অন্যান্য 

মুসলমানদের ঘরোয়া বিবাদের সমাধানে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের গঠনমূলক পরিষেবা(প্রথম কিস্তি)

শেয়ার করুন
  • 3
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মুসলমান সমাজে কথায় কথায় তালাক দিয়ে মুসলিম মহিলাদেরকে অনিশ্চিত জীবনের দিকে ঠেলে দেওয়া হয় বলে তথাকথিত মানবতাবাদীরা অভিযোগ করে থাকেন । কিন্ত মুসলিম সমাজের নারীই সবচেয়ে বেশি সুযোগ-সুবিধা পেয়ে  থাকে। ইসলাম ধর্ম নারীদেরকে পুরুষের তুলনায় অনেক বেশি গুরুত্ব ও সম্মান দিয়েছে। বিবাহের ক্ষেত্রে মেয়ের সম্মতি ছাড়া বিবাহ হবে না,এটা ইসলামের বিধান । এমনকি তালাকের ক্ষেত্রেও মেয়েদের সমান অধিকার দিয়েছে ইসলাম। ইসলামী আইনকে সামনে রেখে ঘরোয়া বিবাদ বা স্বামী-স্ত্রী মধ্যে সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সম্মানজনক সমাধান প্রায় তিন দশক ধরে করে আসছে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ। কীভাবে শরিয়ত মেনে বিবাদ ও কলহ মেটানো হয় তা নিয়ে এই প্রবন্ধ । জাতীর স্বার্থে সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য বাংলার জনরব জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের এই সামাজিক গঠনমূলক কাজ সম্বন্ধে লেখা প্রবন্ধটি প্রকাশ করল জনস্বার্থে ।

মাহাকামায়ে শরীয়াহ ( শরিয়ত সম্মত বিবাদ অবসান কক্ষ ) কি ও কেন?

মাহকামায়ে শরীয়াহ জমিয়াতে উলামা হিন্দের একটি উল্লেখযোগ্য বিভাগ । এই বিভাগের মাধ্যমে পুরুষত্বহীন , পাগল, নিরুদ্দেশ, খোরপোষ আদায় করতে অস্বীকারকারী স্বামীর বিরুদ্ধে বাদিনা পক্ষ থেকে দাখিলকৃত আবেদনের ভিত্তিতে শরীয়ত সম্মত ভাবে মীমাংসা করা হয়।মূলত এটি একটি ইসলামী বিবাদ অবসান কক্ষ বা শরীয় আদালত যা মুসলিম পার্সোনাল ল ‘এর  অধিকারের আওতায় পরিচালিত হয়ে থাকে। এই ব্যবস্থা ১৯৮৬সালে আমাদের এই রাজ্য প্রচলিত হয় । ১৯৮৯সালে হজরত মৌলানা মোহাম্মদ তাহির(রহঃ)সাহেবকে বাংলার প্রথম আমীর নির্বাচিত করে পশ্চিমবঙ্গ মাহাকামায়ে শরীয়াহ এর শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯৫সালে আমিরুল হিন্দ হজরত মওলানা সৈয়দ আসাদ মাদানী(রহঃ) এর অনুমোদনের পর মাহাকামায়ে শরিয়ার সভাপতি ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য জমিয়তের সভাপতি জনাব মাওলানা সিদ্দীকুল্লাহ চৌধুরী সাহেবের সভাপতিত্বে এই বিভাগটি পরিচালিত হয়ে আসছে। যে কোন পুরুষ বা মহিলা বৈবাহিক জীবনে অচলাবস্থা দূরীকরনের উদ্দেশ্য মুকাদ্দমা দাখিল করতে পারেন।এছাড়াও মীরাস বন্টন ও শরীয় মাসায়েলের সমাধান ও পরামর্শ নিতে পারেন। মাহকামায়ে শরীয়ার ৭সদস্য বিশিষ্ট একটি সুদক্ষ কমিটি আছে।দারুল উলুম দেওবন্দে ২০১৭সালে সর্বারতীয় পর্যায়ে তিনদিনের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হয়েছিল।সর্বভারতীয় স্তরে ইমারতে শরীয়াহর একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি রয়েছে । পশ্চিমবঙ্গ থেকে মাওলানা সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরী সাহেব কমিটির সদস্য । নিয়মিতভাবে ওই কমিটির বৈঠকে তিনি যোগ দিয়ে স্বীয় কর্মকান্ড আনজাম দিয়ে চলেছেন।পশ্চিমবঙ্গ মাহকামায়ে শরীয়াহর পক্ষ থেকে ১৯৮৬সাল থেকে এ পর্যন্ত ৩২বছর ধরে ৭৫৪টি মোকদ্দমা দাখিল হয়েছে যার মধ্যে১৩টি বাদ দিয়ে সব কটি ফায়সালা হয়েছে যার তথ্য ভিত্তিক রেকর্ড অফিসের মহাফেজখানায় সংরক্ষিত আছে।

