অন্যান্য 

ক্ষণিকের রাজনৈতিক ক্ষমতালোভের তাড়নায় ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দলগুলিও কি কখনো সখনো হলেও দক্ষিণপন্থী সাম্প্রদায়িক শক্তিকে নিজেদের জায়গা ছেড়ে দেয়নি কিংবা হাতে ধরে ধর্মনিরপেক্ষ জমিকে সাম্প্রদায়িক শক্তির হাতে চাষযোগ্য করার জন্য তুলে দেয়নি ? : ড. আবদুস সাত্তার

শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

দেশজুড়ে বিজেপি-আরএসএসের তথাকথিত দেশভক্তদের উল্লাসে ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শে বিশ্বাসী মানুষরা দিশেহারা । তবে আশার আলো হিসাবে দেখা দিয়েছে মহারাষ্ট্র ও হরিয়ানা বিধানসভার ফলাফল । সাধারন মানুষ যে আরএসএস –বিজেপির কথিত দেশভক্তির চেয়ে রুটি-রুজির দিকে বেশি নজর দিতে চাইছে তার সংকেত হল এই নির্বাচনের ফলাফল । কিন্ত তা সত্ত্বে বলা যাবে না গেরুয়াপন্থীদের দাপট কমে গেছে , বরং বলা যেতে পারে তারা হোঁচট খেয়েছে মাত্র । তাদের আদর্শ ও নীতি এখনও জারি রয়েছে । কীভাবে এল হিন্দুত্বের শ্লোগান নিয়ে দেশের রাজনীতিতে আরএসএসের দাপট ? এর নেপথ্যে কোন কোন রাজনৈতিক দল গোপনে বা প্রকাশ্যে বিজেপিকে মদত দিয়েছে । আরএসএস-বিজেপির শিকড় কীভাবে ধর্মনিরপেক্ষ ভারতবর্ষে প্রবেশ করল তা নিয়ে কলম ধরেছেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ , রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী ও প্রদেশ কংগ্রেসের সাধারন সম্পাদক ড. আবদুস সাত্তার । বাংলার জনরব নিউজ পোর্টালে তা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে । আজ নবম কিস্তি ।

প্রকাশিত অংশের পর …

স্বাধীনতা আন্দোলন , কংগ্রেসের গঠন ও সংখ্যাগরিষ্ঠের পরিচিতির ভিত্তিতে গড়ো ওঠা ভারতীয় জাতীয়তাবাদের এই বিপর্যয়কর পরম্পরা , যা আজ আরএসএস –বিজেপি শাসিত রাষ্ট্রীয় আনুকুল্যে ‘ উগ্র জাতীয়তাবাদ ‘- এর অভিধা লাভ করেছে । স্বাধীনোত্তর ভারতের প্রথম প্রশাসক , স্থপতি হিসাবে জওহরলাল নেহেরু এই বিপর্যয়করপরম্পরাকে অধ্যয়ন করে তার গভীরে প্রবেশ করতে সমর্থ হয়েছিলেন । জাতীয়তাবাদের এই ঐতিহ্য ও পরম্পরায় নেহেরু অস্বস্তিবোধ করলেও  সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এই পক্ষপাতমূলক , হুদয়তন্ত্রীতে বাসা বাঁধা শেকড়কে সমূলে উৎপাটন করতে সক্ষম হননি । ‘ নিয়তির নিপীড়নে’র প্রবক্তা হয়তো জানতেন যে দলের তিনি প্রতিনিধিত্ব করছেন ,সেই দলেই উচুঁ আসন অলঙ্কৃত করে রয়েছেন পন্ডিত মদনমোহন মালব্য ও পুরুষোত্তম দাস টন্ডন –এর মতো মানুষ । তবু ,দীর্ঘ ১৭ বছরের প্রশাসন কালে ধর্মনিরপেক্ষতা ও অস্পৃশ্যদের সমানাধিকার তাঁর অক্ষয় , অমর কীর্তি হিসাবেই ইতিহাস , সমাজ –মানসে সুরক্ষিত । না- হলে উগ্র জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে আজ যে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ , লড়াই – আন্দোলন-এর  যে পরিসর তার বিন্দুমাত্র সুযোগ হয়তো পাওয়া যেত না । ‘ কারেন্ট ‘ পত্রিকার সম্পাদক ডিএফ কারকার –এর লেখনিতে তারই প্রতিধ্বনি – ‘ নেহেরু যদি এতটুকু দূর্বলতা দেখাতেন , তাহলে ওই সব শক্তি ভারতকে এক হিন্দুরাষ্ট্রে পরিণত করত যেখানে সংখ্যালঘুদের জীবনে নিরাপত্তা আর সুরক্ষা বলে কিছুই থাকত না ।’ অস্পৃশ্যদের পূর্ণ অধিকার –এর প্রশ্নেও তিনি ছিলেন আপোষহীন – ‘ এই ধর্মনিরপেক্ষ ভারতীয় রাষ্ট্রের জনজীবনে এবং সমস্ত সরকারী প্রক্রিয়ায় মানুষে মানুষে সমতা পূর্ণমাত্রায় যেন বজায় থাকে ’।

