কলকাতা 

স্বাধীনতার ৭২ বছরেও কেউ কথা রাখেনি/২ : ড. আবদুস সাত্তার ; রাজ্যসভায় সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্বে ঘাটতি ?

শেয়ার করুন
  • 220
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আমাদের দেশ ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভের পর ৭২ টি বছর পার করেছে। আজও দেশের সাধারণ মানুষ সেই অর্থে স্বাধীনতা পেয়েছে কী ? ৭২ বছর পর হিসাব মেলাতে গিয়ে প্রাপ্তির চেয়ে অপ্রাপ্তির সংখ্যাটাই বেশি করে চোখে পড়ছে। ৭২ বছর পরও এদেশের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সামনের সারিতে আনার প্রতিশ্রুতি এখনও দেওয়া হয় । দলিত-সংখ্যালঘুরা এতদিন ধরে যে অর্জিত স্বাধীনতার সম্পদ ভোগ করে আসছিল তা আগামী দিনে থাকবে কিনা তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। দেশজুড়ে সংখ্যাগরিষ্ঠের জাতীয়তাবাদ এমন জায়গায় পৌছে গেছে যে আজ দেশের সব রাজনৈতিক দলই মন্দিরমুখী হয়ে পড়েছে । স্বাধীনতার ৭২ বছর পর এদেশের দলিত-সংখ্যালঘুদের নানা বিষয় নিয়ে বাংলার জনরব নিউজ পোর্টালের মুখোমুখি নব বালিগঞ্জ মহাবিদ্যালয়ের সিনিয়র অধ্যাপক এবং রাজ্যের সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও মাদ্রাসা শিক্ষা দপ্তরের প্রাক্তন মন্ত্রী ড. আবদুস সাত্তার । স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে প্রথম সাক্ষাৎকারটি  প্রকাশ করা হয়েছে ১৫ আগষ্ট । আজ দ্বিতীয় কিস্তি প্রকাশ করা হচ্ছে । এরপর থেকে প্রতিবার শনিবার রাতে ধারাবাহিকভাবে বিস্তারিত সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করা হবে।

প্রশ্ন : পশ্চিমবঙ্গে ২০১৬ সালের রাজ্যসভার নির্বাচনে ডান-বাম মিলিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাতজন প্রার্থী ছিলেন । তাঁদের মধ্যে একজনও সংখ্যালঘু মুসলিম-আদিবাসী সম্প্রদায়ের কোন প্রার্থী ছিলেন না । কি বলবেন ? রাজনৈতিক ,না সামাজিকভাবে বর্জন ?

ড. আবদুস সাত্তার : কোনো সন্দেহ নেই বর্জনই বটেই। স্বাধীনতার একাত্তর বছর অতিক্রম করেও আমাদের মতো তথাকথিত প্রগতিশীল রাজ্যেও মুসলিমদের সম্পর্কে দেশভাগজনিত ধোঁয়াশা ( Hang over) যেন আর কাটতে চাইছে না। এটা খুবই দুঃখের, যন্ত্রণারও । অপরদিকে তপশিলী জাতি ও তপশিলী উপজাতিভুক্ত সম্প্রদায়ের মানুষ এখনো মূলস্রোতের রাজনৈতিক দলগুলির কাছে বোধহয় ‘মানুষের উচ্চ মর্যাদা ‘-লাভে সক্ষম হয়নি। অথচ সংখ্যার বিচারে এই দুই সম্প্রদায়ের পিছিয়ে পড়া মানুষেরাই হচ্ছেন ভোটকেন্দ্রিক  সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনায় রাজ্যের মূল চালিকাশক্তি । কেননা, রাজ্যের অর্ধাংশের বেশি অর্থাৎ ৫৬ শতাংশ মানুষের বাস । আবার মন্ডল কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেনির মানুষের সংখ্যা যুক্ত করলে রাজ্যের মোট জনসংখ্যার ৮০ শতাংশেরও বেশি হয়ে যায়।

প্রশ্ন : এটা কি সচেতনভাবে সংখ্যালঘুদের কণ্ঠহীন করার প্রয়াস ? সারা দেশে আরএসএস-বিজেপি তো এই কাজটাই সচেতনভাবে নিষ্ঠাভরে করে চলেছে, তাই নয় কি ?

