অন্যান্য 

মুখে মার্কস মগজে মোদিঃ প্রসঙ্গ শমীক লাহিড়ির ফেসবুক পোস্ট(মুখে মার্কস মগজে মমতা)/ সুকুমার মিত্র

শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সুকুমার মিত্র : ‘পট্টভির পরাজয় আমার পরাজয়’(‘Pattabhi’s defeat is my defeat’’.)। ২৯ জানুয়ারি, ১৯৩৯ জাতীয় কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সভাপতির পদে পট্টভি সীতারামাইয়া নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নিকট ২০৩ ভোটের ব্যবধানে পরাস্ত হয়েছিলেন। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু পেয়েছিলেন ১৫৮০টি ভোট পট্টভি সীতারামাইয়া পেয়েছিলেন ১৩৭৭টি ভোট।

সিপিএমের হয়েছে এখন সেই দশা। মুখে মার্কস-এর কথা আওড়িয়ে আসলে পশ্চিমবঙ্গে ‘মোদিজির পরাজয়কে আমাদের পরাজয়’ বলেই তাঁরা মনে করছেন। করবেন নাই বা কেন? তা করার যথেষ্ট কারণও রয়েছে ১৯৮২ সালে বামফ্রন্টের ৫৪ শতাংশ ভোটের সিংহভাগ বিজেপিতে(৩৮শতাংশ) পাঠিয়ে বামফ্রন্টের ভোট ৫ শতাংশের সামান্য বেশি আর কংগ্রেস ও আব্বাস সিদ্দিকির আই.এস.এফকে নিয়ে বৃহত্তর সংযুক্ত মোর্চার ভোটের হার ১০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বামের ভোট রামে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে ২০১৪ সাল থেকে। তা নিয়ে দলের রাজ্য নেতৃত্বের কোনও হেলদোল নেই।

স্বাধীনতার পর বাম-কংগ্রেস শূণ্য বিধানসভা হলেও আব্বাস সিদ্দিকির দল একটি আসন পেয়ে খাতা খুলেছে, যা ভবিষ্যতই বলবে কতটা রাজ্য রাজনীতির ক্ষেত্রে সুখকর হল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে মোদির পাশের আসনে বসানোর জন্য শমীক লাহিড়ির মত নেতারা ‘বিজেমূল’ তত্ত্ব আওড়েছেন। ফলও ফলেছে। রাজ্যবাসী ‘ফ্যাসিস্ট বিজেপি’ না ‘তৃণমূল কংগ্রেস’ এই দুইয়ের মধ্যে প্রধান শত্রু চিনতে ভুল করেননি। তাঁরা ২১৩টি আসনে ৪৮ শতাংশের বেশি ভোট দিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসকে তৃতীয়বারের জন্য ক্ষ‌মতায় বসিয়েছেন। আর বামেদের অন্ধ, হঠকারি, সংকীর্ণ ও ফ্যাসিস্ট তোষণ লাইনের জন্য উচিত জবাব দিয়েছেন। কিন্তু তাতে শমীকবাবুর অভিমান আরও বেড়েছে এত ভোট পাঠিয়েও বিজেপিকে ক্ষ‌মতায় আনা গেল না…। এতো সবাই জানেন যে সিপিএমের তলায় তলায় জোর প্রচার ছিল ‘একুশে বিজেপি ছাব্বিশে সিপিএম’। যেমন বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের সময় সিপিএমের স্লোগান ছিল, ‘ইন্দিরা ইয়াহিয়া এক হ্যায়’। সিপিআই যখন কংগ্রেসের সঙ্গে আসন সমঝোতা করে ১৯৭২ ও ১৯৭৭- এ নির্বাচনে লড়েছিল তখন সিপিএমের স্লোগান ছিল, দিল্লি থেকে এল গাই সঙ্গে বাছুর সিপিআই। সবাই জানেন তখন কংগ্রেসের প্রতীক ছিল ‘গাই-বাছুর’। আবার ১৯৮০ সালে সিপিএম ‘কাটা হাত’ নাটক করে পাড়ায় পাড়ায় ভোট চেয়েছে সেই ‘কাটা হাত’ প্রগতির হাত হয়ে যখন যায় তখন আর ১৯৭২-৭৭ তাঁদের ১১০০ শহিদের কথা মনে থাকে না। মনে থাকে রতন টাটার সিঙ্গুরে ন্যানো কারখানা না হওয়ার কথা।

