অন্যান্য 

নিজামউদ্দিন মারকাজ ‘করোনার আতুর ঘর’ মিডিয়ার প্রচারনা বনাম বাস্তবতা !

শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বুলবুল চৌধুরি  : করোনা ভাইরাস সংক্রমণ নিয়ে মানুষ এতটাই ভিত ছিল যে তারা ধর্ম নিয়ে চিন্তা করার সময় পায়নি । আর রাজনৈতিক নেতারা লকডাউন থাকায় হিন্দু-মুসলিম প্রচার বন্ধ হয়ে গিয়েছিল । এমনকি লকডাউনের জেরে অভিবাসী শ্রমিকরা রাস্তায় আটকে পড়ে ভুলে গিয়েছিল তাদের ধর্মের কথা । হিন্দু-মুসলিম এক সারিতে দাঁড়িয়ে রাস্তায় হেঁটেছে । পুলিশের লাঠি খেয়েছে । রাস্তায় এক পাতায় ভাগাভাগি করে খাচ্ছে এদৃশ্যও অনেক দিন পর দেখা গেছে । রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে মারা গেছে কম করে ২২ জন অভিবাসী শ্রমিক । এই  শ্রমিক-মজুররা এই সময়ে বুঝতে পেরেছে তাদের কোনো জাত বা ধর্ম নেই তাদের একটাই পরিচয় তারা শ্রমজীবী মানুষ ।

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের ভয়ে  লকডাউনের জেরে কাজ হারিয়ে লক্ষ লক্ষ শ্রমজীবী মানুষ যখন দিশেহারা , তাদের ধর্ম পরিচয় হারিয়ে শ্রমজীবী পরিচয়ে রাম-রহিম যখন এক হচ্ছে ঠিক তখনই বিভেদকামীরা বিভেদের জাল নিয়ে হাজির ।

এবার লক্ষ্য নিজামউদ্দিনের মারকাজ । তবলিগ জামাতের প্রতিটি কাজের সঙ্গে আমি ব্যক্তিগতভাবে সহমত নই । তবে এটা ঠিক তবলিগ জামাতের লোকেরা ব্যক্তিগতভাবে সৎ এবং ধর্মপরায়ন হয় । নিজেদের ধর্মীয় চর্চার বাইরে গিয়ে তারা কিছুই করে না । সংসার ছেলেমেয়েদের ছেড়ে দিনের পর দিন নিজ খরচে ধর্ম প্রচার করে থাকেন এবং সাধারন মানুষকে খারাপ পথ থেকে সরিয়ে সমাজের মূল স্রোতে ফেরানোর কাজ করে । এদের অধিকাংশ লোকই সরল মানুষ হয়ে থাকেন । সেই তবলিগ জামাতকে টার্গেট করে বিজেপির দিল্লি প্রদেশের সভাপতি মনোজ তিওয়ারি বলেন , নিজামউদ্দিন মারকাজ থেকে করোনা জেহাদ সমগ্র দেশে ছড়িয়েছে । তখন স্পষ্ট হয়ে যায় , মোদীজি যতই বলুক না কেন করোনা নিয়ে রাজনীতি করা হবে না । বিজেপি রাজনীতি করবেই । কিসের রাজনীতি হিন্দু –মুসলিমের রাজনীতি । এমনভাবে বিষয়টিকে উপস্থাপন করা হচ্ছে যেন মনে হচ্ছে সমগ্র দেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে মারকাজ থেকেই । দেশের জাতীয় সংবাদ মাধ্যমগুলিও এই প্রচারকে সাজিয়ে গুছিয়ে পরিবেশন করে চলেছে ।

সবচেয়ে অবাক করেছে বাংলার দুটি টিভি চ্যানেলের ভূমিকা । বহুল প্রচারিত এই দুটি টিভি চ্যানেলের দুই উপস্থাপক  করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার জন্য  নিজামউদ্দিন মারকাজের ভূমিকাকে এমনভাবে তুলে ধরছে মনে হচ্ছে দেশের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য তবলিগ জামাত দায়ী । এর মধ্যে একটি সংবাদ মাধ্যম তো প্রচার করেছে করোনার আতুর ঘর নিজামউদ্দিন । সত্যিই তাই ! বাঙালি বুদ্ধিজীবী ওই দুই টিভি চ্যানেলের সাংবাদিকের বুদ্ধিমত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ নেই । তাঁরা দুজনই বর্ষীয়ান সাংবাদিক । অনেক কিছু জানেন । তবে এক্ষেত্রে যেন মনে হচ্ছিল তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর কেউ তাদেরকে এই কথাগুলো বলিয়ে নিয়েছে । কারণ তাঁদের মত অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তির কাছে এধরনের মন্তব্য আশা করা যায়নি ।

