ৭২ বছর পর হিসাব মেলাতে গিয়ে প্রাপ্তির চেয়ে অপ্রাপ্তির সংখ্যাটাই বেশি করে চোখে পড়ছে। ৭২ বছর পরও এদেশের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সামনের সারিতে আনার প্রতিশ্রুতি এখনও দেওয়া হয় । দলিত-সংখ্যালঘুরা এতদিন ধরে যে অর্জিত স্বাধীনতার সম্পদ ভোগ করে আসছিল তা আগামী দিনে থাকবে কিনা তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। দেশজুড়ে সংখ্যাগরিষ্ঠের জাতীয়তাবাদ এমন জায়গায় পৌছে গেছে যে আজ দেশের সব রাজনৈতিক দলই মন্দিরমুখী হয়ে পড়েছে । স্বাধীনতার ৭২ বছর পর এদেশের দলিত-সংখ্যালঘুদের নানা বিষয় নিয়ে বাংলার জনরব নিউজ পোর্টালের মুখোমুখি নব বালিগঞ্জ মহাবিদ্যালয়ের সিনিয়র অধ্যাপক এবং রাজ্যের সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও মাদ্রাসা শিক্ষা দপ্তরের প্রাক্তন মন্ত্রী ড. আবদুস সাত্তার । স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে প্রথম সাক্ষাৎকারটি  প্রকাশ করা হয়েছে ১৫ আগষ্ট । আজ চতুর্থ কিস্তি প্রকাশ করা হচ্ছে । এরপর থেকে প্রতিবার শনিবার রাতে ধারাবাহিকভাবে বিস্তারিত সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করা হবে।

প্রশ্ন : কংগ্রেস ( আই )-এর পক্ষ থেকেও কি বিষয়টিতে আরো বেশি করে ভাবনা-চিন্তার প্রয়োজন ছিল না ?

ড. আবদুস সাত্তার : ঠিকই বলেছেন । অস্বীকার করার উপায় নেই, কংগ্রেস ( আই )-এর পক্ষ থেকেও বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে ভাবনা-চিন্তা করার আবশ্যিকতা ছিল । কেননা , সারা দেশে ৯০টি জেলায় ২০ শতাংশের বেশি সংখ্যালঘু মুসলিম মানুষের বাস । সাচার প্রতিবেদনের সুপারিশের নিরিখকে মেনে নিয়ে তৎকালীন কংগ্রেস ( আই )-এর নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকার এই জেলাগুলিকে সংখ্যালঘু অধ্যূষিত জেলা হিসাবে চিহ্নিত করে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মাধ্যমে  এমএসডিপি সহ  অন্যান্য কার্যক্রমের সূচনা করেছিল। পূর্ব মেদিনীপুর ও পশ্চিম বর্ধমানকে যুক্ত করলে আমাদের রাজ্যে ১৪ টি জেলা রয়েছে । আবার দেশের ৯০ টি জেলার মধ্যে মুর্শিদাবাদ জেলায় সব থেকে বেশি সংখ্যালঘু মুসলিমের বাস । প্রায় ৭০ শতাংশের কাছাকাছি । অথচ জেলায় তিনটি লোকসভা কেন্দ্র, একটিও সংরক্ষিত নয়। কংগ্রেস ( আই )-এর পক্ষ থেকে যে ০২ জন এই জেলা থেকে নির্বাচিত হয়েছেন, সেই দুই জনই উচ্চবর্ণের মানুষ । লক্ষনীয় বিষয় হলো, গঙ্গার ভাঙন , দারিদ্র্য পীড়িত , বিড়ি শ্রমিক, পরিযায়ী শ্রমিক , শিল্প , উন্নয়ন নিগমহীন সব দিক দিয়ে পিছিয়ে পড়া এই জেলার সংখ্যালঘু মানুষের প্রতিনিধিত্ব কমে গেল । সেটা অবশ্য রাজ্যসভার মাধ্যমে চাইলে পূরণ করা যেতে পারতো । কিন্ত তা হলো না। হয়তো এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কংগ্রেস ( আই )-এর নেতৃবৃন্দ ভাবেননি অথবা বলা যেতে পারে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ভীষণ অভাব । কথাগুলি বলছি এই কারণে যে, পশ্চিমবঙ্গের মতো প্রগতিশীল রাজ্যের রাজনৈতিক দলগুলির কাছে এই অংশের মানুষের প্রত্যাশা বহুগুণ বেশি ।

