অন্যান্য 

মিশন-২০২১ : মমতার অগ্নি পরীক্ষা বনাম ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও কিছু কথা/ তায়েদুল ইসলাম

শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

তায়েদুল ইসলাম : ২১ জুলাই এর ভার্চুয়াল সভা থেকেই ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনের প্রচার শুরু করে দিলেন তৃণমূল নেত্রী। অন্যান্য দল বিশেষ করে কংগ্রেস – সিপিআইএমও রণকৌশল ঠিক করার প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু বিজেপি অনেক আগে থেকেই সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি নিয়ে ময়দানে নেমে পড়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি তৃতীয় বারের জন্য মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে পারবেন ? অথবা মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেও তিনি কি তৃণমূলের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে পারবেন ? মমতার সামনে কয়েকটি প্রধান চ্যালেঞ্জ। প্রথম বার দল হিসেবে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল সিপিআইএম। দ্বিতীয় বার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল কংগ্রেস সিপিআইএম জোট। এবার আগামী নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপি। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে মূলত তিনটি জোটে লড়াই হবে। কিন্তু অনেকের অভিমত লড়াই হবে তৃণমূল এবং বিজেপির মধ্যে। কংগ্রেস, সিপিআইএম নেতারা মুখে লড়াই করবেন তৃণমূল এবং বিজেপি উভয়ের বিরুদ্ধে। কিন্তু সমর্থকদের এগিয়ে দেবেন বিজেপিকে ভোট দেওয়ার জন্য। এ সমস্যা মমতার জন্য অভিনব না হলেও এর আগে এ সমস্যা এত বড় ছিল না।
একই ভাবে পুরাতন সমস্যা বড় আকারে দ্বিতীয় সমস্যা হিসেবে যার মোকাবিলা তাঁকে করতে হবে তা হল দলীয় নেতাদের একাংশ ভিতর ভিতর বিজেপির সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলছেন। তাঁরা বৃষ্টি দেখে ছাতা ধরবেন। কেউ কেউ ভোটে সরাসরি সাবোটেজও করতে পারেন। তৃতীয় চ্যালেঞ্জ মমতার সামনে দেখা দিয়েছে সম্পূর্ণ নূতন রুপে। এই চ্যালেঞ্জটি আগের নির্বাচন দুটিতে কাজ করেছে তাঁর সহায়ক শক্তি হিসেবে। এ বার এ শক্তিটি সরাসরি তাঁর বিরুদ্ধে কাজ করে চলেছে নিরলস ভাবে। শক্তিটি হল আরএসএস পরিচালিত সংঘপরিবার। এর প্রতিটি শাখা সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে প্রতিদিনের কর্মসূচি নিয়ে। নির্বাচনের আগে কোন তাসই খেলতে বাকি রাখবে না। গোপন ও প্রকাশ্য প্রচারের প্রধান অভিমুখ মুসলিম ঘৃণা বিদ্বেষ।

মুসলিম হত্যা ঘটনোর জন্য অজুহাত তৈরির চেষ্টা করে চলেছে প্রতিনিয়ত। অমুসলিম সমাজের উল্লেখযোগ্য অংশ বিশেষ করে ছাত্র ও যুবকদের তাদের ভাবনায় সম্পৃক্ত করতে সমর্থ হয়েছে। মোদী সরকারের জনবিরোধী কোন কর্মসূচিকেই তারা গুরুত্ব দিচ্ছে না। মুসলিম বিদ্বেষের কাছে সবই হেরে যাচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে লড়াইটা হবে মমতা বনাম সংঘপরিবার এর মধ্যে। চতুর্থ চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ভারতীয় গণতন্ত্রের সাধারণ রেওয়াজ হল প্রশাসন এবং পুলিশ প্রশাসন নির্বাচনে সরকারী দলের হয়ে কাজ করে। কিন্তু এ রাজ্যে তাদের একাংশ এখন থেকেই সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকছে না। বিজেপির হাতে অঢেল টাকা। এখনই বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে বিজেপি প্রতিটি থানায় অর্ধকোটি টাকা ধরিয়ে দিয়েছে। তৃণমূলের বিরোধিতা করতে হবে না। বিজেপির পক্ষে কাজ করতে হবে না। শুধুমাত্র নিরপেক্ষ থাকতে হবে।
কিছু পুরোনো সমস্যা তো আছেই। সিপিআইএম এর বিরুদ্ধে মমতার দীর্ঘ লড়াইয়ের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার ছিল দুর্নীতি এবং দলতন্ত্র। পরে যোগ হয়েছিল মুসলিম বঞ্চনার সরকারী দলিল সাচার কমিটি রিপোর্ট এবং সর্বশেষ ছিল সিঙ্গুর নন্দীগ্রামের কৃষি জমি রক্ষা আন্দোলন। এ সবের কোনটাই এ বার তাঁর পক্ষে কাজ করবে না।

