অন্যান্য 

সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতই গণতন্ত্রে এক এবং একমাত্র বিষয় হিসাবে ‘বিবেচ্য’ হতে পারে না : ড. আবদুস সাত্তার

শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

প্রধান সেবক ,সেবক , স্বয়ং সেবকগণের কাছে ‘পাকিস্তান’ খুব প্রিয় শব্দ । যে কোনো সরকারি নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলেই পাকিস্তান ও তার অনুষঙ্গযুক্ত নানা কথার ফুলঝুরি । শত মুখে সহস্রভাবে মানুষের কান-মনকে ঝালাপালা ও ঝাপসা করতে থাকে ।আর নামটি যদি সাদাব জাফর কিংবা জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া অথবা আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীর হয় , তাহলে তো সোনায় সোহাগা! অনায়াসেই বিধান দেওয়া হয় ‘ পাকিস্তান চলে যাও’ । শুধুই কি তাই, সংবিধানের নামে শপথ গ্রহণ করে কিংবা ‘ গণতন্ত্রের মন্দিরে’র( দেশের ধর্মনিরপেক্ষতা , বহুত্ববাদের এক অনন্য প্রতীক সংসদকে এখন এই নামেই চিহ্নিত করা হচ্ছে)। প্রবেশদ্বারে মাথা নত / প্রণাম করে দেশের প্রধান সেবক নির্বাচনী প্রচারে যখন গর্জে ওঠেন এই বলে যে , রামজাদে-হারামজাদে , অথবা পোশাক দেখলেই সহজেই চিহ্নিত করা যায় তখন মুখ আর মুখোশ সব মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় । আর আচ্ছে দিন নয় , ২০০২ সালের গোধরা কান্ডের চেহারা , চরিত্র যেন ফুটে উঠতে থাকে । রাজত্ব করো ,ধর্ম পালন করো । এই তো তব রাজধর্ম!

শুধু কি তাই ? ‘শহুরে নকশাল’ ‘টুকড়ে টুকড়ে গ্যাং’ ‘উচ্ছ্বঙ্খল উপাদান’, ‘ প্রতিবাদী চরিত্র’ নানা উপমায় চিহ্নিত করে প্রতিবাদ প্রতিরোধের শক্তিকে দেশের সেবকবৃন্দ কালিমালিপ্ত করে চলেছেন । নোট বন্দী , গব্বর সিং ট্যাক্স ( জিএসটি), ৪৫ বছরে দেশের সর্বাধিক বেকারত্ব ,রাষ্ট্রায়ত্ত্ব সংস্থাগুলির নির্বিচারে বিলগ্নীকরণ , জিডিপি বৃদ্ধির হার সর্বনিম্ন , জিনিসপত্রের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি , পেট্রোল ডিজেলের আকাশ ছোঁয়া দর , বিশ্ববিদ্যালয়গুলির স্বায়ত্ত্বশাসন খর্ব-সব মিলিয়ে স্বাধীনোত্তর ভারতের ইতিহাসে দেশের মানুষ এই ধরনের সামাজিক-অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি আগে হয়নি । অথচ তথাকথিত রাজনৈতিক হিন্দুত্বের ধ্বজাধারীরা ‘পুরাতন ছাতকুড়ো ঘ্রাণ দিয়ে ‘ গঙ্গা ফড়িঙের মতো উদ্বাহু’ নৃত্য করে চলেছেন ।  তিন তালাকের অপরাধীকরণ , জম্মু-কাশ্মীর নামক একটা আস্ত রাজ্যকে এক লহমায় ভারতের মানচিত্র থেকে মুছে দেওয়া , রামমন্দির নির্মাণের সপক্ষে রায় সর্বোপরি নাগরিকত্ব আইন সংশোধন – সব মিলিয়ে বিভাজনের সুপরিচিত রাজনীতির মধ্য দিয়ে দেশের মানুষকে এক গভীর অন্ধকার আবর্তে নিমজ্জিত করে দেওয়া হয়েছে । তাই তো প্রধান সেবক সগর্বে ৫৬ ইঞ্চির ছাতি ঠুকে বলতে পারেন , সারা জীবনব্যাপী যা স্বপ্ন দেখেছেন মাত্র ৬ মাসের মধ্যে তা পূরণ করে ফেলেছেন । অতঃপর ‘হৃদয়ের হিম প্রাণায়াম ‘-এর সাহায্যে সাংবিধানিক বিধিবদ্ধ  সমস্ত সংস্থাই এই শক্তির করায়ত্ত ! কোথাও , এক মুহুর্তে জিরিয়ে নিতে দেয় না । এই শক্তি তার বিশ্বখ্যাত ‘ হোয়াটসঅ্যাপ বিশ্ববিদ্যালয়ে’র মাধ্যমে প্রতিবাদী শক্তি , চরিত্রকে সারাক্ষণ ‘ট্রোল’ করে চলেছে । এই শক্তিকে রোধ করে কার সাধ্য ? তাই উত্তরপ্রদেশে যোগীত্বের বেগে পুলিশ যখন প্রতিবাদীদের নিদান দেয় ‘ পাকিস্তান চলে যাও’ তখন সংবিধান বর্ণিত ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে নাগরিকের মৌলিক অধিকার সাংবিধানিক রক্ষাকর্তার হাতে ভূলুন্ঠিত হলেও আমাদের ক্লান্ত করে না । ‘নানা রূপ ক্ষতি ক্ষয়ে নানা দিকে’ মরে গেলেও বুকে সংবিধান ,হাতে জাতীয় পতাকা নিয়ে তবু লালন করে চলেছেএক বিশুদ্ধ সমাজ ।

