প্রচ্ছদ 

ঈদুল ফিতরের তাৎপর্য : মাওলানা সিদ্দীকুল্লাহ চৌধুরী

শেয়ার করুন
  • 13
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

 মাওলানা সিদ্দীকুল্লাহ চৌধুরী :

ঈদের অর্থ খুশি যা বার বার ঘুরে ঘুরে আসে।যেহেতু ঈদের সময় আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা সকলেই খুশিতে মাতোয়ারা হয় তাই এই উৎসবকে ঈদ বলা হয়।দীর্ঘ এক মাস রোজা(দিবসের নির্জলা উপবাস)রাখার পর দিবসে ইচ্ছার ভিত্তিতে খাদ্য খাওয়ার অনুমোদনকে ফিতর (প্রাতরাশ) বলা হয়। যার অর্থ দাঁড়ায় দীর্ঘ এক মাস দিনের বেলা নির্জলা উপবাস করার পর দিনের বেলায় খাওয়ার অনুমতি। রমযান মাস ধৈর্য ,সংযম ও আত্মশুদ্ধির মাস। এই মাসে বেশি বেশি করে পুণ্যের কাজ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকতে সর্তক করা হয়েছে। কোনো মুহুর্ত যেন বৃথা না যায় সেদিকে মনোনিবেশ করতে বাধ্য করা হয়েছে। রোজা করে খাওয়া দাওয়া বর্জন করে যেমন অভুক্ত ব্যক্তির জ্বালা-যন্ত্রণা,কষ্ট অনুভব করতে পারে এবং অন্যের ক্ষুধার প্রতি সহানুভুতিশীল হতে পারে। সেইরূপ অপরের পরনিন্দা,পরচর্চা,গীবতগিল্লা,অত্যাচার,কুকথা থেকে বেঁচে চলতে হয়। রোজা আল্লাহর ইবাদতের সঙ্গে একটি শারীরিক যোগসাধনাও বটে। একমাস রোজা করার পর মুসলমান যখন ঈদের খুশিতে মাতোয়ারা হয়- এই সংযমী পরিবেশ স্থায়ী করার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে অপর গরীব-দুঃখী,অসহায়-এতীমদের সহানুভুতি- সহযোগিতার জন্য ফিতরা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যাতে এই খুশিতে সকলে সমানভাবে শরিক হতে পারে: খাওয়া দাওয়া,পোশাক-আশাকে নবীনতার ছাপ আসতে পারে। রোজার মূল উদ্দেশ্য হল আল্লাহ ও তাঁর প্রিয় নবীসা.- এর সান্নিধ্য, জাহান্নাম থেকে মুক্তি এবং জান্নাতের বুক ভরা আশা।

