প্রচ্ছদ 

স্বাধীনতার ৭২ বছরেও কেউ কথা রাখেনি : ড. আবদুস সাত্তার

শেয়ার করুন
  • 497
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আমাদের দেশ ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভের পর ৭২ টি বছর পার করেছে। আজও দেশের সাধারণ মানুষ সেই অর্থে স্বাধীনতা পেয়েছে কী ? ৭২ বছর পর হিসাব মেলাতে গিয়ে প্রাপ্তির চেয়ে অপ্রাপ্তির সংখ্যাটাই বেশি করে চোখে পড়ছে। ৭২ বছর পরও এদেশের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সামনের সারিতে আনার প্রতিশ্রুতি এখনও দেওয়া হয় । দলিত-সংখ্যালঘুরা এতদিন ধরে যে অর্জিত স্বাধীনতার সম্পদ ভোগ করে আসছিল তা আগামী দিনে থাকবে কিনা তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। দেশজুড়ে সংখ্যাগরিষ্ঠের জাতীয়তাবাদ এমন জায়গায় পৌছে গেছে যে আজ দেশের সব রাজনৈতিক দলই মন্দিরমুখী হয়ে পড়েছে । স্বাধীনতার ৭২ বছর পর এদেশের দলিত-সংখ্যালঘুদের নানা বিষয় নিয়ে বাংলার জনরব নিউজ পোর্টালের মুখোমুখি নব বালিগঞ্জ মহাবিদ্যালয়ের সিনিয়র অধ্যাপক এবং রাজ্যের সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও মাদ্রাসা শিক্ষা দপ্তরের প্রাক্তন মন্ত্রী ড. আবদুস সাত্তার । স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে এই সাক্ষাৎকারটি আজ প্রকাশ করা হচ্ছে । এরপর থেকে ধারাবহিকভাবে বিস্তারিত সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করা হবে।

প্রশ্ন : সমগ্র পৃথিবী জুড়েই ধর্মীয় ও ভাষিক সংখ্যালঘুদের রাজনৈতিকভাবে কণ্ঠহীন করার এক হীন চক্রান্ত শুরু হয়েছে । এই বিষয়ে যদি কিছু বলেন ?

আবদুস সাত্তার : সমগ্র পৃথিবী জুড়ে আর্থ সামাজিকভাবে পশ্চাদপদ জনগোষ্ঠী অথবা ধর্ম,ভাষা ও সংখ্যার ভিত্তিতে স্বল্প হিসাবে চিহ্নিত সংখ্যালঘুদের স্ব স্ব দেশে জনসংখ্যার অনুপাতে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ঘাটতি যুগ যুগ ধরে আলোচনার বিষয় হয়ে থেকেছে কিন্ত কাঙ্খিত পরিবর্তন লাভ আজো সম্ভবপর হয়নি। তাই স্বভাবতই দেশে দেশে আজো এতো আলোচনা বির্তক,বিবাদ। ভারতও তার ব্যতিক্রম নয়। হয়তো জীবনের লক্ষ্যে,যাপনের পদচারণায়,সুষম সমাজের আকাঙ্ক্ষায় সেই সমস্ত মানুষেরা আজো সংগ্রামরত। সমসুযোগ, সমানাধিকারের ভাবনা সর্বোপরি সামাজিক ন্যায়বিচারের বিষয়টি এই একুশ শতকেও ’এক দূরতর দ্বীপ” বলে মনে হয়। রবীন্দ্র-কথনে কালোয় ঢেকে যাচ্ছে আলো । স্বাধীনতা -উত্তর যা কিছু অগ্রগতি,তারও আজ পশ্চাৎগমন শুরু হয়েছে। গণতন্ত্রের পীঠস্থানগুলিকে ( মুখ্যতঃ সংসদ ও বিধানসভা ) “সংখ্যালঘুদের কন্ঠহীন” করার সচেতন এক মরিয়া প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে। এক দেশ,এক ভাষা,এক নোট সর্বোপরি এক নেতার জয়গানে পুজি পোষিত সমগ্র বাজারী সংবাদমাধ্যমও মত্ত হয়ে উঠেছে । বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যর ভাবনা তাই আজ কাকস্য পরিবেদনমাত্র !