মাহকামায়ে শরীয়হর কর্মপ্রণালী ও মোকদ্দমা দাখিল করার নিয়মনীতি
বৈবাহিক জীবনে নিপীড়িত ও নির্যাতিত নরনারী দরখাস্তে বিস্তারিত ঘটনা উল্লেখ করে এবং ছাপা ফর্মে নির্দেশ মোতাবেক পূরণ করে মাহকামায়ে শরীয়াহ অফিসে (৮১,রবীন্দ্র সরণী, কলকাতা ৭০০০৭৩)দরখাস্ত জমা করবেন। সঙ্গে প্রাথমিক খরচ বাবদ ৪০০টাকা জমা করবেন ।পশ্চিমবঙ্গ মাহকামায়ে শরীয়াহ কমিটি উভয় পক্ষকে রেজিষ্ট্রি পত্র মাধ্যমে নির্দিষ্ট তারিখ আদালতে হাজির করে তাদের মতামত স্বাক্ষীগনের বয়ান, তথ্য প্রমান সহ যাচাই করতঃ বিশেষ ক্ষেত্রে স্বামী ও স্ত্রীকে একত্রে বসিয়ে পরস্পরের কথা বার্তার মাধ্যমে অশান্তির সূত্র অবগত হয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় ।নিরুদ্দেশের ক্ষেত্রে তদন্ত পর্ব যাচাই করতে দৈনিক পত্রিকা প্রতিদিন, কলম, আখবারে মাসরিক ইত্যাদি পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে মোকদ্দমার নিষ্পত্তি করা হয়। পাগল, পুরুষত্বহীনের ক্ষেত্রে ডাক্তারি, পরীক্ষা -নিরীক্ষা করে অভিযোগ সত্য হলে শরীয়ত মোতাবেক ফায়সালা করা হয়। কমিটি সর্বাধিক দু আড়াই মাসের মধ্যে কেসের নিষ্পত্তি করে। আবার বিশেষ ক্ষেত্রে এক মাসের মধ্যে ফায়সালা দেওয়া হয়। জানা দরকার, মাহকামায়ে শরীয়াহ এর পরিচালনা ব্যবস্থাকে প্রশাসনও সম্মান দেয়। উল্লেখ্য করা যেতে পারে সেপ্টেম্বর/৪২৩/০৯/এন্ড জুলাই/৫২৭/১২কেসের আসামিদ্বয় দমদম সেন্ট্রাল জেল ও আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে বন্দি ছিলেন।রেজিস্ট্রি পত্র মারফত জেল কর্তৃপক্ষকে যথারীতি মাহকামায়ে শরীয়াহ এর পক্ষ থেকে হাজির করতে বলা হয়। জেল কর্তৃপক্ষ মাহাকামায় শরীয়হর ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়ার জন্য বড় বাজার থানাকে তদন্ত করতে বলে । বন্দি সুরক্ষিত থাকবে কিনা তাও দেখতে বলে ।তারপর নির্দিষ্ট দিনে পর্যাপ্ত পুলিশসহ আসামিকে শরীয়াহ আদালতে হাজির করে।এইভাবে উভয় আসামিকে দু দুবার করে পুলিশ প্রহরায় হাজির করিয়ে এই মোকদ্দমার ফায়সালার সহযোগিতা করেন। বাদীনিকে ফাসখে নিকাহ বিবাহ(বিবাহ বিচ্ছেদ)এর ফায়সালা দেওয়া হয়।

বাদিনীবলেন অত্যাচারী, দুষ্কৃতী-চরিত্রহীন জেলের অপরাধীর হাত থেকে মুক্তি পেতে চাই তালাক খুলে পেতে চাই। হাওড়া জেলের এক মোকদ্দমা যার কেস নং Mar/390/08 এর ক্ষেত্রে উভয় পক্ষয়ের উপস্থিতিতে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। বিবাদীর উপর  ৩৫০০০ হাজার টাকা বিভিন্ন খাতে এক মাসে আদায় করার নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে সেই ছেলে অস্বীকার করলে ডোমজুড় থানার ওসিকে পত্র দিলে, তিনি এক সপ্তাহের মধ্যে আদায় করিয়ে দেন। মাহকামায়ে শরীয়াহায় নিরপেক্ষ ফায়সলায় তারা সহযোগিতা করেন। প্রকাশ থাকে যে, ফায়সলা করাই শেষ কাজ নয়। বাচ্চাদের খোরপোষ ও মহিলাদের খোরপোষ আদায় করানো ও বাচ্চাদের পিতা-মাতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার ক্ষেত্রেও মাহকামায়ে শরীয়াহ দায়িত্ব অনুযায়ী কাজ করে থাকে।

                                                                                                                                                 ( এরপর আগামী কাল)


শেয়ার করুন
  • 3
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সম্পর্কিত নিবন্ধ

Leave a Comment