কলকাতা 

মুখ্যমন্ত্রী ও জুনিয়র ডাক্তাররা মুখোমুখি বসে সমস্যার সমাধান করলেন ; কর্মবিরতি প্রত্যাহার ; সাত দিন পর স্বাভাবিক ছন্দে ফিরছে রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবা

শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

দীর্ঘ সাত দিন পর জুনিয়র ডাক্তাররা কর্মবিরতি তুলে নিলেন । মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আবার প্রমাণ করলেন তিনি প্রশাসনিক ক্ষেত্রে অন্য কারও চেয়ে কম যান না । জুনিয়র ডাক্তারদের প্রতি সহানুভূতি যেমন দেখিয়েছেন তিনি একইভাবে আইন হাতে তুলে না নিতে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে সবাইকে স্বস্তি দিয়ে জুনিয়র ডাক্তাররা মুখ্যমন্ত্রীর প্রতি আস্থা রেখে কর্মবিরতি প্রত্যাহার করে নিয়েছে ।

সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিয়ে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরতে চলেছে রাজ্যের সরকারি হাসপাতালগুলিতে। নবান্নে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠকের পর সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচটা নাগাদ ধর্মঘট তুলে নিলেন জুনিয়র ডাক্তাররা। আন্দোলনকারীদের ৩০ জনের প্রতিনিধির সামনে মুখ্যমন্ত্রী প্রতিশ্রুতি দিলেন— সবার আগে দেখা হবে হাসপাতালে যাতে আর একটাও হামলার ঘটনা না ঘটে। যদি ঘটে যায়, সে ক্ষেত্রেও দ্রুত এবং কড়া ব্যবস্থার নির্দেশ দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

সোমবার দুপুর তিনটেয় নবান্নে বৈঠকের কথা থাকলেও, সকাল থেকে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত জুনিয়র ডাক্তারদের দাবি মতো, টেলিভিশন এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় গোটা বৈঠকের লাইভ টেলিকাস্ট করতে সম্মত হয় সরকার। এ সব টানাপড়েনের শেষে বিকেল চারটে নাগাদ শুরু হয় বৈঠক।

মুখ্যমন্ত্রীর কাছে ১২ দফা লিখিত দাবি পেশ করেন জুনিয়র ডাক্তাররা। প্রতিটি দাবিই আলাদা আলাদা করে তাঁরা বিস্তারিত বলেন মুখ্যমন্ত্রীর সামনে। এ গুলির মধ্যে, হাসপাতালে চিকিত্সকদের নিরাপত্তায় পুলিশের সংখ্যা এবং সক্রিয়তা বাড়ানোর দাবি যেমন ছিল, তেমনই ছিল রোগীদের অভাব অভিযোগের মুখোমুখি হওয়ার জন্য হাসপাতালের গ্রিভ্যান্স সেল বা অভিযোগ গ্রহণ কেন্দ্রগুলিকে সামনে নিয়ে আসার দাবিও। একই সঙ্গে বিভিন্ন হাসপাতালে রাজনৈতিক দলগুলির ‘প্রভাব’ কমানোর জন্যও মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানানো হয়।

এনআরএস-এর ঘটনার সময় পুলিশ উপস্থিত থেকেও যে নিষ্ক্রিয় ছিল, তা মুখ্যমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেন আন্দোলনকারীরা। বৈঠকে উপস্থিত পুলিশকর্তাদের মমতা নির্দেশ দেন, এ নিয়ে যথাযথ তদন্ত করার। ভবিষ্যতে যাতে এমনটা আর না ঘটে, তা নিশ্চিত করা জন্যও পুলিশকর্তাদের নির্দেশ দেন তিনি।

বেশ কয়েক দিনের বরফ গলে, এ দিন বৈঠকের শুরু থেকেই নমনীয় দেখা যায় দু’পক্ষকে। মমতা এবং জুনিয়র ডাক্তাররা একে অপরের কথা শুনেছেন মন দিয়ে। বৈঠকে কিছু অস্বস্তিকর প্রসঙ্গ উঠলেও, সুর কখনও চড়া হয়নি। আন্দোলনকারীদের সব দাবি সঙ্গেই একমত হয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। জুনিয়র ডাক্তাররা আশা প্রকাশ করেছেন, বৈঠকের সব সিন্ধান্ত যথাযথ প্রয়োগ সরকারপক্ষ করবেন।

