অন্যান্য কলকাতা 

দাঙ্গা বিধ্বস্ত উত্তর-পূর্ব দিল্লিতে যা দেখলাম : মাওলানা সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরি

শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বিশিষ্ট আলেম ও ইসলামী চিন্তাবিদ জমিয়ত নেতা মাওলানা সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরি সম্প্রতি দাঙ্গা বিধ্বস্ত উত্তর-পূর্ব দিল্লি সফর করে এসেছেন । কেমন দেখেছেন দাঙ্গা বিধ্বস্ত দিল্লি ? তার বিবরণ খুব সংক্ষেপে তিনি দিয়েছেন । আমরা বাংলার জনরব-এর পাঠকদের কাছে তা তুলে ধরলাম । নিরপেক্ষ মন নিয়ে জনাব মাওলানা সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরি দিল্লি দাঙ্গার বিবরণ দিয়েছেন । তা পড়লে যেকোনো মানুষের চোখে অশ্রু এসে যাবে । 

জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সর্বভারতীয় মহাসচিব জনাব মুহাম্মদ মাহমুদ মাদানী সাহেবের বিশেষ অনুরোধে দাঙ্গা-বিধ্বস্ত দিল্লির পরিস্থিতি সরেজমিনে পরিদর্শন করতে গত ৫ মার্চ দিল্লি সফরে গিয়েছিলাম। প্রথমে মাহমুদ মাদানী সাহেব এবং পরে ত্রাণ শিবির পরিদর্শন করে মাওলানা হাকিমুদ্দীন , আইনজীবী নিয়াজ ফারুকীসহ রিলিফ কমিটির সাথে বৈঠক করি । পরে তিন ঘন্টা সময় দিয়ে মসজিদ , ঘরবাড়ি দেখে মানুষের সঙ্গে কথা বলি । সেখানে গিয়ে যা দেখলাম, যা শুনলাম সর্বোপরি যা অনুভব করলাম ; সেই বীভৎসতা, হিংস্রতা , নৃশংসতার কোনো উপমা আমার শব্দ ভান্ডারে নেই । আমি পেশাদার কলমচি নই । নেহাৎ অব্যক্ত যন্ত্রনার কষাঘাতে কলম-কাগজ নিয়ে বসি । তথাপি আমি যা অবলোকন করেছি তা যতদূর সম্ভব সাদামাঠাভাবে আপনাদের সামনে তুলে ধরছি ।

গত ২৪ ফেব্রুয়ারি রাত থেকে টানা তিন দিন ধরে উত্তর-পূর্ব দিল্লি জুড়ে সমানে চলেছে গোলাগুলি লুঠতরাজ , অগ্নিসংযোগ ।পুড়েছে প্রায় পাঁচ শতাধিক বাড়ি । জাফরাবাদ সংলগ্ন এলাকায় প্রাণ রক্ষার জন্য পাথর ছোঁড়াকে কেন্দ্র করে পুলিশের তান্ডব নেমে আসে । পুলিশের উপস্থিতিতে অগ্নিসংযোগ , লুঠতরাজ চলে । অলিগলিতে হাহাকার দিনের বেলায় বিধ্বস্ত পরিবারের লোকজন ধ্বংস হওয়া বাড়ির সামনে চোখের অশ্রু ফেলছেন । কে কখন রিলিফ দেবেন সেখানে তাকিয়ে আছেন । রাতের বেলায় নিরাপত্তার জন্য আপনজনের বাড়ি ও ত্রাণ শিবিরে রাত কাটাচ্ছেন । অমিত শাহের পুলিশ মসজিদের মধ্যে সেল ফাটিয়েছে। মাদ্রাসার ছাত্র-মসজিদের মুসল্লিদের উপর চালিয়েছে অকথ্য নির্যাতন ; এলাকার মানুষজন একথা বলেছেন ।দয়ালপুর থানার পাশে টায়ার মার্কেটে আগুন জ্বালিয়ে ২০০ দোকান পুড়িয়ে খাক করে দেওয়া হয়েছে আর পুলিশ যথারীতি নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে ।ফেজ নং ৭-এর বেকারির মালিক গুলদ্বীনের তিনতলা বাড়ি ও বেকারি লুঠ হয়েছে , সিসিটিভি হার্ডডিস্ক ভেঙে নিয়ে গেছে ; এর পাশাপাশি ৬ ও ৯ নং গলিও পরিদর্শন করি । ভিন ধর্মের মানুষদের দেখে দেখে খুন করে নিকাশি খালে মৃতদেহ ফেলে দেওয়া হয়েছে । গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করে সুপ্রাচীন আউলিয়া মসজিদে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে । নির্দ্বিধায় পোড়ানো হয়েছে কুরআন মজীদ । ইমাম-মুয়াজ্জিনদের হাত-পা বেঁধে নির্মমভাবে অত্যাচার চালানো হয়েছে । গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁরা এখনও চিকিৎসাধীন ।

