অন্যান্য 

সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগ করতে গিয়ে ভোটার ,প্রার্থী থেকে সাংবাদিকরা আক্রান্ত ; কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন নিরব কেন ?

শেয়ার করুন
  • 23
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সেখ ইবাদুল ইসলাম : পশ্চিমবাংলায় আজকের ভোট দেখে লজ্জা শব্দটিও আজ লজ্জা পেয়েছে ! কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের পরিচালনায় দেশব্যাপী জনগণের পয়সায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে । স্বাভাবিকভাবেই নির্বাচন কমিশনের প্রথম এবং প্রধান দায়িত্ব হল দেশের ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারে তার ব্যবস্থা করা । শান্তিপূর্ণ নির্বাচন করানোর জন্যই জনগণের পয়সায় তাঁদেরকে বেতন দেওয়া হয় । নির্বাচন কমিশনের হাতে প্রভূত ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে । আমাদের দেশের সংবিধান ভোট ঘোষণার দিন থেকে নির্বাচন কমিশনকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ভোগ করার নির্দেশ দিয়েছে । কারণ যাতে ক্ষমতাসীন কোনো রাজনৈতিক দল ভোটারদের ভয় দেখাতে না পারে ; কিংবা প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে সাধারন  মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিতে যাতে না পারে তার জন্যই সংবিধান কমিশনকে এই ক্ষমতা দিয়েছে ।

পাবলিক সার্ভেন্ট হিসেবে নির্বাচন কমিশনের তাই প্রধান দায়িত্ব হল মানুষের ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষমতাকে মসৃণভাবে কার্যকরী করা । গত ১১ এপ্রিল থেকে দেশজুড়ে নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে । প্রথম দফায় আমাদের রাজ্যে দুটি লোকসভা কেন্দ্রের নির্বাচন ছিল । কোচবিহার ও আলিপুরদুয়ার ।

বৃহস্পতিবার ১৮ এপ্রিল দ্বিতীয় নির্বাচনে দেশের ৯৫ টি লোকসভা আসনের সঙ্গে আমাদের রাজ্যে তিন লোকসভা কেন্দ্রে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে । কিন্ত আজ সকালে নির্বাচন শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পর থেকেই দেখা গেল এই তিনটি কেন্দ্রেই অশান্তি চরমে পৌছেছে ।

সকালেই রায়গঞ্জ লোকসভা কেন্দ্রের বিদায়ী সাংসদ ও প্রার্থী মহম্মদ সেলিম ইসলামপুরের পাটওয়ারায় একটি বুথ দখল হয়েছে এই অভিযোগ পেয়ে তা দেখতে গিয়ে আক্রান্ত হন । তাঁর গাড়ি ভাঙচুর করা হয় ; ড্রাইভারকে মারধোর করা হয় এবং দেশের অন্যতম প্রবীণ সাংসদ মহম্মদ সেলিমকেও মারার চেষ্টা করা হয় । মহম্মদ সেলিমের মত একজন সাংসদ বারবার ফোনে নির্বাচন কমিশনের কর্তাদের সঙ্গে কথা বললেও আক্রান্ত হওয়ার ৪৫ মিনিট পর নিরাপত্তা বাহিনী ঘটনাস্থলে যায় বলে অভিযোগ । যে ভোটে একজন বিদায়ী সাংসদকে আক্রান্ত হতে হয় , সেই নির্বাচন কমিশনের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে যায় । কোটি কোটি টাকা খরচ করে এই নখদন্তহীন নির্বাচন কমিশন রেখে লাভ কী ? যে নির্বাচন কমিশন প্রার্থীর নিরাপত্তা দিতে পারে না , সেই নির্বাচন কমিশনের কর্তা কোন মুখে শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের বড়াই করে !

মহম্মদ সেলিমের পর দার্জিলিং লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত চোপড়ায় ভোটারদের বাধা দেওয়া হচ্ছে এই অভিযোগে ভোটাররা রাস্তা অবরোধ করে । কেন্দ্রীয় বাহিনীর দাবিতে তারা অবরোধ চালিয়ে যায়  মিডিয়ার দৌলতে এই খবর সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের নজরে পড়ে যাওয়ার কথা। সেখানে ভোটারদের ন্যুনতম দাবিকে পূরণ না করে যেভাবে অবরোধ ভাঙতে গুলি ও পুলিশ লাঠিচার্জ করে তা এক কথায় গনতন্ত্রের পক্ষে শুভ নয় । বলা যেতে পারে তা লজ্জার । কিন্ত ভোটাররা কেন্দ্রীয় বাহিনী ছাড়া ভোট দেবে না বলে জানিয়ে দেয় । ফলে প্রায় চার ঘন্টা পর ওই বুথে কেন্দ্রীয় বাহিনী যায় । সাধারন মানুষের ন্যুনতম দাবি মেনে কেন্দ্রীয় বাহিনী আগেই কেন ঘটনাস্থলে পাঠানো হল না ? ভোটারদের গনতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করার জন্য উপযুক্ত  পরিকাঠামো তৈরি জন্যই  নির্বাচন কমিশনের জন্ম । যে নির্বাচন কমিশন সাধারন মানুষের গনতান্ত্রিক অধিকার সুরক্ষিত করতে পারে না তার অস্তিত্বের কোনো প্রয়োজন আছে কী ?