পৃথিবীতে মানুষের আগমনের প্রারম্ভ থেকেই অর্থাৎ হযরত আদম আ.-এর সময় থেকেই ঈদের প্রচলন। তবে তখন ঈদ উদযাপনের পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া ভিন্ন ছিল। প্রিয় নবী সা. মক্কা থেকে হিজরত করে মদীনায় আসার পরে ঈদের নামাযের সূচনা হয়। রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন.লিকুল্লি কাওমিন ঈদুন ওয়া হাযা ঈদুনা।(প্রত্যেক জাতির জন্য খুশির দিন আছে, আর এটা হল আমাদের খুশির দিন)। নবী করীম সা. মসজিদে নববীর পরিবর্তে সাহাবীদের নিয়ে খোলা ময়দানে ঈদের নামায পড়েছিলেন। এটাই হুজুর সা.-এর সুমহান সুন্নাত(আদর্শ)। বিনা কারণে মসজিদে ঈদের নামায না পড়া ভাল।ঈদের আদবের মধ্যে ঈদুল ফিতরের দিন সকলের সঙ্গে ভাব বিনিময় করা,ঈদের নামাযে যাওয়ার আগে উত্তম, পরিস্কার পরিচ্ছন্ন বস্ত্র পরিধান করা, মিষ্ঠি দ্রব্য খাওয়া,পায়ে হেঁটে যাওয়া,এক পথ দিয়ে ঈদগাহে যাওয়া অপর পথ দিয়ে বাড়ি ফেরা,মনে  মনে তাকবীর(করুণাময় আল্লাহর বড়ত্ব ওমহত্ব) পড়তে পড়তে যাওয়া এবং ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে সদকায়ে ফিতর আদায় করা অর্থাৎ একমাস রোজা আদায় করার খুশিতে আল্লাহর পথে গরীবদের নিয়মমাফিক(মাথা পিছু ৪৫ টাকা) দান করা। হাদীসে বর্ণিত আছে,কারো উপর সদকাতুল ফিতর আবশ্যিক হওয়া সত্তেও ( জাকাতের সম পরিমাণ নিসাব ঈদুল ফিতরের দিন সুবহে সাদিকের(উষা) সময় বিদ্যমান থাকলে) আদায় না করে তবে সেই ব্যক্তির রোজা আসমান ও যমীনের মাঝে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকে। ঈদের ময়দানে একত্রিত হয়ে একে অপরের অবস্থা সম্পর্কে,স্বাস্থ্য সম্পর্কে অবগত হতে পারে এবং ইমাম সাহেব ঈদের দিনের গুরুত্ব আরোপ করে ঈদের বিশ্লেষণ ও তাৎপর্য নিয়ে বায়ান প্রদান করেন; বিশ্বভ্রাতুত্বেরও একে অপরের সহানুভুতি ও সহযোগিতার বাতাবরণ তৈরির নির্দেশিকা দেন। একই দেশে থেকে ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে অটুট থেকে ভারতীয় নাগরিক হয়ে বসাবস করার তাগিদ দেন। অন্যায় কাজ করব না, তাতে সহযোগিতা করব না,দেশদ্রোহিতা করব না – এই বিষয়েও নির্দেশিকা দেন। তারপর ছয় তকবিরসহ দুই রাকাত ওয়াজিব নামায কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আদায় করেন। তাতে ধনী-গরীব,বাদশাহ-ফকির,সাদা-কালোর কোনো ভেদাভেদ থাকে না। নামাযের পর খুৎবা(আরবী ভাষায় ভাষণ) সকলেই ধৈর্য সহকারে শোনেন।  বক্তব্য শুনে মুসল্লীরা দৃঢ়-প্রতিঞ্জ হন যে, আগামীতে পূণ্যের কাজেতে সম্পূর্ণভাবে নিমগ্ন থাকব।,অন্যায় কাজের ফাঁদে পা দেব না,নিজেকে বিশুদ্ধ রাখব, আল্লাহরতায়ালার প্রিয়পাত্র হব এবং মানুষের কাছেও সম্মানীয় হব।খুৎবার শেষে ইমাম সাহেব সকলের সফলতা চেয়ে বিশ্বজাহানের মঙ্গল কামনার্থে দোয়া করেন। ভায়ে-ভায়ে যে ঝগড়া, বন্ধুতে বন্ধুতে যে দুরত্ব তা মিটিয়ে ফেলা হয়। ঈদের দিনে যেন নতুন যুগের সূচনা হয়।

এই রমযান মাসেই অর্থবানেরা গরীব-অসহায়দের জাকাত প্রদান করে থাকেন। যেহেতু অন্য মাসের তুলনায় এই মাসে ৭০গুণ সওয়াব(পূণ্য) বৃদ্ধি পায়। ইসলামে নির্দেশ রয়েছে যে, নির্দিষ্ট পরিমাণ উদবৃত্ত সোনা,রূপা,ব্যবসার মাল,নগদ টাকার এক বছর যাবত সঞ্চয়ের ভিত্তিতে মোট সঞ্চিত সম্পদের২.৫% আল্লাহর উদ্দেশ্যে গরীবদের প্রদান করতে হবে। তাই প্রকৃত মুসলমানরা কড়ায়-গন্ডায় জাকাত আদায় করে থাকেন। গরীবদেরকে অকুণ্ঠ সহযোগিতা করে থাকেন। জাকাত দেওয়ার ফলে বহু গরীব,অসহায়,দুঃস্থ ব্যক্তি যারপরনাই উপকৃত হন। এই জাকাত ও ফিতরার মাধ্যমে বড় বড় দ্বীনি(ধর্মীয়) প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয়ে থাকে। তবে জাকাতের নামে ফান্ড তুলে আল্লাহ কর্তৃক নির্দেশিত খাত ব্যতিরেকে অন্যত্র ব্যয় করা যায়েজ নয়( ফতোয়ায়ে মাহমূদীয়া,ফাতোয়ায়ে রহিমীয়া)। আশা হয়,বার বার এই রমযান ও ঈদ আসুক। আল্লাহ আমাদের মনের কালিমা ও পাপরাশি ধুয়ে মুছে সাফ করে দিন।  সকলকে আল্লাহ তাঁর নির্দেশ মোতাবেক জাকাত,ফিতরা আদায় করার সক্ষমতা দান করুন। ঈদের খুশি ছড়িয়ে পড়ুক বিশ্বজুড়ে।

( লেখক: দেশের বিশিষ্ট আলেম, সভাপতি প.ব. রাজ্য  জমিয়তে উলামা হিন্দ এবং রাজ্যের গ্রন্থাগার ও জনশিক্ষা দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রী )


শেয়ার করুন
  • 13
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সম্পর্কিত নিবন্ধ

Leave a Comment