কলকাতা 

প্রান্তজ মানুষের প্রেরণা সম্প্রীতি আকাদেমি

শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শেখ আব্দুল মান্নান: স্বাধীন ভারতে সমাজের প্রান্তজ শ্রেণীর মানুষের সার্বিক উন্নয়নে সরকারি বেসরকারি ভাবে যা পদক্ষেপ এযাবৎ নেওয়া হয়েছে তা যে প্রয়োজনের তূলনায় অপ্রতুল তা বলাই বাহুল্য। তাই এক শ্রেণীর শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ তাদের কল্যাণ কামনায় এগিয়ে এসেছে বিভিন্ন কার্যসূচি নিয়ে। বিশেষ করে নানা প্রতিকুলতার মধ্যে দিয়ে শিক্ষা দীক্ষা সঙ্স্কৃতি চর্যা চালিয়ে আসা প্রান্তজ মানুষদের মূল স্রোতের সাথে মিশিয়ে দেওয়াই তাদের অন্যতম লক্ষ্য। কলকাতা শহরে তেমনই উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠান ‘সম্প্রীতি আকাদেমি’। ২০০১ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি সমাজে গুণিজনের সমাদরের পাশাপাশি প্রান্তজ মানুষের সাঙ্স্কৃতিক, শৈক্ষিক ও সামাজিক উন্নয়নের দায়বদ্ধতাও পালন করে আসছে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে। যার স্বীকৃতি স্বরূপ প্রতি বছর ৩০ জুন আর ৩০ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠানের কলকাতার হরিদেবপুর কেওড়াপুকুর সুকান্তপল্লী স্থিত ‘মিলনবীথি মনজিল’এ আয়োজিত হয় ভাবগম্ভীর অনুষ্ঠান। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
গত ৩০ ডিসেম্বর ২০১৯ প্রতিষ্ঠানের উপরোক্ত স্থায়ী মনজিলে আলোচনা, সম্মাননা ও গ্রন্থ-প্রকাশ সহ এক প্রাঞ্জল অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। রুচিশীল অনুষ্ঠানের সূচনায় পরিবেশিত হয় সুমধূর বাশির ধূন। পরিবেশন করেন শিল্পী নিবিড়দেব শর্মা। সঙ্গে মনোমুগ্ধকর রবীন্দ্র সঙ্গীত পরিবেশন করে অনুষ্ঠানের গড়িমাকে বাড়িয়ে দেন শিল্পী লরেন্স অধিকারী ও মনামী মিদ্দে।
এরপরেই প্রথম পর্বের মূল অনুষ্ঠান শিক্ষাবিদ আশিস বড়ুয়ার সভাপতিত্বে আয়োজিত আলোচনা সভা ঋদ্ধ করে উপস্থিত দর্শক শ্রোতাদের। ‘বাংলা সাহিত্যে ফাদার দ্যতিয়েন’ শীর্ষক আলোচনা সভায় মূলত ফাদার দ্যতিয়েন একজন বিদেশী অবাঙালি হয়েও বাংলা ভাষা সাহিত্য সঙ্স্কৃতি হৃদয়ঙ্গম করে কিভাবে তাকে সমৃদ্ধ করেছিলেন- এটাই ছিল আলোচনার মুখ্য বিষয়। নানা তথ্য সমৃদ্ধ তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে এদিন আলোচনার পরিপূর্ণতা এনেছিলেন অধ্যাপিকা অদৃজা রায় এবং অধ্যাপক সুশীল সাহা। সুশীল সাহা তাঁর মূল্যবান বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে ফাদার দ্যতিয়েনের সাহচর্য লাভের দিকটিও পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করেন।
আলোচনায় অংশ নিয়ে অনুষ্ঠানের সঞ্চালক তথা প্রতিষ্ঠানের প্রাণপুরুষ ড . সুরঞ্জনা মিদ্দে বলেন ফাদার দ্যতিয়েন সম্পর্কে যা কিছু বৌদ্ধিক আলোচনা শুধু বাংলা ভাষা সঙ্স্কৃতিকেই সমৃদ্ধ করে তা নয়। পাশাপাশি ফরাসি ও ইংরেজি ভাষা সাহিত্যের সৌকর্য বৃদ্ধিতে
ফাদার দ্যতিয়েনের অবদানকেও সম্মান জানানো হয়। সভাপতির ভাষণে আশিস বাবু দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত ফাদার দ্যতিয়েনের ‘ডাইরির ছেড়া পাতা’ সম্পর্কে প্রাঞ্জল আলোচনা করেন।
