প্রচ্ছদ 

রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে দলিত ও সংখ্যালঘু মুসলিমদের ক্ষেত্রে পুতুল নাচের খেলা আজো অভিনীত হয়েই চলেছে : ড. আবদুস সাত্তার

শেয়ার করুন
  • 295
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আমাদের দেশ ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভের পর ৭২ টি বছর পার করেছে। আজও দেশের সাধারণ মানুষ সেই অর্থে স্বাধীনতা পেয়েছে কী ? ৭২ বছর পর হিসাব মেলাতে গিয়ে প্রাপ্তির চেয়ে অপ্রাপ্তির সংখ্যাটাই বেশি করে চোখে পড়ছে। ৭২ বছর পরও এদেশের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সামনের সারিতে আনার প্রতিশ্রুতি এখনও দেওয়া হয় । দলিত-সংখ্যালঘুরা এতদিন ধরে যে অর্জিত স্বাধীনতার সম্পদ ভোগ করে আসছিল তা আগামী দিনে থাকবে কিনা তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। দেশজুড়ে সংখ্যাগরিষ্ঠের জাতীয়তাবাদ এমন জায়গায় পৌছে গেছে যে আজ দেশের সব রাজনৈতিক দলই মন্দিরমুখী হয়ে পড়েছে । স্বাধীনতার ৭২ বছর পর এদেশের দলিত-সংখ্যালঘুদের নানা বিষয় নিয়ে বাংলার জনরব নিউজ পোর্টালের মুখোমুখি নব বালিগঞ্জ মহাবিদ্যালয়ের সিনিয়র অধ্যাপক এবং রাজ্যের সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও মাদ্রাসা শিক্ষা দপ্তরের প্রাক্তন মন্ত্রী ড. আবদুস সাত্তার । স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে প্রথম সাক্ষাৎকারটি  প্রকাশ করা হয়েছে ১৫ আগষ্ট । আজ তৃতীয়  কিস্তি প্রকাশ করা হচ্ছে । এরপর থেকে প্রতিবার শনিবার রাতে ধারাবাহিকভাবে বিস্তারিত সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করা হবে।

প্রশ্ন : তপশিলী জাতি ও তপশিলী উপজাতিদের প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি তো কিছু বললেন না ?

ড. আবদুস সাত্তার : রাজ্য থেকে রাজ্যসভায় নির্বাচিত ১৬ জনের মধ্যে সম্ভবত এবারে একজনের ঠাঁই হয়েছে। সংরক্ষণ না থাকলে এই মানুষগুলির কি অবস্থা যে হতো ! ভাবুন একবার । তপশিলী উপজাতির কেউ কি আছে ?

প্রশ্ন : তাহলে কি স্বাধীনোত্তর কাল থেকে আজ পর্যন্ত উচ্চবর্ণের আধিপত্যই জয়ী হয়ে চলেছে ?

ড. আবদুস সাত্তার : অবশ্যই । এ বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই বললেই চলে । এই ১৬ জনের মধ্যে সম্ভবত ১২ জনই হলেন উচ্চবর্ণের মানুষ। শতাংশের হিসাব করলেই এর সত্যাসত্য বিচার করতে পারবেন । অবশ্য একটা কথা ভীষণভাবে ব্যবহৃত হয় “আমরা সেকুলার “, কেউ কেউ বলেন “হিন্দু সেকুলার “।

প্রশ্ন : পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বামফ্রন্টের বিধায়ক সংখ্যা ৩১ । বামফ্রন্ট মনোনীত প্রার্থী রাজ্যসভায় জিততে পারতেন না । এটা তো সাধারণ অঙ্ক । তবু কি তারা একজন মুসলিম বা দলিত সম্প্রদায়ের মানুষকে প্রার্থী করে সেই অংশের কাছে বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে সঠিক রাজনৈতিক বার্তা দিতে পারতেন না ?