১৯৪৭ সালের ৭ ডিসেম্বর , রবিবারের দিন রামলীলা ময়দানের সভায় সরসংঘচালক ‘ গুরু ‘ গোলওয়ালকার জোরের সঙ্গে উচ্চারণ করেছিলেন ,  ‘ আমাদের লক্ষ্য হল হিন্দু সমাজের সংহতি প্রতিষ্ঠা করা । এই আদর্শকে সামনে রেখে আরএসএস কুচকাওয়াজ করতে করতে এগিয়ে চলবে ,  কোনও ব্যক্তি , কারও কর্তৃত্বই তাকে ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না ।’ ‘ গুরু’র বাণীকেই তাঁর শিষ্যরা ছলে-বলে-কৌশলে ,আপোষ –সমঝোতায় বাস্তব রূপদানে সক্ষম হয়েছেন । নেহেরু ‘র মৃত্যুর পর ধর্মনিরপেক্ষতা তার চরিত্র-স্বাতন্ত্র্যে দূর্বল হয়েছে । পরিবর্তে ক্ষমতার মন্ত্রই হয়ে উঠেছে শাসকের শাসনভূমি । ‘ কোনও ব্যক্তি , কারও কর্তৃত্বই ‘ আর এই উগ্র জাতীয়তাবাদকে ঠেকিয়ে রাখতে সমর্থ হলেন না । এই দূর্বলতার সুযোগে রামমনোহর লোহিয়া উচ্চারিত ‘ প্রত্যাবর্তনের দিনগুলিতে ধর্মান্ধরা প্রায়শই ছিচকে চোরের মতো উদার , অসাম্প্রদায়িক মানুষদের মধ্যে প্রবেশ করে হিন্দুত্বের কানাগলিতে টেনে আনার অবিরাম চেষ্টা করতে থাকে । সব সময় তা বাধাও দেওয়া যায় না । সমঝোতা বা আপোষ পুনরায় অতীত ইতিহাসের ভুলের পুনরাবৃত্ত করতে চায় ।’  ভারত-ইতিহাসে সেই ভুলেরই কী পুনরাবৃত্তি বারংবার হয়ে চলেছে ? পুতুলনাচের এই ইতিকথায় কারা পুতুল , কে বা কারা অদৃশ্য সুতোর টানে নাচানোর সঙ্গী হয় ? তাই কি পুনরাবৃত্ত হতে থাকে দেশভাগ-জাত ‘ তমস’-এর দিনগুলি ? কখনো তা ১৯৮৪-র শিখ দাঙ্গা অথবা ২০০২ সালে গুজরাট গণহত্যার মধ্যে ‘ স্মৃতির পটে জীবনের ছবি ‘ ( ? ) হয়ে ফিরে আসতে থাকে । হয়তো মরণেরও। তৈরি হয় দাঙ্গার ইতিবৃত্ত । দাঙ্গার পর দাঙ্গা । ক্লেদাক্ত , রক্তাক্ত ভয়ঙ্কর দাঙ্গার রূপ আর ‘ অস্পৃশ্য’দের ব্রাম্ভণায়নের রাজনীতি-ও মানুষের অধিকার বেঁচে থাকার লড়াইয়ে এক মস্ত দেওয়াল তৈরি করতে সমর্থ হয় । দলিতদের ‘ হিন্দুত্বে’র শৃঙ্খলে আবদ্ধ করার  আর,এস.এস-র ‘ সামাজিক সমরাস্তা ’ সংগঠন ও সামাজিকতার পথে এক মস্ত  বড়ো অন্তরায় হয়ে ওঠে । তারই প্রমাণ গুজরাটের উনা । তাই এই একুশ শতকীয় ভারতে ধর্মনিরপেক্ষতার মহান আদর্শ-ঐতিহ্য ও মনুষ্যত্ব রক্ষার লড়াই আবার নতুন  করে শুরু করতে হয় । সামিল হ’ন দেশ-বিদেশের অগ্রগণ্য , স্বনামধন্য লেখক –শিল্পী, শিক্ষাবিদ-বুদ্ধিজীবী , ধর্মনিরপেক্ষ মনুষে ; হৃত গণতন্ত্র পনুরুদ্ধারের লক্ষ্যে দেশের নাম করা সমস্ত শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান। ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া দ্বন্দ্ব ,প্রগতির লড়াই পায় এক অনন্য মাত্রা ।

