অন্যান্য কলকাতা 

রাজ্যসভায় কেন চার বিদায়ী সাংসদকে বাদ দিলেন তৃণমূল নেত্রী ? কোন রাজনীতির অঙ্কে সুব্রত-দ্বীনেশ-অর্পিতা-মৌসমকে বেছে নিলেন মমতা জানতে হলে ক্লিক করুন

শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সেখ ইবাদুল ইসলাম : নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ফলিত রাষ্ট্রবিজ্ঞান এতটাই বাস্তব যে তাঁকে তাবড় তাবড় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বুঝে উঠতে পারেননি । কারণ তিনি রাজনীতিতে আবেগ-বাস্তব এবং মানবিকতা তিনটি বিপরীত মেরুর অবস্থান হলেও একসঙ্গে সহাবস্থান করান । এটা মমতা বলেই সম্ভব হয় । ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন কিভাবে ফেস করবেন তার দিক নির্দেশ তিনি করেই ফেললেন । তবে আগামী দিনে আরও কোনো তাৎপর্যমূলক সিদ্ধান্ত আমরা দেখতে পাব ।২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে এই রাজ্যে বিজেপি যেভাবে ২ থেকে ১৮টি লোকসভা আসন পেয়ে চমক দিয়েছিল , কিন্ত মমতার কূটকৌশলী চালে সেই চমক অনেকটাই আজ স্তিমিত । জঙ্গল মহলে কয়েক মাস আগেও বিজেপির যে দাপট ছিল আজ সেই দাপট তো দূর অস্ত বিজেপির নেতা কর্মীরা নিজেদের অস্তিত্ব বাঁচাতে তৎপর হতে হচ্ছে । আগামী কয়েক মাসের মধ্যে জঙ্গল মহলে বিজেপির অস্তিত্ব সংকটে পড়বে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই ।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একজন কুশলী রাজনীতিবিদ হিসাবে প্রতি মূহুর্তে হিসাব করে পা ফেলছেন । তা আরও একবার প্রমাণ পাওয়া গেল রাজ্যসভার প্রার্থী নির্বাচনে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে গতবারের চারজন বিদায়ী সাংসদের একজনকেও এবার মনোনয়ন দেননি নেত্রী । যদিও চারজনের মধ্যে দুজন আহমদ হাসান ইমরান ও কেডি সিংহ অনেক আগেই নেত্রী গুডবুক থেকে সরে গিয়েছিলেন । এই দুজনের আর প্রার্থী হওয়ার কোনো সম্ভাবনা ছিল না । এরপর যোগেন চৌধুরি । সাংসদ হিসাব সবচেয়ে বেশি টাকা খরচ করেছেন উন্নয়নে । তিনি আর প্রার্থী হতে চান না বলে আগেই ঘনিষ্ট মহলে জানিয়ে দিয়েছিলেন । আর একজন হলেন প্রাক্তন রাজ্যের স্বরাষ্ট্র সচিব মণীশ গুপ্ত । তাঁকে রাজ্যের কোনো একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ করতে চলেছেন মুখ্যমন্ত্রী । আগামী বিধানসভা নির্বাচনে মণীশবাবুকে আরও গুরু দায়িত্ব দেওয়ার লক্ষ্যেই তাঁকে এবার রাজ্যসভায় পাঠান হয়নি । তাই চারজনই বাদ গেছেন এটা ঠিক নয় ।

তবে একথা ঠিক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবার রাজ্যসভায় মনোনয়ন দিতে গিয়ে রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন । কারণ বিভিন্ন মহল থেকে বলা হয়েছিল প্রশান্ত কিশোর রাজ্যসভায় যাচ্ছেন তৃণমূলের হয়ে। কিন্ত নেত্রী পিকে মনোনয়ন দেননি । আর পিকে মনোনয়ন দিলে দলের মধ্যে অসন্তোষ চাগাড় দিত বলে আভাষ ছিল । তাই দলীয় নেতা-কর্মীদের অসন্তোষ উপলদ্ধি করেই মমতা প্রশান্ত কিশোরকে মনোনয়ন দিলেন না । আর যাঁদের মনোনয়ন দেওয়া হল সেদিকে লক্ষ্য রাখলেই দেখা মিলবে মমতার কুশলী রাজনীতির পরিচয় ।

সুব্রত বক্সীকে রাজ্যসভায় পাঠিয়ে দলের পুরোনো কর্মীদের বার্তা দিলেন :