ড. আবদুস সাত্তার :  আপনার কথা শুনে আমারও মনে হয় সংখ্যালঘু মুসলিম, তপশিলী জাতি , তপশিলী উপজাতি ও অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেনি (O.B.C) মিলিয়ে প্রায় রাজ্যের ৮২ শতাংশ মানুষের কাছে সঠিক রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার একটা মোক্ষম সুযোগ ছিল । হয়তো বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিচারে এটা সময়ের দাবিও ছিল। কথাগুলি বলছি এই কারণে যে-

এক. যুগ যুগ ধরে ও শোষিত, বঞ্চিত, নিপীড়িত, পিছিয়ে পড়া মানুষেরাই হলেন বামপন্থীদের স্বাভাবিক শ্রেনিমিত্র।

দুই. আবার এই অংশের মানুষ ২০০৯ সালের পর বামপন্থীদের কাছ থেকে দূরে সরে গেছেন। তারই ফলশ্রুতিতে ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বামপন্থীদের পরাজয় হয়েছে । সংখ্যালঘু মুসলিম ও সংরক্ষিত এলাকার বিধানসভাগুলির বিধায়ক নির্বাচনে এর সুস্পষ্ট ছাপ পড়েছে। ২০০৬-র সঙ্গে ২০১১-র ফলাফলের তুলনা করলেই বুঝতে পারবেন।

তিন . শুধু তাই নয়, সারা দেশজুড়ে ‘রাজনৈতিক হিন্দুত্ববাদীদের ‘ তান্ডব নৃত্যে এই দুই অংশের মানুষ আজ অসহায় শিকার । ফলত, এই দুই অংশের মানুষের কাছে যাওয়ার , কাছে টানার একটা বড়ো সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে , একথা হয়তো বলাই যায়। অবশ্য এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমরা যেভাবে ভাবছি বামপন্থী নেতৃবৃন্দ হয়তো সেইভাবে বিষয়টি দেখছেন না কিংবা বলা ভালো দেখতে অভ্যস্ত নন । রাজ্যসভায় প্রার্থী চয়নের ক্ষেত্রে সেই দৃষ্টিভঙ্গি মানসিকতারই প্রতিফলন ঘটেছে।

অবশ্য, পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থী রাজনীতি সম্পর্কে জানা, বোঝা চিন্তাশীল মানুষদের সামগ্রিক মূল্যায়ন হলো বামপন্থী পার্টিগুলিতে মুখ্যত একটি বিশেষ অংশের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেনির নেতৃত্বেরই  প্রাধান্য আজো বজায় রয়েছে । তাই আমাদের মনে রাখতে হবে, মধ্যবিত্ত শ্রেনির স্বার্থত্যাগ এবং অবশ্যই সেই শ্রেনির দৃষ্টিভঙ্গির বিসর্জন- নিঃসন্দেহে দুটোই খুব সহজ কাজ নয় । আবার দৃষ্টিভঙ্গির বিসর্জন স্বার্থ বিসর্জনের থেকেও অনেক কঠিন বিষয়। তার মূল কারণ হলো,দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়টি মানবমন, হৃদয়তন্ত্রীর গভীরে বাসা বেঁধে থাকে।

প্রশ্ন : সেই ভাবনারই কি সংগঠিত রূপ বামফ্রন্টের পরিষদীয় দলনেতা নির্বাচনে লক্ষনীয়ভাবে ফুটে ওঠে ?

ড. আবদুস সাত্তার : তথ্য ও ঘটনাক্রম সেইদিকেই সাক্ষ্য দেয় । তথ্য অন্ততঃ এই কথাই বলে যে, সাত-আটবার টানা নির্বাচিত বিধায়ক থাকা সত্ত্বে প্রথমবার নির্বাচিত বিধায়ককে বামফ্রন্টের পরিষদীয় দলের নেতৃত্বে বরন করা হয়েছে । হয়তো এই যুক্তিতে যে পার্টির উচ্চপদে তিনি রয়েছেন। ফলত, ধরে নেওয়া হয় যে, চিন্তা-চেতনার ক্ষেত্রে, দক্ষতার মাপকাঠিতে তিনি অন্যান্যদের তুলনায় অগ্রসর ।

প্রশ্ন : সারা দেশে সংখ্যালঘু ও দলিত সম্প্রদায়ের মানুষদের প্রতি অত্যাচার/ নিপীড়নের ঘটনা ক্রমশঃ বেড়েই চলেছে । সেই সময় কম প্রতিনিধিত্ব অথবা প্রতিনিধিত্বহীনতার বিষয়টি কি পীড়া দেয় না ?