দুই জনই যেহেতু প্রবীণ সাংবাদিক তাই তাঁদেরকে শিক্ষা দেওয়ার কিছু নেই । তবে এই বিষয়টি  নিয়ে কয়েকটি ঘটনা পরম্পরায় তুলে ধরছি । আশা করি এ থেকে তাঁরা যেমন বুঝতে পারবেন একইভাবে সাধারন মানুষের কাছে সত্যটা উঠে আসবে ।

মাননীয় মহান সাংবাদিক মহাশয় আপনি অবশ্যই অবগত আছেন জাতীয় কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধী ফেব্রুয়ারি মাসেই করোনা ভাইরাসের ভয়ংকরতা নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন । ভারত সরকারকে সর্তকও করেছিলেন । দুঃখের হলেও সত্য রাহুলের মন্তব্য নিয়ে সেদিন শাসক দলের অনেক নেতা ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করেছিলেন । আপনারা বাঙালি বুদ্ধিজীবী সাংবাদিকরা নিরব ছিলেন । এমনকি দেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রী হর্ষবর্ধনও রাহুল গান্ধীকে কটাক্ষ করেছিলেন । বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী হিসাবে অবশ্যই আপনাদের স্মরণে থাকার কথা ।

শুধু কি তাই ? ১৩ মার্চ কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য দফতর থেকে বলা হচ্ছে করোনা ভাইরাস হেল্থ ইমারজেন্সি নয়। অথচ দিল্লি সরকার করোনা নিয়ে সর্তকতা জারি করেছে । অন্যদিকে কেন্দ্র বলছে এটা কোনো ভয়ের বিষয় নয় ।

আর ১৩ই মার্চ : দিল্লির নিজামুদ্দিন মার্কাজে ৪০০০ জন ‘মুসলিম’ নিয়ে তাবলীগি জামায়াতের ইসতেমা হয়।

১৫ই মার্চ : নিজামুদ্দিনে তাবলীগি জামায়াত শেষ হল।

১৬ই মার্চ : করোনা রুখতে হিন্দু মহাসভা গোমূত্র পার্টি আয়োজন করলো।

১৬ই মার্চ : দিল্লি সরকার সব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বন্ধের আদেশ দিলো।

১৭ই মার্চ : ৪০,০০০ হিন্দু তীর্থযাত্রীদের জমায়েত তিরূপতি মন্দিরে।

১৮ই মার্চ : ৪০,০০০ হিন্দু তীর্থযাত্রীদের জমায়েত তিরূপতি মন্দিরে।

১৯ই মার্চ :প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিলেন এবং করোনা ভয়াবহতা রুখতে সামাজিক দূরত্বের  কথা প্রথম বললেন । এরপর তিরূপতি মন্দির বন্ধ হল।

২২ই মার্চ : জনতা কার্ফু।

২২ই মার্চ : সন্ধেবেলা হাজার হাজার বিজেপি সমর্থকদের পথেঘাটে জমায়েত, থালা বাজিয়ে উত্তাল নাচ। এতে করোনা ভাইরাস ছড়ায়নি ? কেন চুপ করেছিলেন মাননীয় নিরপেক্ষতার ধ্বজাধারী সাংবাদিকরা ।

২৪ শে মার্চ আবার জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিলেন । আর মাত্র ৪ ঘন্টার ব্যবধানে প্রধানমন্ত্রী লকডাউন ঘোষনা করলেন । ২৫শে মার্চ: মোদি সারা ভারত লকডাউনের নির্দেশ দিল। ২৫শে মার্চ : অযোধ্যায় যোগী আদিত্যনাথ রামলালা যাত্রা করল লকডাউন ভেঙে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ অমান্য করে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যে জমায়েত করলেন তা নিয়ে নিরব ছিলেন বাংলার সাংবাদিকরা ।

৩০শে মার্চ : সরকারি অপদার্থতার ফলে ২২ জন পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যু।

৩০শে মার্চ : কাশ্মীরে বৈষ্ণদেবী মন্দিরে ফেঁসে গেল ৫০০ জন হিন্দু তীর্থযাত্রী।

৩০শে মার্চ: দিল্লি রাজপথে ফেঁসে গেল ৫০,০০০ জন পরিযায়ী শ্রমিক।

৩০শে মার্চ: দিল্লি নিজামুদ্দিন মার্কাজে আগত ৫ জন জামায়াতি’র মৃত্যুর সংবাদ প্রকাশিত হয় ।