  • ৪টে ৩৫ মিনিট:কর্মবিরতি প্রত্যাহারের ঘোষণা করলেন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের অর্চিষ্মান ভট্টাচার্য।
    •ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনা যাতে না ঘটে, সে দিকে নজর রাখব আমরা। আর যদি ঘটেও থাকে, তা হলে সঙ্গে সঙ্গে কড়া পদক্ষেপ করতে হবে, বললেন মুখ্যমন্ত্রী।
  • গোটা রাজ্যের জন্য একটি জরুরিভিত্তিক নম্বর এবং ই-মেল আইডি চালু করতে ডিজি বীরেন্দ্রকে নির্দেশ দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
  • জুনিয়র ডাক্তাররা দাবি তোলেন, নিরাপত্তা সংক্রান্ত ব্যাপারে পুলিশ পদক্ষেপ না করলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। তাতে সম্মতি জানান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
  • যে সমস্ত প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ হয়েছে, সে গুলি কী পরিস্থিতিতে রয়েছে, কতটা অগ্রগতি হয়েছে, তা যাচাই করে দেখার নির্দেশ দেন মমতা।
  • মমতা বলেন, রোগী কল্যাণ সমিতি কোথাও সক্রিয় আবার কোথাও নিষ্ক্রিয়। সেই সমিতিতেজুনিয়র ডাক্তারদের প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেন তিনি।
  • জবাবে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, একটা জেনারেল সার্কুলার করা যেতে পারে।শৃঙ্খলা মেনে না চললে, তাদের বিরুদ্ধেকড়া পদক্ষেপ করা হবে।
    • জুনিয়র ডাক্তাররা জানান, অনেক সরকারি হাসপাতালে গেট নেই। প্রচুর রেফারেল রোগী। চাপ সামলানো মুশকিল। অনেক সময়ই উত্তেজনা দেখা দেয়। রাজনৈতিক দলের নেতারা ব্যাপক ঝামেলা করেন। আমাদের পক্ষে সামাল দেওয়া সম্ভব হয় না। আপনার দিকে তাকিয়ে রয়েছি।
  • সেই রাতের এনআরএস-এর ঘটনা বর্ণনা করে পুলিশের বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ তোলেন জুনিয়র ডাক্তাররা। তা নিয়ে বৈঠকে উপস্থিত সিপি অনুজ শর্মা এবং ডিজি বীরেন্দ্র-র উদ্দেশে মমতা বলেন, নিষ্ক্রিয় থাকলে হবে না। এই ধরনের ঘটনায় দ্রুত পদক্ষেপ করতে হবে।
  • ডাক্তার নিগ্রহে জিরো টলারেন্স নীতির দাবি তোলেন জুনিয়র ডাক্তাররা। জবাবে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, আইন হাতে তুলে নিয়ো না। সবটা সবসময় নিয়ন্ত্রণে থাকে না। কখনও কখনও কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে যায়। তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এর জন্য সামাজিক সচেতনতা প্রয়োজন। নাগরিকদের দায়িত্ব সম্পর্কেও সচেতন করা প্রয়োজন। এসো সবাই মিলে এই কাজটা করি।
  • ৩৪ বছর পর এ রাজ্যে অনেক উন্নতি হয়েছে। আমরা ন’টা নতুন মেডিক্যাল কলেজ করেছি। প্রত্যেক জেলায় এইচডিইউ, আইসিইউ করে দিয়েছি, বললেন মমতা।
  • ২০১১ সালে স্বাস্থ্য খাতে ৬৯০ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছিল। ২০১৮-য় তা বাড়িয়ে ৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা করা হয়েছে, বললেন মুখ্যমন্ত্রী।
  • আগে হাসপাতাল দেখে মনে হত যমালয়, এখন লোকজন এসে বলে বেসরকারি নার্সিংহোমের চেয়েও ভাল। ডাক্তাররা ভাল কাজ করছেন। স্বাস্থ্য কর্মীরাও ভাল কাজ করছেন। কিন্তু সমস্ত হাসপাতালে নিয়োগ করার মতো পর্যাপ্ত সংখ্যক ডাক্তার আমরা পাচ্ছি না। বার বার বিজ্ঞাপন দিয়েও কোনও লাভ হচ্ছে না, বললেন মমতা।