কে না জানে, স্বাধীনতার দিনগুলিতে অর্জিত সংখ্যালঘুদের জন্য অধিকারগুলি দেশভাগ জনিত দাঙাগার আগুনে পুড়ে ছারখার হয়ে যায়। ‘অবিশ্বাসীর তকমা‘ চিরকালের জন্য ছাপ মারা হয়ে যায়। তার প্রতিফলন ভারত ইতিহাসের পরতে পরতে বহ্নিশিখার মতো চিরজাগরুক হয়ে আছে। সেই বহ্নিশিখারই প্রজ্বলন আমরা আজও প্রত্যক্ষ করে চলেছি।

প্রশ্ন : ধর্মের ভিত্তিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতীয়তাবাদের ধারনার প্রসারে শাসক দল তো এখন

 মরিয়া, এ প্রসঙ্গে আপনি কি বলবেন ?

আবদুস সাত্তার : স্বাধীনোত্তর সময়কালে ষাটের দশকে বিশ্বস্ততার প্রমাণ চাওয়ার বিষয়টি রোজকার নিত্য ঘটনায় রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছিল। তারপর তো আমরা ঞ্জান বিঞ্জান প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বহু পথ অতিক্রম করেছি। কিন্ত যন্ত্রণার কথা হল, সহিষ্ণুতা, সহমত,ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষকে মানুষের মর্যাদা-দানে আজো অনেক দ্বিধা,অনেক কুণ্ঠা। বারে বারে সময়ের পথ প্রবাহে বিশ্বস্ততার প্রমাণের বিষয়টিকে আজো সচেতনভাবে দ্বারপ্রান্তে হাজির করে দেওয়া হচ্ছে। অবশ্য, সংখ্যালঘুদেরই শুধু নয়, ধর্মনিরপেক্ষ-গণতান্ত্রিক মানুষও আজ এই অসহিষ্ণু শক্তির হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেন না। নরেন্দ্র দাভোলকার, গোবিন্দ পানসারে, এম এম কালবুর্গি, রোহিত ভেমুলা, গৌরি  লঙ্কেশ সহ অসংখ্য নাম। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মধ্যে মুসলিম ও্ দলিতদের উপর অত্যাচার নিপীড়ন, নিধন আজ বাস্তব হয়ে উঠেছে। অথচ দক্ষিণপন্থী রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ সামাজিক সংস্কৃতিক সংগঠন হিসাবেই নিজেকে ঘোষণা করে থাকে। স্বাধীনতা সংগ্রামের কঠিন দ্বন্দ্ব মুখর দিনগুলি কিংবা প্রতিদিনকার রাজনীতি তাদের সীমানা রেখাঙ্কিত চৌহদ্দির বিষয় হওয়ার কথা নয়। কিন্ত তারা জানে যে রাজনৈতিক হিন্দুত্বের মতাদর্শে নির্মিত সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ হচ্ছে ধর্মবর্ণের ভিত্তিতে মানুষকে বিভক্ত করার এক সহজ আশ্রয়,বিশেষত সংখ্যাগরিষ্ঠ-এর ভিত্তিতে গড়ে ওঠা জাতীয়তাবাদ। এই ধরনের ভাবনায় লালিত পালিত তথা কথিত জাতীয়তাবাদীরা সব সময় ধর্মকে দেশপ্রেমের মতাদর্শের মোড়কে মানুষের সামনে হাজির করার এক অদম্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। পাকিস্থানে তারা সফল হয়েছে। সমগ্র বিশ্বের মানুষের কাছে এই বার্তা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে যে, পাকিস্থান শুধুমাত্র ইসলাম ধর্মালম্বীদের জন্য, এখানেও সেই ধরনের একটা মরিয়া প্রচেষ্টা জারি রয়েছে। ধর্মের নামে, জাতের নামে জাতীয়তাবাদের নির্মাণ যঞ্জ শুরু হয়েছে।