ড.আবদুস সাত্তার : রাজ্যসভায় প্রার্থী মনোনয়ন বিষয়টিতে ভারতের মতো দেশে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যে বিশ্বাসী ধর্মনিরেপেক্ষ যে-কোনো রাজনৈতিক দলের ‘নিয়ত ‘ এবং ‘নীতি‘, ব্যবহার ও আচরণকেও পরিচ্ছন্নভাবে মানুষের সামনে উদ্ভাসিত করে থাকে । কথাগুলি বলছি এই কারণে যে-

এক. রাজ্যসভা , যাকে আমরা সংসদের উচ্চকক্ষ বলে জানি সেখানে প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে কোনো ধরণের বাধ্যবাধকতা নেই। স্বভাবতই, সিদ্ধান্ত গ্রহনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলির ‘নিয়ত‘ ও ‘নীতি‘ই বড়ো হয়ে ওঠে ।

দুই. বহুত্ব, বৈচিত্র্য,গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষ ভারত রক্ষার দাবিদার রাজনৈতিক দলগুলির কাছে প্রার্থী মনোনয়নের বিষয়টি তাই এক ধরণের অগ্নি পরীক্ষাও বটে । স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে,সংসদীয় গণতন্ত্রে পিছিয়ে পড়া মানুষের প্রতিনিধিত্বের বিষয়টিকে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলি কোন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিবেচনা করছে ?

তিন. লোকসভা, বিধানসভা, পৌরসভা ও ত্রিস্তর পঞ্চায়েত নির্বাচনের  মতো রাজ্যসভার ক্ষেত্রে সংরক্ষণের কোনো ‘দায়‘ও এক্ষেত্রে বাধ্যতামূলকভাবে থাকে না।

চার. আবার, জনসংখ্যার সংখ্যাধিক্যের বিচারে প্রার্থী নির্বাচনের বিষয়টিও এখানে নেই । একুশ শতকীয় পৃথিবীতে,তথ্য-প্রযুক্তির যুগে তথ্যের আদান প্রদান অকল্পনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে । পশ্চাদপদ জনগোষ্ঠীর মানুষও শিক্ষা-দীক্ষা,চিন্তা-চেতনায় বহুলাংশে সমৃদ্ধ বহুক্ষেত্রে সমকক্ষের দাবিদার   হয়েছেন। আর এই কথাটি বিশেষ ভাবে প্রযোজ্য ঞ্জান-বিঞ্জান-প্রযুক্তির ক্ষেত্রে আলোড়ন সৃষ্টিকারী নবীন প্রজন্মের ক্ষেত্রে । তাদের ভাবনা-চিন্তায় শেকল ভাঙার গান।

পিতৃপুরুষের জীবন সংগ্রামের অভিঞ্জতায় তারা একথা বুঝেছে যে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনায় মানুষের বাঁচা-মরা, জীবন যাপনের প্রতিটি স্তরেই নির্বাচিত সরকারের নীতি, আদর্শ-জাত আচরণ-ব্যবহার ও কার্যকলাপের উপর নির্ভর করে । যেমন, আরএসএস-বিজেপি-র বিদ্বেষজাত ঘৃণার রাজনীতির শিকার রোহিত ভেমুলা, আখলাক, জুনেইদ, আফরাজুল কত নাম আর বলবো ! দেশের প্রধানমন্ত্রী ইজরায়েল সফরে মুম্বাই ঘটনার বীভৎসতার শিকার ইহুদি শিশুকে কোলে তুলে নিলেন। নিঃসন্দেহে এ এক মানবিক কাজ ! কিন্ত প্রশ্ন হলো , রোহিত , আখলাক, জুনেইদ , আফরাজুলদের পরিবারের কাউকে কি  এইভাবে  কাছে টেনেছিলেন ? এই যে , দেশজুড়ে চলা ভয়ঙ্কর বিভাজনের রাজনীতির বিষময় ফল প্রত্যক্ষ চাক্ষুষ করে চলেছে আজকের প্রজন্ম ।