তাহলে আপনারা প্রশ্ন করতেই পারেন ১৫ মার্চ ইসতেমা শেষ হয়ে যাওয়ার পর কেন এত মানুষ মারকাজে ছিল। প্রথমত বলা প্রয়োজন নিজামউদ্দিন তবলিগ জামাতের প্রধান কার্যালয় । এখানে প্রতিদিন কমকরে দুহাজার মানুষ জমায়েত হয়ে থাকে । তাঁরা আসেন আবার বিভিন্ন জায়গায় বেরিয়ে যান । তবে এই সভায় ৮টি দেশের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন । মূলত তাঁরাই থেকে গিয়েছিলেন । যেহেতু বিদেশী অতিথি তাই তাঁদেরকে ওখানে রাখা হয়েছিল ।

২৫ মার্চ লকডাউন ঘোষণা হয়ে যাওয়ার পর মারকাজের পক্ষ থেকে প্রশাসনের দৃষ্টি আর্কষণ করা হয় । এদেরকে বাড়ি পাঠিয়ে দেবার কথা বলা হয় । কিন্ত প্রশাসন জানিয়ে দেয় এখন তা সম্ভব নয় লকডাউন শেষ হওয়া না পর্যন্ত মসজিদেই তারা থাকুক । এরপর প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তরেও মারকাজের পক্ষ থেকে জানানো হয় । এমনকি বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধিরা মারকাজে আসেন এবং তারা অতিথিদের সঙ্গে কথা বলেন । পরের ঘটনা তো সকলেরই জানা ।

কণিকা কাপুর বিদেশ থেকে ফিরে কেন বিভিন্ন পার্টিতে যোগ দিয়েছিলেন সে নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়নি ? কেন সংসদের অধিবেশন ২৩ মার্চ পর্যন্ত চালানো হল তা আজ পর্যন্ত জানা যায়নি ? কেন ২৩ মার্চ রাত ৯টায় মধ্যপ্রদেশে শিবরাজ সিংহ চৌহান মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিলেন তাও জানা যায়নি ? কোন সাংবাদিকরা প্রশ্ন তোলেননি শুধুমাত্র মধ্যপ্রদেশে সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে এই লক্ষ্যে লকডাউন করতে দেরি করেছে কেন্দ্র ? আর নিজামউদ্দিনের গন্ধ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রে রে করে তেড়ে এলেন নিরপেক্ষ সাংবাদিকরা ! যত দোষ নন্দ ঘোষ! মুসলিমদের সম্পর্কে এত বিদ্বেষ আমাদের মধ্যে বিদ্যমান ছিল তা আগে জানতে পারিনি ।

যাইহোক ভারতে করোনা ভাইরাস মহামারির আকার নিতে চলেছে এই সময় একটি বিশেষ সম্প্রদায়কে চিহ্নিত করে তাদের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি  করে কী লাভ হবে ? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন তথা কথিত নিরপেক্ষ সাংবাদিকরা । প্রশ্ন যদি তুলতেই হয় তাহলে তুলুন প্রধানমন্ত্রীর দিকে । কারণ কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছিল । যার পরিনতিতে হাজার হাজার মানুষ বিভিন্ন রাজ্যে আটকে পড়েছে । এই কঠিন সংকটের দিনে নিজ পরিবার পরিজনদের কাছে পৌছাতে পারেনি । তাদের কথা চিন্তা করুন যারা আমার হিন্দু-মুসলিম ভাই অন্য রাজ্যে আটকে গিয়ে ক্ষুধায় তৃষ্ণায় কাতর হয়ে পড়েছে । তাদের কথা মিডিয়ায় তুলে ধরুন । তুলে ধরুন করোনা ভাইরাস টেষ্ট করার জন্য উপযুক্ত কাঠামো যাতে সরকার তৈরি করে সেদিকে দৃষ্টি আর্কষণ করুন । দোহাই করোনা ভাইরাস নিয়ে হিন্দু-মুসলিমের মধ্যে বিভেদ তৈরি করবেন না । জাতির এই সংকটের দিনে অন্তত আসুন জাতি-ধর্ম-বর্ণ সকলে মিলেই এই মারণ ভাইরাসের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় ।

#দয়া করে কেউ কপি করে করবেন না । অনেকে বাংলার জনরব-এর লেখাকে হুবহু কপি করে ফেসবুকে নিজের নামে চালিয়ে দিচ্ছেন । এটা আইনত অপরাধ । তবে ভাল লাগলে শেয়ার করবেন । আমাদের খবর সবার আগে পাওয়ার জন্য সাবসক্রাইব করবেন । তাহলে খবর প্রকাশ করার সঙ্গে সঙ্গে আপনার কাছে পৌছে যাবে ।


শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সম্পর্কিত নিবন্ধ

Leave a Comment