দুপুর তিনটে থেকে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত ৫টি মসজিদে যাই বহু ব্যক্তির সাথে আমাদের কথা হয় । সবার মুখে একটাই কথা , দিল্লির সহিংসতা দুইটি সম্প্রদায়ের মধ্যেকার আঘাত-প্রত্যাঘাতের সিলসিলা নয় বরং দাঙ্গাকারীরা বিনা প্ররোচনায় নিরীহ মানুষের উপর আক্রমণ শানিয়েছে ; মুসলিম গণহত্যা হয়েছে । দাঙ্গাকারীদের লোলুপ নিশানা থেকে বাদ যায়নি অমুসলিমরাও। তাদেরও কিছু ঘর-বাড়ি পুড়েছে , দোকান জ্বলেছে । কিছুস্থানে দাঙ্গাকারীদের বিরুদ্ধে শান্তিপ্রিয় সম্মিলিত জনতা রুখে দাঁড়িয়েছেন ফলে কিছুটা প্রতিরোধ হয়েছে , সংঘর্ষ হয়েছে ; সেখানে ক্ষতির মাত্রা তুলানায় কম । কিন্ত যেখানে জনগণ প্রতিরোধ করার সাহস পায়নি, পালিয়ে গেছে ; সেখানে ক্ষয়ক্ষতি তুলনামূলক বেশি । এখনও পর্যন্ত ৫০/৫১টি মৃতদেহ শনাক্ত করা গেছে । তবে আশঙ্কা করা হচ্ছে , মৃতের সংখ্যা শতাধিক । যাঁরা মরেননি কিন্ত চোখের সামনে জীবন্ত মানুষকে লাশে পরিণত হতে দেখেছেন , পূর্বপুরুষদের তৈরি করা বাড়িতে আগুন ধরতে দেখেছেন তাঁদের অবস্থাটা কেমন? তাঁরা আজ সর্বস্বান্ত ।সুউচ্চ ভবনগুলির মালিকরা এক রাতের ব্যবধানে খোলা আকাশের নীচে । দাঙ্গা-বিধ্বস্ত এই মানুষগুলির অসহায়তার কাছে শীতের তীব্রতাও যেন হার মেনেছে ।

মাদানী মসজিদ , আউলিয়া মসজিদ , টায়ার মসজিদ , গোকুলপুরী মসজিদ , উমর মসজিদ , কাদেরিয়া মসজিদ , মাদ্রাসা অশোক বিহার মসজিদ , খেজুরি মাদ্রাসা মসজিদ পরিদর্শন করা হয় । জাফরাবাদ মাদ্রাসা মসজিদ , আউলিয়া মসজিদ সহ ২-৩ জায়গায় জমিয়তের ত্রাণ শিবির খোলা হয়েছে । আমি নিজে ৩০/৩৫ জন মহিলা-পুরুষের হাতে খাদ্য সামগ্রির কিট ও নগদ অর্থ প্রদান করি । কেন্দ্রীয় জমিয়তের অসংখ্য কর্মী সার্ভে ফর্ম নিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করছেন। ২১ সদস্যের ত্রাণ কমিটি ও ১১ সদস্যের লিগাল সেল গঠন করা হয়েছে ।

দিল্লি পুলিশের উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করে মাওলানা হাকিমুদ্দীন ও নিয়াজ ফারুকী সহ জমিয়ত নেতৃত্ব শান্তি-শৃঙ্খলার আবেদন জানিয়ে এসেছেন । নিরাপরাধ মানুষ যারা ধরা পড়েছেন তারা যাতে মুক্তি এবং প্রকৃত দাঙ্গাকারীরা যাতে কঠোর শাস্তি পায় তার দাবি জানানো হয়েছে । পশ্চিমবঙ্গ জমিয়তের পক্ষ থেকে ১৫ লক্ষ টাকার ত্রাণ সামগ্রী দিল্লিতে পাঠানো হয়েছে । ত্রাণ সংগ্রহের কাজ এখনও চলছে ।দরদী ব্যক্তিরা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে সওয়াবে দারায়েন হাসিল করুন ।

লেখক : পশ্চিমবঙ্গ সরকারের গ্রন্থাগার মন্ত্রী এবং জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের পশ্চিমবঙ্গ শাখার সভাপতি ।

 

 

 

 

 


শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সম্পর্কিত নিবন্ধ

Leave a Comment