বরং কিছুটা তাঁর বিরুদ্ধেই কাজ করবে। বিশেষ করে দুর্নীতি এবং কর্মীদের অত্যাচার ও মস্তানি। অনেকেই এই ব্যাখ্যাও দেন দলের এবং প্রশাসনে থাকা বিজেপির লোকেরাই পরিকল্পিতভাবে দুর্নীতি এবং সাধারণ মানুষের উপর জুলুম অত্যাচার করে চলেছে যাতে সাধারণ মানুষ বাঁচার তাগিদে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে চলে যায়। কিন্তু তৃণমূলের মুসলিম নেতা কর্মীরা এ কাজ করছেন কেন এ প্রশ্নের জবাব তাঁরা দেন না। মমতার নিজের ভাবমূর্তিতেও ধাক্কা লেগেছে। দেশের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অংশ হচ্ছে সব রাজনৈতিক দলই নির্বাচনে গটআপ ব্যক্তি বা দলকে ময়দানে হাজির করে। বিজেপির হাতে যেহেতু বিপুল টাকা সেহেতু বিজেপি এ বার এই খেলাটি আরও শক্তিশালী করে খেলবে। মুসলিম ভোট ভাঙানোর জন্য মুসলিম সমাজে কিছু পোষা হাতি তৈরির কাজ শুরু করেছে আগেই। ইতিমধ্যেই কিছু পোষা হাতি পেয়েও গেছে বলে বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিছু ব্যক্তি নির্বাচনের মুখে নতুন করে দল তৈরি করার তোড়জোড় শুরু করেছেন। এরা কোন দিনই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ছিলেন না। এমনকি ঘোষণাও করতেন তাঁরা অরাজনৈতিক ব্যক্তি। রাজনীতির ভালমন্দ বোঝোন না। হঠাৎ করেই তাঁরা ভাবছেন অনেকগুলো আসনে প্রার্থী দেবেন। অনেকেই নতুন ভাবে সামাজিক সংগঠন, এনজিও খুলে তৃণমূলের ব্যর্থতা ও চালাকি তুলে ধরার চেষ্টা করছে। অভিযোগ এরাও বিজেপির নতুন পোষা হাতি।
এই রকম জটিল পরিস্থিতিতে মমতার পক্ষে তৃতীয় বারের মতো মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়া সহজ হবে না বলেই কোন কোন ভোট বিশেষজ্ঞর মত। এই পরিস্থিতিতে মমতাকে ক্ষমতায় টিকে থাকতে হলে যে বিষয়গুলোর প্রতি গুরুত্বারোপ করতে হবে তা হল, দুর্নীতি এবং নেতা কর্মীদের মস্তানীর বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে। তাতে কিছু নেতা কর্মীর বিজেপিতে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু তাতেও তৃণমূলের সুবিধা আছে। পাঁচ জন নেতা চলে গেলেও পাঁচশত ভোটারের আস্থা অনেকটা ফিরে আসবে। মুসলিম সমাজের প্রতি এত দিন যে চালাকিটা করে এসেছেন তা বন্ধ করতে হবে। নরম হিন্দুত্ব ও ব্যালান্সের রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। তাঁকে বুঝতে হবে কংগ্রেস সিপিআইএম আর যাই হোক ফ্যাসিবাদী নয়। বিজেপি বিরোধী ভোট ভাগ হতে না দেওয়ার দায়িত্ব তাঁকেই নিতে হবে। মে সমস্ত ছোট ছোট রাজনৈতিক দল আছে তাদের নিয়ে মহাজোট গঠন করে করতে হবে। যেমন এসডিপিআই, ডবলুপিআই, মুসলিম লীগ ইত্যাদি। তিনি জাতীয় স্তরে বার বার মহাজোটের ডাক দেন। নিজের রাজ্যে এই মহাজোটের বাস্তব অনুশীলন করে জাতীয় স্তরে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের এই সুবর্ণ সুযোগ। নেতা, মস্তান, পুলিশ কারো উপর কোন ভরসা না করে ভরসা রাখতে হবে জনগণের উপর।


শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সম্পর্কিত নিবন্ধ

Leave a Comment