ড. আবদুস সাত্তার : তাহলে তো বলতে হয় , এর ঠিক উল্টোটা হওয়ার কথা অর্থাৎ তপশিলী জাতি / তপশিলী উপজাতি , অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি ও মুসলিম-এর সমন্বয়ে অন্ততঃ ১২ জন প্রতিনিধি রাজ্যসভায় উপস্থিত থাকার কথা ছিল । পূর্বেই বলেছি, এক্ষেত্রে রাজনৈতিক দল হিসাবে তৃণমূল কংগ্রেস-এর দায় এবং দায়িত্ব বহুগুণ বেশি । কেননা, বিধানসভায় তারা নিরঙ্কূশ সংখ্যাগরিষ্ঠের অধিকারী। তাদের ১৩ জনের মধ্যে সম্ভবত মাত্র ৩ জন ! ভাবলে শিউরে উঠতে হয়। ২০১৬তে দেখা গেল , তৃণমূল কংগ্রেস-এর ০৫ জন ও কংগ্রেস (আই) ০১ জন অর্থাৎ সব মিলিয়ে ০৬ জনের মধ্যে একজনও দলিত ও মুসলিম নেই। এখন প্রশ্ন, এই অংশের মধ্যে থেকে যোগ্যতাসম্পন্ন কোনো প্রার্থী কি খুঁজে পাওয়া গেল না ? অথচ কে না জানে, রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেসকে ক্ষমতায় নিয়ে আসার ক্ষেত্রে দলিত ও সংখ্যালঘু মুসলিমদের অবদান উল্লেখ্যযোগ্য ভাবে বেশি ।

আমাদের দেশের বর্তমানে যা রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাতে করে আক্ষরিক অর্থে , রাজ্যসভায় প্রার্থী মনোনয়নের বিষয়টিতে আরো বেশি ফলপ্রসুভাবে গণতান্ত্রিক, বহুত্ববাদী, সমান সুযোগের ভাবনাকে প্রসারিত করার দৃষ্টান্তযোগ্য সুযোগ ছিল। কিন্ত দুঃখের বিষয় হলো ‘নিয়ত ও নীতি ‘ সর্বোপরি তথ্য সম্পূর্ণ বিপরীত সাক্ষ্যই বহন করে চলেছে । এমন- কী সংসদীয় প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে লোকসভার থেকেও করুণ দশা ! লোকসভাতে যে খুব ভালো অবস্থা আছে তা তো নয় । সেখানেও ৪২ জনের মধ্যে সংখ্যালঘু মুসলিম মাত্র ০৭ জন । ২৯ শতাংশ জনগোষ্ঠীর শতাংশের হার কত হয় , তার হিসেব করে নিন।

তপশিলী জাতি ও তপশিলী উপজাতিদের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকলে এই অংশের মানুষের সংসদীয় প্রতিনিধিত্বের বিষয়টিও আরও করুণ হত। আবার অপর দিকে মুসলিম জনগোষ্ঠীর আরো বেশি পরিমাণে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের দাবির চাপের কাছে কৌশলী পন্থা অবলম্বন করে দক্ষিন-বাম নির্বিশেষে রাজ্যের সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলি প্রার্থী নির্বাচন করে থাকে । এটা ঠিকই যে, বামপন্থীদের কাছে রাজ্যের সংখ্যালঘু মানুষের বেশি প্রত্যাশা ছিল। অথচ বিগত সাত বছরে বামপন্থী দলগুলি একজন মুসলিমকেও রাজ্যসভায় মনোনীত করে পাঠালেন না। ২০১১-এরপর তারা মনোনীত করতে পারতেন তখন করেননি , এখন তো সেই অবস্থাও নেই ।

সেই সময় একজন বিধায়ক কথাগুলি বলেছিলেন বটে কিন্ত কেউ কর্ণপাত করেননি। অবশ্য এই প্রবণতা শুধু বামপন্থী দলগুলির মধ্যে আছে তা নয় , রাজ্যের সমস্ত মূলস্রোতের রাজনৈতিক দলগুলি এই দৃষ্টিভঙ্গি ,মানসিকতায় আচ্ছন্ন । উল্লেখিত তথ্যগুলিতে সেই বাস্তব অবস্থারই প্রতিফলন ঘটেছে । রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে দলিত ও সংখ্যালঘু মুসলিমদের ক্ষেত্রে পুতুল নাচের এই ইতিবৃত্ত আজো অভিনীত হয়েই চলেছে । সব বিষয়ে পরিবর্তন হলেও এই একটি বিষয়ে সবাই অপরিবর্তনীয় । ড. বি. আর আম্বেদকরের সর্তক বাণী আজও উপেক্ষিত।

 


শেয়ার করুন
  • 295
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সম্পর্কিত নিবন্ধ

Leave a Comment