জাতীয়তাবাদী পরিচিতি নির্মাণের রাজনীতি বেশ কিছু বছর ধরে বিশ্ব-জুড়ে চলছে । আমোরিকা থেকে রাশিয়া , তুরস্ক থেকে জাপান,ফিলিপিনস,ভারত এবং আরো বহুদেশ । এটা খুবই সাধারন বিষয় যে, দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি সব সময়ই ধর্মভিত্তিক সংকীর্ণ জাতীয়তাবদ বা তার পরিচিতিকে রাজনীতির ক্ষেত্রে মোক্ষম অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করে থাকে । এর সব থেকে ভয়ঙ্কর , মারাত্মক, ক্ষতিকারক দিকটি হলো, জাতীয়তাবাদের বিষয়টিকে এক পক্ষীয় বোঝাপড়ার ভিত্তিতে পুঁজি পোষিত শক্তিশালী গণমাধ্যমের সাহায্যে দেশবাসীর সামনে হাজির করা হয়। গণতান্ত্রিক,ধর্মনিরপেক্ষ ভাবনার অন্য দিকটিকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষিত করে রাখা হয়।

এইখানেই বিশ্ব-কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রাসঙ্গিকতা আজো অর্থবহ। ভুল ,অসহিষ্ণু একপেশে ধারনার ভিত্তিতে নির্মিত যে জাতীয়তাবাদ তা রাষ্ট্রের সর্বাঙ্গীণ কল্যাণে কখনোই সহায়ক হতে পারে না। এই ভাবনার বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথের লেখনী বারবার সোচ্চার হয়েছে । ‘ন্যাশনালিজম ‘ গ্রন্থটি তার সবথেকে বড়ো প্রমাণ। বিশ শতকের বিশ্ব প্রেক্ষাপটে তাঁর মনে হয়েছিল আগ্রাসী জাতীয়তাবাদ সভ্যতাকে দৈত্য,দূর্বিপাক ও ধ্বংসের পথে ঠেলে দেয় । প্রসঙ্গত আমাদের মনে রাখতে হবে,বাল গঙ্গাধর তিলক রাষ্ট্রের ধর্মীয় পরিচিতি নির্মাণের বিরোধী ছিলেন। আবার বিপিনচন্দ্র পাল মনে করতেন,মুসলিম শাসকদের আমলেই সংস্কৃতির নির্মাণ এবং হিন্দু সংস্কৃতি সংহতি লাভ করে এবং তা অক্ষুন্ন ছিল । ( সূত্র : এস. ইরফান হাবিব : ইন্ডিয়ান ন্যাশনালিজম)।

প্রশ্ন : এই অবস্থায় জন্য তো মুসলিমরাই দায়ী ? মুসলিম নেতারাই তো ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ চেয়েছিলেন ?

আবদুস সাত্তার  : ইতিহাসের গতিপথের ধারায় এও আমাদের মনে রাখতে হবে যে, মুসলিম লিগ মূলত সামন্ততন্ত্র,পেশাজীবী, এমনকী আশরফ জনগোষ্ঠীর দ্বারা পরিচালিত ছিল । দারুল-উলুম, দেওবন্দ এর মৌলানা মাদানী কিংবা আবুল কালাম আজাদ মুসলিম লিগ-এর এই অংশের চিন্তা-চেতনার সঙ্গে কখনোই নিজেদেরকে সংযুক্ত করতে চাননি। জাতীয়তাবাদ সর্ম্পকে ভ্রান্ত ধারণা সৃষ্টিকারী আজকের জাতীয়তাবাদীদের এটা জনা দরকার যে , মুসলিমদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ সচেতনভাবে এই দেশেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। পাকিস্থান নিজেকে ইসলামী রাষ্ট্র হিসাবে ঘোষণা করে , জাতি ও ধর্মকেএক বৃত্তের বন্ধনীতে একাত্ম করে ভুল পথে নিজেদের চালিত করেছে । ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্থানের আপামর সাধারন মানুষের অস্তিত্বের পরিচয়বাহী ভাষা ও সংস্কৃতি , বলা যেতে পারে ধর্মের উপরে নিজেদের প্রাধান্য লাভে সমর্থ হলো । জন্ম হলো, স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বাংলাদেশ । ভাষার ভিত্তিতে নির্মিত স্বাধীন প্রজাতান্ত্রিক বাংলাদেশ যা বিশ্ব রাজনীতিতে তুলনারহিত।