প্রসঙ্গক্রমে তিনি রবীন্দ্র সঙ্গীতের প্রতি ফাদার দ্যতিয়েনের গভীর অনুরাগের দিকটিও তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার বিভাগীয় প্রফেসর ড . সুরঞ্জন মিদ্দে রচিত নান্দনিক প্রকাশিত মূল্যবান গ্রন্থ ‘দোম আন্তনিও’র আনুষ্ঠানিক মোড়ক উন্মোচন করেন আকাদেমির সভাপতি ভিক্ষু সুমনপাল। এখানে উল্লেখ্য দোম আন্তনিও কোনো বিদেশির নাম নয়। তিনি বঙ্গ সন্তান। তিনি ছিলেন বাংলা গদ্যের প্রথম লেখক, বাংলা অভিধানেরও রচয়িতা। দোম আন্তনিও সম্পর্কে গভীর অধ্যয়নের পর তাঁর সঙগ্রাম ও সৃষ্টিই তাঁকে এই গ্রন্থটি রচনায় উদ্বুদ্ধ করেছে বলে ড . মিদ্দে মনে করেন।
অনুষ্ঠানের তৃতীয় পর্বটি ছিল গুণিজন সম্মাননায় সমৃদ্ধ । সম্প্রীতি আকাদেমি জন্মলগ্ন থেকেই সমাজের বিভিন্ন স্তরের গুণির সমাদর জানিয়ে আসছে। বিশেষ করে সমাজের প্রান্তজ শ্রেণীর গুণিকে সম্মানিত করে তারা নিজেদের ধন্য করে আসছে। সেই ধারাকে অক্ষুন্ন রেখেই এবারও ৩ জন ব্যক্তি বিশেষকে তাঁদের ক্রিতকর্মের স্বিকৃতি স্বরূপ সম্মাননা জ্ঞাপন করেছে তারা। এদের মধ্যে সমাজসেবী শিক্ষাবিদ সোমা মুখোপাধ্যায়কে ‘সুফিয়া খাতুন সম্মান’, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তথা ‘কীর্তনকথা’ গ্রন্থের প্রনেতা জয়ন্ত রায়কে ‘সম্প্রীতি আকাদেমি সম্মান’ এবং বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ও লিটিল ম্যাগাজিন ‘ইয়ার বুকের’ রূপকার জাহিরুল হাসানকে প্রদান করা হয় ‘ফাদার দ্যতিয়েন’ সম্মান। পুষ্প, স্মারক, উত্তরিও, মানপত্রে সম্মানিত হয়ে তাঁরা স্বল্প কথায় নিজেদের অনুভূতি ব্যক্ত করেন। সম্মানিত অধ্যাপক জয়ন্ত রায় বলেন সম্প্রীতি আকাদেমি সীমিত পরিসরে সম্মাননার যে মহৎ কাজ করে যাচ্ছে তা অনতিবিলম্বে প্রসার লাভ করবে সারা ভারতে। বাংলা লোকগান বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার মতোই বাংলা কীর্তনের প্রকৃত সুর ছন্দ ক্রম বিলীন হয়ে যাচ্ছে। বাংলা কীর্তনের হৃত গৌরব পুনরোদ্ধারের সঙ্কল্প তাঁর এই কীর্তনগাথা গবেষণা গ্রন্থের প্রকাশ।
সম্প্রীতি আকাদেমির বিরল সম্মানে আপ্লুত প্রাবন্ধিক ও প্রাজ্ঞ সমাজ সচেতক জাহিরুল হাসান বলেন- সম্মানের সঙ্গে যখন ভালোবাসা যুক্ত হয় তখন তা আন্তরিক। তিনি বলেন উপেক্ষিত, প্রান্তিক বা প্রান্তজ শব্দাবলি আমি পচ্ছন্দ করি না। তবে প্রান্তজ শ্রেণীর মানুষদের তুলে আনার জন্য সম্প্রীতি আকাদেমি যে কাজ করে যাচ্ছে তা অনবদ্য। সম্প্রীতির ক্ষেত্রে তিনি মনে করেন- ধর্ম আচার সর্বস্ব হয়ে গেলে তা সম্প্রীতিতে বাধার সৃষ্টি করে। এক্ষেত্রে তিনি বলেন এখন আর মাটি খুঁড়ে ইতিহাসের খোজ করা হয়না। এখন ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমেই ইতিহাসের অনুসন্ধান করা হয়। যাকে বলা যায় বিজ্ঞান ভিত্তিক ক্রস কালচার রিলিজিয়ন বা আন্ত:সঙ্স্কৃতি বাদ।
এদিন আকাদেমির তরফে কয়েকজন প্রতিশ্রুতিবান শিক্ষানবিশ গবেষককেও উৎসাহ ব্যঞ্জক সম্মানে সম্মানিত করা হয়। যাদের মধ্যে স্বরস্বতী মুর্মূ, সবলা মান্ডি, মহ: আফরুক শেখ, ড. বিপ্লব মন্ডল প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য।
এদিনের ব্যতিক্রমী অনুষ্ঠানে অমিতাভ বিশ্বাসের স্বাগত ভাষণ এবং অধ্যাপক সন্দ্বীপ হাসদার উদাত্ত কন্ঠে পরিবেশিত কবি দেবেশ ঠাকুরের ‘ভারতবর্ষ’ কবিতা আবৃত্তি এক অনন্যতার দাবিদার। সম্প্রীতি আকাদেমির ভাবগম্ভীর অনুষ্ঠানের সাফল্যের পুরোভাগে যাদের আন্তরিক অবদানকে মান্যতা দিতেই হয় তারা হলেন অধ্যাপক গনেশ হেমব্রম, শুভঙ্কর দে,, মনোজ টুডু, অধ্যাপক স্বর্ণাভ বালা, অধ্যাপক মাসুদ রানা, ড . কল্যাণ মীরবর,রূপালী বিশ্বাস, ড . বৃন্দাবন মন্ডল, সহদেব দাস, হাবিবুর রহমান, মিরাজুল ইসলাম প্রমুখ।


শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সম্পর্কিত নিবন্ধ

Leave a Comment