তৃতীয় ঘটনা হল গোয়ালপোখরে এই খানে মার খেলেন গনতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ সংবাদ-মাধ্যম । আমাদের রাজ্যে নাম করা এক টিভি চ্যানেলের পরিচিত সাংবাদিক ভোটারদের বুথে ঢুকতে বাধা দেওয়া হচ্ছে এই খবর পেয়ে সংবাদ করতে গিয়েছিলেন । বুথের কাছাকাছি যাওয়ার পরেই তাঁদের উপর দুস্কৃতিরা চওড়াও হয় । মেরে ফেলার চেষ্টা হয় । শেষ পর্যন্ত কোনো রকমে তারা বেঁচে যান ।

কিন্ত এখানেও সংবাদ মাধ্যম আক্রান্ত হওয়ার পরও নির্বাচন কমিশনের কোনো হেলদোল নেই । এখনও  সাংবাদিকের উপর  হামলাকারীদের গ্রেফতার করা হয়নি । এই নির্বাচন কমিশন তো আমরা চাইনি । আমরা চেয়েছিলাম টি এন শেষনের মত নির্বাচন কমিশনার । আমরা চেয়েছিলাম নাসিম জাইদির মত নির্বাচন কমিশনার । যাঁরা ভোট করিয়েছিলেন পিনের আওয়াজ পাওয়া যায়নি । তাঁরা  যদি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন করাতে পারেন তাহলে সুনীল আরোরারা  পারলেন না কেন ? অবশ্য , কমিশন বলতে পারে , প্রশাসন তো একটা সিস্টেমে চলে তাকে মান্যতা তো দিতেই হবে । কিন্ত বিষয়টি হল বিরোধীরা বারবার অভিযোগ করেছে কেন্দ্রীয় বাহিনী ছাড়া ভোট করা ঠিক হবে না । তা সত্ত্বে কাদের রিপোর্টের ভিত্তিতে কমিশন রাজ্য পুলিশ দিয়ে ভোট করালেন তা তাদেরকে ভাবতে হবে । কারণ কমিশনের প্রধান কাজ মানুষ যাতে শান্তিপূর্ণভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে সেদিকে লক্ষ্য রাখা । আর সেটা করতে হলে প্রয়োজনে প্রতিটি বুথেই কেন্দ্রীয় বাহিনী দিতে হবে । দেশের সংবিধান নাগরিকের ভোটাধিকারকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে ।

নির্বাচন কমিশনকে মনে রাখতে হবে সংবিধান তাঁদের প্রভূত ক্ষমতা দিয়েছে ঠিকই কিন্ত তা হল সাধারন মানুষের ভোটাধিকারকে নিশ্চিত করা জন্য । যদি সাধারন একজন মানুষও ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয় তার পুরোপুরি দায় বর্তায় কমিশনের উপর । কমিশন তার দায় এড়িয়ে যেতে পারে না । কমিশন সাংবাদিকের উপর হামলার পর কিংবা প্রার্থীর গাড়ি –ভাঙচুর হওয়ার পর সাংবাদিক সম্মেলনে দম্ভভরে বলতে পারে না  নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হয়েছে ।

আশার কথা এই যে সাধারন মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করার দাবিতে রাস্তায় নেমে এসেছে । এ থেকে কমিশনকে শিক্ষা নিতে হবে তারা যদি মানুষের ভোটাধিকার প্রয়োগ সঠিক ভাবে করাতে না পারে তাহলে আগামী দিনেই মানুষই রাস্তায় নেমে আন্দোলন গড়ে তুলবে । তাতে দেশের  তো বটেই নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিশ্বের দরবারে প্রশ্ন উঠে যাবে ।


শেয়ার করুন
  • 23
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সম্পর্কিত নিবন্ধ

Leave a Comment