সিপিএম যদি কখনও পশ্চিমবঙ্গে ক্ষ‌মতায় আসে(যা অলীক ভাবনা বা পাগলের প্রলাপ) তবে ওদের মন্ত্রিসভা শপথ নেবে সিঙ্গুরের সেই জমিতেই। টাটা, সালিম গোষ্ঠীর (ইন্দোনেশিয়ায় কমিউনিস্ট নিধন যজ্ঞে সালিমদের ভূমিকার কথা সবাই জানেন, সিপিএম জানে না তা না, কিন্তু ওরা যখন যেমন তখন তেমন।) দালালি করা শমীকবাবুরা এখন কর্পোরেট পূঁজির মিডিয়াকে দোষারোপ করছেন। ভুলে গেছেন নাকি রাজ্যবাসী বুদ্ধবাবুর সেই উক্তি- পূঁজির কোনও রঙ হয় নাকি। শিল্পায়নের স্বার্থে যা করার তাই করব গোছের মন্তব্য। তিনি আরও বলেছিলেন, ‘টাটার কেশাগ্র স্পর্শ করতে দেব না কাউকে।’ এ কথা রাজ্যবাসী সহজে ভুলে গেছেন শমীকবাবু ভাবলেন কীভাবে?

সম্প্রতি এই কথাগুলি অমর্ত্য সেন, প্রভাত পট্টনায়ক, দীপংকর ভট্টাচার্য, প্রসেনজিৎ বসুদের মত অনেকেই প্রকাশ্যে বলছেন বা লিখছেন। অমর্ত্য সেন, প্রভাত পট্টনায়কের নাম উল্লেখ করার মত বুকের দম শমীক লাহিড়িদের নেই। কিন্তু দীপংকর ভট্টাচার্য ও প্রসেনজিৎ বসুদের দিকে তাক করে লিখেছেন ‘মুখে মার্কস মগজে মমতা’। আসলে তিনি এঁদের কাউকেই রেহাই দেননি। আসলে শমীক লাহিড়িদের ‘মুখে মার্কস আর মগজের গোটাটাই মোদি’ জুড়ে রয়েছে তা বামের ভোট রামে পাঠানোর প্রকৌশল দেখে রাজ্যবাসী চিনতে ভুল করেনি।

প্রসঙ্গত, শমীকবাবুদের রোগ হল ওনারা ধরে নেন দুনিয়ার সবকিছু ওঁরা জানেন, বাকিরা কিছুই খবর রাখেন না। খোদ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, ‘বিপুলা এই পৃথিবীর কতটুকু জানি?’ তা তিনি লিখুন শমীকবাবু বিপুলা এই পৃথিবীর সবই জানেন তা বিশ্বকবির জানার সুযোগ ঘটেনি। যেমন দেখার সুযোগ ঘটেনি শমীকবাবুর কথা বলার সময় উদ্ধত গ্রীবা ভঙ্গি। যা দেখলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তাঁর কাছে মাথা নত করে মার্কসবাদের পাঠ নিতেন।

সিপিএম নেতা শমীক লাহিড়ি তাঁর আজকের ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন,‘পেট্রোল-ডিজেলের ওপর কর বাড়তে বাড়তে এখন লাগামছাড়া। মোদিজি-র করনীতি যদি ৬০% দায়ী হয়, তাহলে দিদিমণিও ৪০% দায়ী।’ শমীকবাবুর এই বক্তব্যের সারবত্তা খুঁজতে গিয়ে জানা গেল, পশ্চিমবঙ্গ সরকার পেট্রল ও ডিজেলের উপর কর নিয়ে থাকে যথাক্রমে ২৫.২৫ শতাংশ ও ১৭.৫৪ শতাংশ। অপরদিকে কেরালায় শমীকবাবুদের বিপ্লবী সরকার পেট্রল ও ডিজেলের উপর কর নিয়ে থাকে যথাক্রমে ৩০.৩৭শতাংশ ও ২৩.৮১ শতাংশ। অর্থাৎ পেট্রোলে পশ্চিমবঙ্গ থেকে ৫ শতাংশ বেশি আর ডিজেলের ক্ষেত্রে ৬ শতাংশের বেশি কর নিয়ে থাকে কেরলের সিপিএম সরকার। কেরলে এই অতিরিক্ত বা পশ্চিমবঙ্গ থেকে বেশি পেট্রল, ডিজেলে কর কোন বিপ্লবী তহবিলে যাচ্ছে শমীকবাবু?