শুধু চাক্ষুষই নয়, প্রতিবাদ-প্রতিরোধে আজ তারাই তো আশার আলো, পথ-প্রদর্শক। আরএসএস-বিজেপি-এর ‘রাজনৈতিক হিন্দুত্বের ‘ গবেষণাগারে কখনো সখনো তারা কাপুনি ধরিয়ে দিতে সমর্থ হয়েছে । এক্ষেত্রেও প্রধান অবলম্বন ও সহায় সংসদীয় ব্যবস্থাপনা । যেখানে আইন-কানুন তৈরি হয় । স্বভাবতই, জীবনের স্বার্থে, জীবিকার তাড়নায় নিজ জনগোষ্ঠীর মানুষকে সকলেই প্রতিনিধি হিসাবে দেখতে চান । যাতে তাদের ‘আওয়াজ ‘ বা কণ্ঠস্বর সংসদ/আইনসভায় উচ্চারিত হয়। তাই তো  স্বাধীন ভারতে শত শত রাজনৈতিক দল ।

এই বিষয়ে অন্ততঃ সারা দেশে এক ধরনের গণজাগরন ঘটে গেছে । ভারতীয় রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে নতুন নতুন নায়কের আর্বিভাব ঘটছে । তাই ভোট পাওয়ার আশায় এখন আর কোনো রাজনৈতিক দল ঝুঁকি নিতে চায় না। যদিও আমাদের রাজ্যে খুব বেশিদিন হয়নি , খুব সাম্প্রতিককালে অন্যান্য ক্ষেত্রে এই ভাবনার সামান্য পরিবর্তন হয়েছে । তুলনামূলক বিচারে আমরা অন্যান্য রাজ্য থেকে এখনও বহুগুণ পিছিয়ে আছি।

প্রশ্ন : পশ্চিমবঙ্গ থেকে রাজ্যসভায় নির্বাচিত প্রতিনিধিত্বের চিত্রটি যদি একটু পরিস্কার করে বলেন ?

ড. আবদুস সাত্তার : পশ্চিমবঙ্গ থেকে রাজ্যসভায় ১৬ জন সদস্য রয়েছেন। তার মধ্যে বহিস্কৃত একজন সহ তৃণমূল কংগ্রেসের ১৪ জন । কংগ্রেসের ২ জন। এই ১৬ জনের মধ্যে ২ জন হচ্ছেন সংখ্যালঘু মুসলিম । এই দুজনের মধ্যে একজন বাংলাভাষী ও অপরজন উর্দুভাষী । আবার, দুজনেই দুটি দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক । আর কে না জানে বাংলা “কলম“ ও উর্দু “আখবার-ঈ-মাশরিক“ রাজ্যের শাসক দলের রাজনীতিতে এক বড়ো ভূমিকা পালন করে থাকে । জনসংখ্যার তুলনায় রাজ্যসভায় মুসলিম প্রতিনিধিত্বের শতাংশের হার তাই সহজেয় অনুমান করা যায় । শাসক দলের সংখ্যা বেশি, তাই তাদের দায়িত্বও বেশি, একথা অস্বীকার করা যায় না। কিন্ত কার্যক্ষেত্রে শাসক দলের পরিসংখ্যান খুবই শোচনীয়। কি বলবেন ‘মুসলিম তোষণ ‘?

বামফ্রন্ট তথা সিপিআই(এম)-এর রাজ্য থেকে একজনও প্রতিনিধি ছিলেন বর্তমানে দল থেকে বহিস্কৃত। কংগ্রেসের ২ জনের মধ্যে একজনও মুসলিম ও দলিত নেই। অথচ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো , বামফ্রন্ট তথা সিপিআইএমের যে দুজন লোকসভায় জয়ী হয়েছেন , তারা দুজনেই মুসলিম এবং অবশ্যই মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা থেকে নির্বাচিত অপরদিকে কংগ্রেস (আই) তো মুখ্যত টিকে আছে ,মুসলিম অধ্যুষিত মুর্শিদাবাদ, মালদা, উত্তর দিনাজপুরের মতো জেলা ও রাজ্যের কিছু অঞ্চলে । এক্ষেত্রে তারাও শোচনীয় ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন । ( চলবে )।


শেয়ার করুন
  • 220
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সম্পর্কিত নিবন্ধ

Leave a Comment