কলকাতা 

২০১৮ সালে প্রচন্ড দাবদহের কারনেই সমগ্র জুন মাসটা সরকার ছুটি দিতে বাধ্য হয়েছিল তখন এই প্রশ্ন ওঠেনি কেন ? কারা হাইকোর্টে কী দাবি করেছিল স্কুলে ছাত্র না এলে শিক্ষকের যাওয়ার কোন প্রশ্ন থাকে কি ?; সেই সব শিক্ষক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ যখন ছুটির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে তখন মনে হয় অন্ধ মমতা বিরোধিতা ছাড়া এটা আর কিছুই নয়

শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সেখ ইবাদুল ইসলাম : সরকারি ও সরকার সাহায্যপ্রাপ্ত বিদ্যালয় ও মাদ্রাসায় ছুটি বির্তক কিছুতেই যেন কাটছে না । বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠন এর বিরোধিতা করছে । বহুল প্রচারিত আনন্দবাজার পত্রিকায় সরকারি স্কুলশিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সৌগত বসু বলেছেন, ‘‘এত দিন স্কুল ছুটি থাকলে পড়ুয়াদের মধ্যে স্কুল সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়।’’ কলেজিয়াম অব অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার্স অ্যান্ড হেডমিস্ট্রেসেসের সম্পাদক সৌদীপ্ত দাস বলেন, ‘‘শিক্ষার অধিকার আইন, ধারাবাহিক সামগ্রিক মূল্যায়ন, শিক্ষণ দিবস— সব কিছুকে ঢেকে দিল এই অদ্ভুত সিদ্ধান্ত! মিড-ডে মিলের উপরে এখনও অনেক পড়ুয়ারই এক বেলা পেট পুরে খাওয়া নির্ভর করে। জানি না, এই সব আদেশনামা জারির সময় আধিকারিকদের সেটা আদৌ মনে থাকছে কি না।’’

বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির নেতা স্বপন মণ্ডল মনে করেন, ৮ জুনের পরে স্কুল খুলে দেওয়া উচিত। পশ্চিমবঙ্গ শিক্ষক সমিতির নেতা নবকুমার কর্মকারের বক্তব্য, এত দীর্ঘ ছুটির ফলে পাঠ্যক্রম শেষ করা মুশকিল। মাধ্যমিক শিক্ষা ও শিক্ষাকর্মী সমিতির অনিমেষ হালদার জানান, এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তাঁদের সংগঠন সব জেলা স্কুল পরিদর্শকের দফতরে বিক্ষোভ দেখাবে।

কিন্ত কেন এই বিরোধিতা মমতা সরকার যেহেতু বিদ্যালয়ে ছুটি ঘোষণা করেছে তাই এই বিরোধিতা চলছে বলে অনেকেই মনে করছেন । কারণ ২০১৮ সালে প্রচন্ড দাবদহের কারনেই সমগ্র জুন মাসটা সরকার ছুটি দিতে বাধ্য হয়েছিল তখন এই প্রশ্ন ওঠেনি কেন ? তখন কারা ছুটি চেয়েছিল ? কারা হাইকোর্টে কী দাবি করেছিল স্কুলে ছাত্র না এলে শিক্ষকের যাওয়ার কোন প্রশ্ন থাকে কি ? কারা সরকারি নির্দেশকে অমান্য করে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত ছিলেন ; সেই সব শিক্ষক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ যখন ছুটির যৌক্তিকতা  নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তখন মনে হয় অন্ধ মমতা বিরোধিতা ছাড়া এটা আর কিছুই নয়। বিদ্যালয় বা মাদ্রাসাগুলিকে নিজেদের রাজনৈতিক শিক্ষালয় করে ফেলেছেন । এরাই আবার সোস্যাল মিডিয়ায় বড় বড় কথা বলে চলেছেন ।

আসল বিষয়টি হল এপ্রিল মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে যখন দাবদহ শুরু হয়েছে , ছুটির দাবিতে এই তৃণমূল বিরোধী শিক্ষক সংগঠনগুলি সরব হতে যাচ্ছিল ঠিক সেই সময় মমতা সরকার ছুটি ঘোষণা করে দেওয়ায় রাজনীতি করার সুযোগ না পেয়ে সোস্যাল মিডিয়ায় প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে কেন এত ছুটি ? বামেদের আমলে তো বছরে ৮৫টা ছুটি ছিল ; আজ তো মাত্র ৬৫টি ছুটি তাহলে কোথায় বেশি ? গরমের দাবদহ থেকে ছেলেমেয়েদের বাঁচাতে বিশেষ পরিস্থিতিতে ছুটি ঘোষণা করার অধিকার সরকারের অবশ্যই আছে ।