শমীকবাবুর আসলে মাথা ঠিক থাকার কথাও নয় কারণ ফরওয়ার্ড ব্লকের নরেন চট্টোপাধ্যায়রা সাফ জানিয়ে দিয়েছে আব্বাস সিদ্দিকির সঙ্গে জোট তাঁরা সমর্থন করেন না, করবেনও না। অধীরবাবু তো ব্রিগেডের সভাতেই সেই বার্তা দিয়েছিলেন। কারণ অধীরবাবু যখন বক্তব্য রাখছিলেন তখন আব্বাস সিদ্দিকি সাহেব মঞ্চে এলেন। মহম্মদ সেলিমের নেতৃত্বে গার্ড অফ অনার- সবাই উঠে দাঁড়ালেন যেন ‘হো’ বা ‘কাস্ত্রো’ মঞ্চে এসেছেন। আব্বাসের দল সম্পর্কে অন্যান্যরাও সমালোচনা করতে ছাড়েননি। তা হলে কি হবে? আমার এক বন্ধু সিপিএম কর্মী সে তো বলেই বসল, আমরা যদি দেশের ক্ষমতায় আসি আব্বাস সিদ্দিকিকে ‘অর্ডার অফ লেনিন’ দেব। সিপিএম কিন্তু এখন আর শ্রেণী শত্রু, জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব এসব আওড়ায় না। পার্টি ক্লাস তো শিঁকেয় উঠেছে। সমস্যা কে ক্লাস নেবে? শমীক, সুজন আর সেলিম এই তো শিক্ষকমণ্ডলী। বিমান বসু এখন বেশি বিতর্কে জড়াতে চান না। সূর্যকান্তবাবু দলের সম্পাদকের পদটা হারাতে চান না। যদিও ওরা মুখে বলতেন, সর্বহারার হারানোর কিছু নেই, জয় করার জন্য রয়েছে গোটা পৃথিবী। এখন পৃথিবীর জায়গায় দখল নিয়েছে ‘মোদির হৃদয়’। যা কিছুতেই শমীক, সুজন, সেলিমরা হারাতে চান না। এমন আত্মঘাতী রাজনৈতিক পথ নেওয়ার মাসুল দেশে দেশে কমিউনিস্টদের দিতে হয়েছে। সেই ইতিহাস থেকে এঁরা কোনও শিক্ষায় নেননি। কিন্তু সিপিএমের এই পরিস্থিতিতে বুকে ভরসা জুগিয়েছেন খোদ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তিনি বলেছেন, মমতার দশ বছরের থেকে সিপিএমের জমানা অনেক ভাল ছিল। তিনি বিজেপি নেতা ও কর্মীদের বলেছিলেন, সিপি্এমকে যেন আরও কাছে টানা হয়(আসলে বামের ভোট রামের দিকেই ইংগিত করেই বলেছিলেন)। অমিত শাহ-র শংসাপত্র পাওয়ার পর কারও মাথা ঠিক থাকে?

পরিশেষে বলি শমীকবাবু কার্ল মার্কস কিন্তু তাঁর দর্শনের পেটেন্ট আপনাদের দিয়ে যায়নি। ভুলে যাবেন না এই কথা। লাল শালু বহন করে যদি কমিউনিস্ট হওয়া যায় তাহলে ধোনাইকাররা সবচেয়ে বড় কমিউনিস্ট। ওই বেচারারা থান থান লালু শালু জীবনভর বহন করে থাকেন।

শমীকবাবু আপনার কথা ‘স্পনসর্ড বামপন্থা’ বলে একটা তত্ত্ব জানা গেল। কিন্তু রতন টাটা তো কবেই একই কর্পোরেট মিডিয়ায় পাতাজোড়া বিজ্ঞাপন দিয়ে আপনাদের বামপন্থাকে চিরকালের জন্য স্পনসরড করে গেছেন। পরিশেষে বলতেই হয় আপনাদের সেই আপ্তবাক্যের কথা, ‘বামপন্থার মৃত্যু নেই’। কিন্তু আপনি বা সুজনবাবু যেভাবে ধমকের সুরে কর্পোরেট মিডিয়ার সামনে খেকিয়ে কথা বলেন তাতে বামপন্থার অপমৃত্যু আপনাদের হাতেই হবে।বামপন্থা যদি আপনাদের হাতে থাকে তাহলে ‘প্রকৃত বা যথার্থ বামপন্থা’র অন্তর্জলি যাত্রা নিশ্চিত।


শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সম্পর্কিত নিবন্ধ