দুঃখের বিষয় হলো, এর সম্পূর্ণ বিপরীত তথ্যই আমাদের সামনে বড়ো হয়ে ওঠে । অথচ আজকের ভারতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটে বিষয়টির গুরুত্ব অপরিসীম । কেননা, স্বাধীনতার পর এই প্রথম লোকসভায় সংখ্যালঘু মুসলিম প্রতিনিধিত্ব কমে গিয়ে  প্রায় ৪.২৩ শতাংশে এসে পৌঁছেছে। যেখানে দেশে মুসলিম জনসংখ্যা ১৪.০৯ শতাংশ অর্থাৎ ১৮ কোটি , বিশ্ব মানচিত্রে ইন্দোনেশিয়ার পরেই সব থেকে বেশি মুসলিমের বাস । অন্যদিকে ভারতের সব থেকে জনবহুল রাজ্য হল উত্তরপ্রদেশ , যেখানে লোকসভার আসন সংখ্যা ৮০ অথচ প্রায় ২০ শতাংশ মুসলিমের বাস হলেও একজনও মুসলিম সাংসদও ছিল না । কিছু দিন হল উপনির্বাচনে একজন জয়ী হয়েছেন। এ এক ভয়ঙ্কর প্রবণতা ! স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, পৃথিবীর সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংখ্যালঘু মুসলিমদের ‘সংসদীয় প্রতিনিধিত্বের ঘাটতি‘র বিষয়টি তাহলে কীভাবে পূরণ হবে ? এই ঘাটতি কি ‘উন্নয়ন ঘাটতি‘কে ত্বরান্বিত করবে না ? সংখ্যালঘুদের উন্নয়ন , দেশব্যাপী তাদের প্রতি নিপীড়ন-অত্যাচার-নিধন কিংবা সম-সুযোগ, সমান অধিকার-এর কথা উচ্চারণ করার মত জনপ্রতিনিধির সংখ্যা তো দিন দিন কমে যাচ্ছে ।

প্রশ্ন : পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক নেতাদের মুখে একথা প্রায়ই শুনতে হয় যে, সংখ্যালঘুদের কথা কি শুধু সংখ্যালঘুরা বলবে ? এখানে সংখ্যালঘু- সংখ্যাগুরু বিভাজন করা হচ্ছে কেন ? আবার এও সত্য যে, এই তো বামফ্রন্ট  ও তৃণমূল সরকারের সংখ্যালঘু বিষয়ক ও মাদ্রাসা শিক্ষা দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী হলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী । এমন কী বর্তমানে অনগ্রসর শ্রেনি-কল্যাণ ও আদিবাসী উন্নয়ন দপ্তরের মন্ত্রী তো উচ্চবর্ণেরা । শুধু তাই নয়, আদিবাসী উন্নয়ন কমিটির চেয়ারম্যানও হলেন উচ্চবর্ণের । তাতে অসুবিধে কোথায় ?

ড. আবদুস সাত্তার : উত্তরে বলতে হয় তাহলে তো সংসদীয় গণতন্ত্রের অংশগ্রহণমূলক প্রতিনিধিত্বের সাধারন ধারণাকেই নস্যাৎ করে দেওয়া হয়। এটা সকলেই জানেন যে , আরএসএস পরিচালিত বিজেপি-র নেতৃত্বাধীন মোদী সরকারের কাছ থেকে মুসলিমদের প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি তো আশা করা যায় না। তারা তো ঘোষিতভাবেই এর বিরোধী । তাদের রাজনীতিতে মুসলিমদের সম্পর্কে বিদ্বেষ- ঘৃনা তো বহুল প্রচারিত বিষয় । কিন্ত দেশের ধর্মনিরপেক্ষ , প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলির অবস্থান কি হবে ? বিশেষত পশ্চিমবঙ্গে ? আশাকরি, রাজ্যের মূলস্রোতের রাজনৈতিক দলগুলি লোকসভা-রাজ্যসভা-মন্ত্রীসভায় সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি  সমানাধিকারের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সমানুপাতিকভাবে সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করবেন । না-হলে বিজেপি শাসিত ভারতে অন্যান্য রাজ্যের সঙ্গে অদূর ভবিষ্যতে এই রাজ্যের কোনো পার্থক্য থাকবে না। এখন প্রশ্ন হল , পশ্চিমবঙ্গও কি সেই পথের পথিক হবে ? এ প্রশ্নও তো এখন সর্বস্তরে উঠছে -রাজ্যের প্রায় এক তৃতীয়াংশ মানুষকে  আর কতদিনই বা ‘তোষণ‘, ‘দাঙ্গা না হওয়া‘র তত্ত্বে তমসাচ্ছন্ন করে রাখা হবে ?


শেয়ার করুন
  • 156
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সম্পর্কিত নিবন্ধ

Leave a Comment