কলকাতা 

রবীন্দ্র ভারতীতে বসন্ত উৎসবে অশ্লীলতার নিন্দায় সরব বাংলার বুদ্ধিজীবীরা

শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বাংলার জনরব ডেস্ক : রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘বসন্ত উৎসব’ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানকে ঘিরে অশ্লীলতার অভিযোগ উঠেছে । যা নিয়ে বাংলা জুড়ে প্রতিবাদে গর্জে উঠেছে বুদ্ধিজীবী মহল । রবীন্দ্রনাথের গান বিকৃতি করে যা হয়েছে তা এক কথায় নিন্দনীয় ।

রবীন্দ্রভারতীর উপাচার্য সব্যসাচী বসু রায়চৌধুরী শুক্রবার বিষয়টিকে দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেছেন।তিনি বলেন, ‘‘বসন্ত উৎসবের সূচনা স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ করেছিলেন। সেইধারা মেনে আমরা রবীন্দ্রভারতীতে বসন্ত উৎসব পালন করি। কাজেই সেখানে যদি এ রকম কিছু ঘটনা ঘটে, তার থেকে দুঃখজনক কিছু আর হতে পারে না। এই সব ছবির সত্যতা যাচাই করার ক্ষমতা আমাদের নেই। পুলিশ এই ছবির সত্যতা যাচাই করে নেবে।’’ এর পাশাপাশি তিনি বলেন, ‘‘বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফে কর্মসমিতিতে আমরা আলোচনা করব। আদৌ আর কখনও বসন্ত উৎসব পালন করতে পারব কি না, সেখানে বহিরাগতদের আদৌ প্রবেশাধিকার দেব কি না, সবটা নিয়েই আলোচনা হবে।’’

কিন্তু বিতর্কিত ছবিগুলি সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তুলে দেওয়ার পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য অধ্যাপকরা একে একে মুখ খুলতে শুরু করেছেন। অধ্যাপকদের অধিকাংশই নাম প্রকাশ করতে চান না। প্রকাশ্যে মুখ খুললে তৃণমূল ছাত্র পরিষদের (টিএমসিপি) রোষে পড়তে হতে পারে, এই আশঙ্কা করছেন কেউ কেউ। কোনও অধ্যাপক আবার বলছেন, ‘‘নিজের প্রতিষ্ঠান তো, তাই এ নিয়ে ফলাও করে মতামত দিতে যাওয়া উচিত হবে না।’’ তবে রবীন্দ্রসঙ্গীতের বিকৃতি ঘটানো, অশ্লীল শব্দ পিঠে লিখে ছবি তোলা-সহ যে সব কাণ্ড নিয়ে তুমুল হইচই শুরু হয়েছে, কোনও দ্বিধা ছাড়াই তার নিন্দা করছেন প্রত্যেকে।

রবীন্দ্রভারতীর এক স্বনামধন্য অধ্যাপকের কথায়, ‘‘এই বসন্ত উৎসব ছিল ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকদের অনুষ্ঠান। শিক্ষকদের নিয়ন্ত্রণে হতঅনুষ্ঠানটা। অত্যন্ত নান্দনিক এবং রুচিশীল একটা অনুষ্ঠান হত। তৃণমূল ছাত্র পরিষদ সেই অনুষ্ঠানটাকে বাজারি করে তুলল। পুরো বসন্ত উৎসবের নিয়ন্ত্রণ ছাত্র সংসদ নিজেদের হাতে নিল। বিপুল সংখ্যক পাস ছাপিয়ে তা বিলি করতে লাগল। আশপাশের প্রচুর কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়দের মধ্যে সেই পাস বিলিয়ে রবীন্দ্রভারতীর বসন্ত উৎসবে রবীন্দ্রভারতীকেই সংখ্যালঘু করে দিল। যে বছর থেকে এই কাণ্ড শুরু হল, সেই বছর থেকেই বসন্ত উৎসব নিয়ে তুমুল বিতর্ক হচ্ছে। প্রত্যেক বছর নানা আপত্তিকর ঘটনা ঘটছে।’’ ওই অধ্যাপকের কথায়, ‘‘রবীন্দ্রভারতীর বসন্ত উৎসবকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক লাভ তুলতে চায় তৃণমূল ছাত্র পরিষদ। প্রত্যেক বছর নিখরচায় যা খুশি করার জন্য একটা ক্যাম্পাস খুলে দিয়ে বিভিন্ন কলেজে তৃণমূল ছাত্র পরিষদ নিজেদের সমর্থন বাড়াতে চাইছে।’’