তাই তো সৃষ্টির নাড়ির স্পন্দনে মানুষ হয়ে মানুষের কাছে জবাব বন্দি ।পরস্পরের প্রতি ঋণশোধ!সূচনা হয়েছে এক নতুন ভোর , অধ্যায়ের । যে , অধ্যায়ের ‘দিগন্ত প্লাবিত বলীয়ান রৌদ্রের আঘ্রাণে’ ‘সবুজ ঘাসের গন্ধ’ বাঘিনীর গর্জন । এই গর্জনে সুর মেলান ধারাভির বস্তিবাসী ,জামিয়া-জওহরলাল-দিল্লি –যাদবপুর-আলিয়া-আলিগড় সহ নামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রী-শিক্ষক-শিক্ষিকা, লেখক-ইতিহাসবিদ, শাহিনবাগ-কলকাতার সাধারণ মধ্যবিত্ত গৃহবধূ-সমাজকর্মী, সিনেমা জগতের খ্যাতনামা ব্যক্তিবর্গ । অহিংসা, গণতান্ত্রিক পথে সমাজের নানা শ্রেণির মানুষ হাতে প্ল্যাকার্ড, পথসভার মধ্যে দিয়ে ‘দেশ রক্ষা’র লড়াইয়ে ব্রতী হয়েছে , এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে , এই লড়াই আন্দোলনের নেতৃত্বে রয়েছে দেশের ছাত্র-যুব সমাজ । একথা কে না জানে , দেশ ও জাতির সংকট মুহূর্তে তারাই তো অগ্রণী সৈনিক । মন্ডল কমিশন , দুনীর্তি বিরোধী লড়াইয়ের দিনগুলিতে ছাত্র যুব’র লড়াই তো স্বর্ণাক্ষরে ইতিহাসের পাতায় মুদ্রিত ।

গণতন্ত্র,গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা ভিন্নমতের মাহাত্ম্য ও গুরুত্ব অনস্বীকার্য । ভোটতন্ত্রের ক্ষমতার জোরে তা কখনোই কেড়ে নেওয়া যায় না । গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনায় যে কোনো রাজনৈতিক দল তার কার্যকর্তাদের মনে রাখতে হয় , আজ যারা সীমাহীন ক্ষমতার অধিকারী অনাগত ভবিষ্যতে তারা ক্ষমতাহীনও হতে পারে । ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনায় ৪০৫ সাংসদের ক্ষমতাসীন সরকারও পরবর্তী নির্বাচনে পর্যুদস্ত হয়েছে । স্বাভাবিকভাবেই আজ যা সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত বলে ‘ গোদী মিডিয়া’য় দিন রাত ঝংকৃত হচ্ছে । আগামী দিনে তা সংখ্যালঘিষ্ঠ মত বলে চিহ্নিত হবে । তাই সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতই গণতন্ত্রে এক এবং একমাত্র বিষয় হিসাবে ‘ বিবেচ্য’ হতে পারে না । কেউ নিয়মের ব্যতিক্রম নয় । যন্ত্রণার হলেও একথা সত্য যে , শাসনব্যবস্থা ‘ ক্ষমতার তন্ত্রই’ আজ মহান হয়ে জাতির জীবনে হাজির হয়েছে । এই তন্ত্রই প্রতিবাদের ভাষা, প্রতিরোধের পথকে নিজেদের মতো করে নির্ধারণ করে দিতে চাইছে । সৌজন্যে : কংগ্রেস বার্তা।


শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সম্পর্কিত নিবন্ধ

Leave a Comment