  • রোগীদের আত্মীয়দের জন্য সরকারের যে গ্রিভ্যান্স সেল বা অভিয়োগ গ্রহণ কেন্দ্র রয়েছে, সে গুলিকে আরও সক্রিয় করার দাবি পেশ করেন জুনিয়র ডাক্তাররা। মুখ্যমন্ত্রী এ ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে বলেন আধিকারিকদের।
  • জটিল চিকিত্সা বা জরুরি ওষুধ প্রয়োগের সময়, বা এ নিয়ে রোগীর আত্মীয়দের বোঝানোর জন্য সিনিয়র চিকিত্সকদেরই মূলত দায়িত্ব নিতে হবে, দাবি জানালেন জুনিয়র ডাক্তাররা।
  • মমতা বলেন, কিছু লোক তোমাদের রাগানোর চেষ্টা করছে। আমাদেরও রাগানোর চেষ্টা করছে।মুখ্যমন্ত্রী বলেন, যে ছেলেটি মার খেয়েছে, ও যেন তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠে। ওই বেসরকারি হাসপাতাল খরচসাপেক্ষ হাসপাতাল। আমরা ব্যবস্থা করেছি। মিনিটে মিনিটে ওর খবর নিয়েছি। এমনকি, অপারেশনের পরেও ওর খবর নেওয়া হয়েছে। ও এখন সুস্থ আছে।
  • এক জন জুনিয়র ডাক্তার বলেন, আমরা ভেবেছিলাম এত বড় ঘটনার পরে আপনি এক বার যাবেন। কিন্তু আপনি গেলেন না।তখন মুখ্যমন্ত্রী বলেন, আমি কথা বলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তোমরা কথা বললে না। আমি ভাবলাম, তোমরা কথা বলতে চাইছ না।
  • কলকাতা পুলিশের কমিশনার অনুজ শর্মা বলেন: হাসপাতালে কত লোক ঢুকছেন, কারা ঢুকছে, তাতে নজরদারি প্রয়োজন, যাতে সব কিছু নিয়ন্ত্রণে থাকে।
  • মুখ্যমন্ত্রীর প্রস্তাব:যখন রোগী মারা যান, সেই সময় সমন্বয়ের অভাব দেখা যায়। সেটা দূর করতে তিনটি শিফ্টে তিন জনকে দায়িত্ব দেওয়া উচিত, যাঁরা রোগীর পরিবার-পরিজনদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলবেন। পুলিশের তরফে এক জন নোডাল অফিসার থাকবেন, যাঁর নম্বর কর্মরত চিকিৎসকদের কাছে থাকবে। যে কোনও প্রয়োজনে তাঁর সাহায্যে চাওয়া যেতে পারে।
  • চিকিৎসক নিগ্রহ কাণ্ডে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে পাঁচ জনকে। ডাক্তারদের কারও বিরুদ্ধেকোনও মামলা করা হয়নি, জানালেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
  • মমতার প্রস্তাব:হাসপাতালে  এক জন রোগীর সঙ্গে দু’জনের বেশি ভিতরে ঢুকতে পারবেন না। সব জেলা হাসপাতালের জরুরি বিভাগে কোলাপসিবল গেট বসানো হবে। আটকাতে হবে বহিরাগতদের প্রবেশ।
  • জবাবে স্বাস্থ্য সচিব রাজীব সিংহকে মুখ্যমন্ত্রী জানাতেবলেন, কাকে কাকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
  • অর্চিষ্মান জানতে চান, ওই অপ্রীতিকর ঘটনায় এখনও পর্যন্ত কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
  • ৪টে ৬মিনিট: বলছেন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের অর্চিষ্মান ভট্টাচার্য: ভয়ের মধ্যে কাজ করতে হচ্ছে আমাদের। বাধ্য হয়ে আন্দোলনে নেমেছি। আমরা চেষ্টা করেছি আপনার কাছে পৌঁছতে। কিন্তু আমাদের বার্তা হয়ত আপনার কাছে পৌঁছয়নি। আমরা খুব তাড়াতাড়ি কাজে ফিরতে চাই। এই অচলাবস্থা চলুক তা কেউই চাই না আমরা। সাধারণ মানুষ অনেক ক্ষেত্রেই কষ্ট পান। অত্যাচারিত হতে হতে আমরাও নিরুপায়। ( সৌজন্যে ডিজিটাল আনন্দবাজার)।

শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সম্পর্কিত নিবন্ধ

Leave a Comment