প্রশ্ন : গুজরাট বিধানসভার সাম্প্রতিক নির্বাচন, আমাদের রাজ্যের রাজনৈতিক দলগুলির অবস্থান , বিশেষত সরকারী দলের বিভিন্ন কার্যক্রম দেখে তো মনে হচ্ছে আক্ষরিক অর্থে দেশে আর কোনো ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দল অবশিষ্ট নেই । কী মনে হয় ?

আবদুস সাত্তার  :  এখানেই আরএসএস-এর সাফল্য । ১৯২৫ সাল থেকে এই লক্ষেই আরএসএস তার যাবতীয় কর্মকান্ড পরিচালিত করে আসছে। ধর্মের ভিত্তিতে সংখ্যাগরিষ্ঠের  সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ তারা নির্মাণ করতে চাইছে। এই লক্ষ্যে তারা বৃহদংশ ক্ষেত্রে সফল । নির্বাচনে জয়লাভের ক্ষেত্রে তারা প্রায় সমস্ত রাজনৈতিক দলকে মন্দির মুখী করে দিয়েছে। ‘ রাজনৈতিক হিন্দুত্বের ‘ ভাবাবেগে সবারই এখন প্রায় ডুবু ডুবু অবস্থা ! সরকারী দলের পৃষ্ঠপোষকতায় পুরোহিত সম্মেলন থেকে ‘গীতা ‘ বিতরণের ক্ষেত্রে হরিয়ানায় বিজেপি-র নেতৃত্বাধীন শাসকদল থেকে পশ্চিমবঙ্গের শাসক দলের মধ্যে কোনো গুণগত পার্থক্য দেখা যাচ্ছে না। ধর্মনিরপেক্ষতার ধারনাটাই যেন দেশব্যাপী মানুষের মন থেকে ভুলিয়ে দেওয়ার এক অক্লান্ত প্রচেষ্টা চলছে। ‘হিন্দু পাকিস্থান ‘ তৈরির এক গভীর ষড়যন্ত্রে বুঝে না বুঝে সকলকে অংশীদার করার এক রাষ্ট্রীয় কর্মযঞ্জ শুরু হয়েছে।

প্রশ্ন : সংকীর্ণ,ঘৃণার বেশে হাজির হওয়া সংখ্যাগরিষ্ঠবাদ কি তাহলে এদেশের নিয়তি হয়ে দেখা দিচ্ছে ?

২০১৪ সালের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন এই সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে জোর কদমে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের হিন্দুত্ববাদী কার্যক্রম দেশব্যাপী শুরু হয়েছে। এখন তো সংবিধানের প্রতিটি স্তরেই তাদের ভাবনার প্রচার ও প্রসার চলছে। বৃহৎ পুঁজি পোষিত সংবাদমাধ্যম এই কাজে তাদের সহায়ক ভূমিকা পালন করে চলেছে। ফলত, সারা দেশ জুড়ে ধর্মের ভিত্তিতে সংখ্যাগরিষ্ঠবাদের চাষাবাদ চলছে। সরকারী পৃষ্ঠপোষকতাজনিত অনুকূল পরিবেশে এই শক্তির হুমকির কমপাঙ্কের অনুরণন এখন প্রতিটি ঘরে ঘরে বৈদ্যুতিন মাধ্যমের প্রচার জলসায়, পাড়ার জটলায় । রাজনীতির বিভাজন আর নয়, বিভাজনের রাজনীতি এখন শাসকের মূল হাতিয়ার । এই নির্মাণে নাকি দেশের যাবতীয় উৎকর্ষ বৃদ্ধি পাচ্ছে ! জিডিপি বৃদ্ধির বড়াই সেই লক্ষ্যেই সোচ্চার । ( চলবে )


শেয়ার করুন
  • 497
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সম্পর্কিত নিবন্ধ

Leave a Comment