মূল ঘটনা হল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের লোকেদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন অবশ্যই আছে । আট বছরের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকার পরও তাদের শিক্ষক সংগঠনের অস্তিত্বকে দূরবীণ দিয়ে দেখতে হয় কেন ? আসলে দলের নেতারা কতগুলি ফাঁকিবাজ শিক্ষকদের পদে বসিয়ে দায় সেরে দিয়েছেন । আর এই কারণে বামপন্থী বা বিজেপি ঘেঁষা শিক্ষক সংগঠনের মোকাবিলা করার ক্ষমতা তাদের নেই । কয়েকদিন আগে এক টিভি চ্যানেলের টক শোতে দেখলাম বিজেপির প্রতিনিধি বলছেন দেখুন মাদ্রাসার মুসলিম শিক্ষকদের জন্য ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে , আর স্কুলের শিক্ষকদের ছুটি দেওয়া হয়নি । মুসলিম তোষণ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে করছেন তার জ্বলন্ত উদাহরণ এই সার্কুলারে । অবাক হয়ে দেখলাম ওই টকশোতে উপস্থিত তৃণমূলের প্রতিনিধি হিসাবে যিনি ছিলেন তিনি এই বিষয়টিতে আশ্চর্যজনকভাবে নীরব থাকলেন । অথচ বলা যেতেই পারত ,সরকারী মাদ্রাসাগুলিতে শুধুমাত্র মুসলিমরা চাকরি করেন না , সংখ্যার বিচারে ৩০-৪০ শতাংশ শিক্ষক রয়েছেন হিন্দু সম্প্রদায়ের অতএব মাদ্রাসার শিক্ষকদের ছুটি দিয়ে মুসলিম তোষণ করা হয়নি । এছাড়া বলা যেতে পারত মাদ্রাসাগুলিতে শুধুমাত্র মুসলিম ছেলেমেয়েরাই পড়াশোনা করে না হিন্দু ছেলেমেয়েরাও পড়াশোনা করছে । শতাংশের বিচারে তা প্রায় ২২ ।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলে এখন আর তেমন কোনো ব্যক্তিত্ব নেই যিনি সহজভাবে বিরোধীদের অপপ্রচারের জবাব দিতে পারেন । আর এজন্য খোদ দলনেত্রী নিজেই দায়ী । কারণ তিনি তোলাবাজ নেতা-নেত্রী ছাড়া অন্যদের সম্মান দেননি । ফলে এর পর থেকে তিনি যা করবেন সেটা রাজ্যবাসীর ভালোর জন্য করলেও তার বিরোধিতা করে যাবে বিজেপির মত দলগুলি । যেমন গরমের ছুটি নিয়ে ভোটের মুখে তৃণমূল দল ও মমতা সরকারের ভাবমূর্তিতে কালি লেপনের চেষ্টা করে চলেছে বিরোধীরা ।

ছুটি নিয়ে যে সার্কুলার জারি করেছে রাজ্য সরকার সেখানে বোঝানোর ভুল হয়েছে । সুপার সাইক্লোন ফণি ধেয়ে আসছে আবহওয়া দফতর থেকে পাওয়া এই সংকেতের প্রেক্ষিতে ছুটি ঘোষণা না করা হলে তখন কী বলত এই সব শিক্ষক সংগঠনগুলি ? তাই আবহাওয়া দফতরের সংকেত অনুসারে ৩ ও ৪মে তারিখ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে । ৬মে তারিখ থেকে ৮ জুন পর্যন্ত গরমের ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে । যারা বিরোধিতা করছেন তাদের মনে রাখা উচিত রাজ্যে লোকসভা ভোট চলছে । এই পরিস্থিতিতে দক্ষিণবঙ্গে পরিবহণ ব্যবস্থা কার্যত ৬ তারিখ থেকে ভেঙে পড়বে । সব যানবাহন ভোটের কাজে দক্ষিণবঙ্গে নেমে যাবে ফলে যাতায়াতের অসুবিধা হবে । যে শিক্ষক কলকাতা থেকে হলদিয়া শিক্ষকতা করতে প্রতিদিন যাতায়াত করেন তার যাতায়াতের জন্য পরিবহন ব্যবস্থা ঠিক রাখাও সরকারের কাজ । তাছাড়া যারা সিলেবাসের কথা বলছেন তারা জানেন এই সময় ( ভোট চলাকালীন সময় ) স্কুলগুলিতে ভালো পড়াশোনা হয় না । এছাড়া বিভিন্ন বড় বড় বিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় বাহিনীর থাকার জন্য অস্থায়ী ক্যাম্প করা হয়েছে তাহলে ওই সব বিদ্যালয়ের তো অনেক আগেই ছুটি পড়ে গেছে সেখানকার সিলেবাস কীভাবে শেষ হবে ?

তাই সরকার হয়তো এই সব দিক বিবেচনা করে নির্দেশিকা জারি করেছে ৬মে থেকে ৮ জুন পর্যন্ত গরমের ছুটি দেওয়া হয়েছে । আর ৮ জুনের পর যদি গরমের দাবদহ না কমে তাহলে সেই ছুটির মেয়াদ ৩০ জুন থাকবে । এই সার্কুলার গত বছরও জারি করা হয়েছিল । গত বছর ছুটিও ছিল । আর সেই ছুটির দাবি করেছিল তৃণমূল বিরোধী শিক্ষক সংগঠনগুলি । আর এবছর যখন মমতা সরকার আগে-ভাগেই ছুটি ঘোষণা করেছে তখন রে রে তেড়ে আসছে শিক্ষক সমাজের মসিহারা !

 

 

 


শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সম্পর্কিত নিবন্ধ

Leave a Comment