এ-বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই যে , এই উগ্র জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক ভিত্তি প্রোথিত হয়ে রয়েছে দক্ষিণপন্থী , অসহিষ্ণু সাম্প্রদায়িক রাজনীতির হৃদয়তন্ত্রীতে । কিন্ত সমাজবাদী , রাজ্যে রাজ্যে শাসন ক্ষমতায় স্থিত  ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনৈতিক দলগুলি অথবা বামপন্থীরা ?তারা-ও কি সর্ম্পূণ এর থেকে  মুক্তি পেতে পারেন ? মনুষ্য শরীরের নাভিমূলে উগ্র জাতীয়তাবাদ যে তার শেকড় গভীরভাবে প্রোথিত করতে পেরেছে ,তার পেছনে কি তাদের কোনো দায় –দায়িত্ব , প্রত্যক্ষ-পরোক্ষে হলেও নেই ? কেনই বা একজন ‘ বামপন্থী ‘ গবেষক –অধ্যাপককে লিখতে হয় , ‘ সাম্প্রদায়িক মন , ধর্মনিরপেক্ষ মুখ নামাঙ্কিত পুস্তক !রাজনৈতিক বিশ্বাস , সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ অথবা ক্ষণিকের রাজনৈতিক ক্ষমতালোভের তাড়নায় ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দলগুলিও কি কখনো সখনো হলেও দক্ষিণপন্থী সাম্প্রদায়িক শক্তিকে নিজেদের জায়গা ছেড়ে দেয়নি কিংবা হাতে ধরে ধর্মনিরপেক্ষ জমিকে সাম্প্রদায়িক শক্তির হাতে চাষযোগ্য করার জন্য তুলে দেয়নি ? দীর্ঘ মেয়াদে এই ধরনের নীতি ,রণ- কৌশল কি দক্ষিণপন্থী সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলগুলির ক্ষমতাকে আরো প্রসারিত , সুসংহত করার এক ‘ অভাবনীয় ‘ সুযোগ প্রদান করেনি ?  সর্বোপরি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কাছে বৈধতা প্রদানের সুবর্ণ সুযোগ সৃষ্টিতে সহায়ক হয়নি ? ( চলবে )


শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সম্পর্কিত নিবন্ধ

Leave a Comment