তৃণমূল কংগ্রেসে আর পুরোনো কর্মীদের কোনো মূল্য নেই এই অভিযোগ এখন গ্রামগঞ্জে সর্বত্র শোনা যায় । মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সীকে প্রার্থী করে প্রমাণ দিলেন দলের পুরোনো কর্মীরা এখনও তাঁর কাছে সম্পদ । কারণ গত লোকসভা নির্বাচনে মালা রায়কে দক্ষিণ কলকাতায় প্রার্থী করায় প্রশ্ন উঠেছিল দলের পুরোনোদের চেয়ে কি নতুনদের কদর বেশি ? সেই প্রশ্নের উত্তর দিলেন মমতা সুব্রত বক্সীকে রাজ্যসভায় পাঠিয়ে । একসঙ্গে এই বার্তাও দিলেন দলের বিশ্বস্তদের তিনি কোনো দিন বঞ্চিত করবেন না ।

দ্বীনেশ ত্রিবেদীকে প্রার্থী করে হিন্দিভাষীদের বার্তা দিলেন :

কলকাতা তথা রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা হিন্দিভাষীদের একটা বড় অংশ এখন বিজেপি মুখী । তাই তাদের কাছে একটা বার্তা দেওয়া উচিত বলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মনে করেছেন । তিনি স্পষ্ট করে সেই বার্তা দিলেন যে হিন্দিভাষীরাও তার আপনজন । তাঁদের হয়ে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করতে পাঠালেন প্রাক্তন মন্ত্রী ও সাংসদ দ্বীনেশ ত্রিবেদীকে । দ্বীনেশকে প্রার্থী করে হিন্দিভাষীদের কাছে টানার চেষ্টা করলেন তৃণমূল নেত্রী ।

মৌসমকে প্রার্থী করে মুসলিমদের বার্তা দিলেন :

লোকসভা ভোটের ঠিক মুখে গণি পরিবারের সন্তান মৌসম বেনজির নূর কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দেন । কিন্ত লোকসভা ভোটে হেরে যান । ফলে মৌসম মালদার রাজনীতিতে ক্রমশই হারিয়ে যাচ্ছিলেন । আর মৌসমকে রাজ্যসভায় পাঠিয়ে মালদার তৃণমূলকে চাঙ্গা করার পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের মুসলিম ভোটকে তৃণমূলের দিকে আনার চেষ্টা করলেন নেত্রী। কতটা সফল হবেন তা ভবিষ্যৎ বলবে । তবে এটা ঠিক উত্তরবঙ্গের হারিয়ে যাওয়া জমিকে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যেই মৌসম ও অর্পিতাকে এবার রাজ্যসভায় পাঠানো হল । এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই । একই সঙ্গে আহমদ হাসান ইমরানকে বাদ দেওয়ার জন্য মুসলিমদের একটাংশের মনে যদি ক্ষোভ থাকে তাহলে মৌসম প্রার্থী হওয়ার মুসলিম ভোটও অক্ষুন্ন থাকবে । কারণ মৌসম রাজনীতির পরিবার থেকে উঠে আসা মেয়ে । সুতরাং তাঁকে প্রার্থী করা হলে কোনো মহলের কিছু বলার থাকবে না ।

অর্পিতাকে উত্তরবঙ্গের মুখ করার লক্ষ্যেই রাজ্যসভায় পাঠালেন নেত্রী :

অর্পিত ঘোষ মমতার প্রতি অনুরক্ত নেত্রী । গত লোকসভা নির্বাচনে তিনি বালুরঘাটে হেরে যান ।তারপরেও বালুরঘাটের নিবিড় সংযোগ বজায় রেখেছেন এবং দক্ষিণ দিনাজপুরের জেলা সভাপতি হিসাবে তিনি নিজেকে উজাড় করে সংগঠন করেছেন । আমরা দেখতে পাচ্ছি গত লোকসভা নির্বাচনে সবচেয়ে খারাপ ফল করেছিল তৃণমূল উত্তরবঙ্গে । তাই উত্তরবঙ্গের জমি ফিরে পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন নেত্রী। তিনি বারবার উত্তরবঙ্গে যাচ্ছেন , সেখানে সভা করছেন , নিবিড় সংযোগ স্থাপন করছেন । আরও নিবিড় সম্পর্ক গড়া্র লক্ষ্যে এবার অর্পিতাকে রাজ্যসভায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন মমতা ।

সব দিক বিচার করে এটা বলতে হয় রাজ্যসভায় মমতা যাঁদেরকে মনোনয়ন দিলেন তাঁদেরকে সামনে রেখে দলকে, দলীয় কর্মীদের এবং সাধারণ মানুষকে বার্তা দিলেন তৃণমূল নেত্রী । যে বার্তায় স্পষ্ট করলেন , আমি তোমাদেরই লোক ।


শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সম্পর্কিত নিবন্ধ

Leave a Comment