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দিকে তথা উপাচার্যের দিকেও আঙুল তুলছেন কেউ কেউ। তাঁদের মধ্যে এক অধ্যাপকের কথায়, ‘‘বসন্ত উৎসবের নিয়ন্ত্রণ ছাত্র সংসদ নিজের হাতে নিতে চাইল, আর কর্তৃপক্ষও দিয়ে দিলেন, এটাই সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক। বসন্ত উৎসবের মতো একটা অনুষ্ঠান, যা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের গর্ব ছিল, তাকে কাজে লাগিয়ে একটি ছাত্র সংসদকে রাজনৈতিক ভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ দেওয়া হল। তাতে যা হওয়ার, তাই হচ্ছে।’’

রবীন্দ্রভারতীর সাংবাদিকতা বিভাগের প্রধান দেবজ্যোতি চন্দ অবশ্য ছাত্র সংসদের উপরে পুরোপুরি দোষ চাপাতে রাজি নন। তাঁর কথায়, ‘‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষক এবং পড়ুয়ারা মিলে গত এক মাস ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করে একটা দারুণ অনুষ্ঠান সাজিয়েছিলেন। ছাত্র সংসদও অবশ্যই চেয়েছিল যে, বসন্ত উৎসব খুব ভাল ভাবে মিটুক। কিন্তু বাইরে থেকে হাজার হাজার ছেলেমেয়ে যাঁরা ঢুকলেন, তাঁরা অনেকেই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতি জানেন না। দারুণ একটা অনুষ্ঠানকে তাঁরা শেষ করে দিলেন।’’

তৃণমূল ছাত্র পরিষদ অবশ্য যাবতীয় অভিযোগ ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করছে। সংগঠনের সহ-সভাপতি মণিশঙ্কর মণ্ডলের কথায়, ‘‘যে ঘটনা বসন্ত উৎসবে ঘটানো হয়েছে, তাকে তৃণমূল ছাত্র পরিষদ একেবারেই সমর্থন করে না। এর সঙ্গে তৃণমূল ছাত্র পরিষদের কারও কোনও যোগ নেই। যারা এ সব নোংরামি করেছে, তাদের চিহ্নিত করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং প্রশাসন উপযুক্ত ব্যবস্থা নিচ্ছে।’’ কিন্তু তৃণমূলের জমানায় বসন্ত উৎসবের নিয়ন্ত্রণ ছাত্র সংসদের হাতে যাওয়ার পর থেকেই এই সব কাণ্ড ঘটছে বলে যে অভিযোগ উঠছে, তা নিয়ে কী বলবেন? মণিশঙ্করের কথায়, ‘‘ও সব অভিযোগ ভিত্তিহীন।’’

সাহিত্যিক তিলোত্তমা মজুমদার এই ঘটনাকে বিকার হিসেবেই দেখছেন। তাঁর কথায়‘‘এ এক গণবিকার। ঠিক যে মানসিকতা থেকে নিজেই নিজের মরণের ছবি সামাজিক মাধ্যমে দিচ্ছে কেউ কেউ, অৰ্থহীন হননের মানসিকতা, যা স্বার্থপর, যা কেবল দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করে, আকর্ষণের সারবত্তা নিয়ে ভাবে না। সমাজের সর্বত্র এই ধ্বংস আমরা দেখছি। অধর্ম, কুরাজনীতি ও অপসংস্কৃতির নীতিহীন সহাবস্থান। যারা এর বীজ বপন করতে চায়, তারা সহজ লক্ষ্য হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নির্বাচন করে।’’

 

 

 


শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সম্পর্কিত নিবন্ধ

Leave a Comment